একনেকে ওঠেনি বড় ব্যয়ের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প; সিদ্ধান্ত নেবে আগামী নির্বাচিত সরকার
অন্তবর্তী সরকার তাড়াহুড়ো করে পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন দিতে চায়নি বলে প্রকল্পটি রোববার (২৫ জানুয়ারি) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একনেক সভা আর না-ও হতে পারে। আগামী নির্বাচিত সরকার এসে প্রয়োজনমতো যাছাই-বাছাই শেষে প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা করবে।
এর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা টিবিএসকে বলেছিলেন, বোরবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা ছিল।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের জন্য সম্প্রতি তৎপরতা চালিয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন। গত ১৫ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রাথমিক সম্মতি পাওয়া যায় এবং চূড়ান্ত অনুমোদেনর জন্য একনেকে সভায় উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়।
উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, 'এটি ভালো প্রকল্প, তবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পুরো প্রকল্পে বাস্তবায়নে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে। প্রথম পর্যায়ে লাগবে ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।'
তিনি আরও বলেন, একটি বড় প্রকল্প শুরু করতে গেলে অর্থায়নের সংস্থানের মতো অনেক কিছু দেখতে হয়। আগামী বছরগুলোতে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। তিন বছরের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোতে (এমটিবিএফ) কীভাবে সমন্বয় করা হবে, 'কস্ট বেনিফিট' কেমন হবে—এসব দেখে যাছাই-বাছাই করে প্রকল্প নিতে হবে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরো বলেন, ব্যারাজ নির্মাণের আগের আরো অনেক কিছু দেখতে হবে। এর জন্য ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে। পদ্মা নদীতে কতটকু পানি পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত বিষয়ের বিবেচনা নিয়ে কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে।
'কারিগরি, রাজনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইস্যু—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বড় প্রকল্প নিতে হয়,' বলেন তিনি।
যমুনা সেতু নির্মাণের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সেতুটির অর্থায়নের জন্য সারচার্জ বসিয়েছিলেন। একজন অর্থনীতিবিদ হিসাবে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়টি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পর অবশেষে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারি তহবিলের অর্থায়নে মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি দুটি ভাগে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম পর্যায়ে জন্য ৩৪ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উজানে গঙ্গা নদীতে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশে পদ্মায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এরকম ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল।
১৯৬০-এর দশক থেকেই গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মোট চারটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়। ২০০২ সালে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে।
পরে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়।
৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকার ২৫ প্রকল্প অনুমোদন
একনেক মোট ৪৫ হাজার ১৯১.২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ১৪টি সম্পূর্ণ নতুন, ৬টি সংশোধিত ও ৫ প্রকল্পের বাস্তবায়নের মেয়াদ বৃদ্ধি-সংক্রান্ত প্রস্তাবনা রয়েছে।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ২ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প। দেশের উত্তরাঞ্চল ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মানুষকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে এটি নির্মাণ হবে।
এ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন জানান, ঋণ চুক্তি সই হওয়ার পরই চীনা অর্থায়নের প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালটি প্রতিবেশী দেশগুলোর রোগীদেরও আকৃষ্ট করতে পারবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
এছাড়াও স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবার মান উন্নয়ন এবং ডেলিভারি সিস্টেম জোরদার করার লক্ষ্যে একনেক স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীনে ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
সভায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় ২৫ হাজার ৫৯২.৮৫ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
