উপকারভোগীরা ‘ইট-সুরকির মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন’, সরকারি কর্মকর্তারা পিডি হতে চাইছেন না: পরিকল্পনা উপদেষ্টা
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হতে চাচ্ছেন না। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন নীতিমালায় উপকারভোগীদের সম্পৃক্ত করার পর উপকারভোগীরা প্রকল্পে ব্যবহৃত ইট-সুরকির মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে এখন প্রকল্পগুলোতে কোন কর্মকর্তা আর পিডি হতে চায় না। এতে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমে গেছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত 'অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ' শীর্ষক সেমিনার ও ইআরএফ শিক্ষাবৃত্তি-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানির কারওয়ান বাজারে ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্স ভবনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে পরিকল্পনা উপদেষ্টা দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক বিষয়ে আলোচনা করেন।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ এ বিষয়ে টিবিএসকে বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, আর্থিক ও প্রশাসনিক এখতিয়ার এবং লজিস্টিক সহায়তার দিক থেকে প্রকল্প পরিচালকের পদটি বেশ আকর্ষণীয়।
'তবে এই পদের সঙ্গে নানাবিধ ঝুঁকি জড়িত থাকায় অনেক কর্মকর্তাই দায়িত্বটি নিতে অনাগ্রহী,' বলেন তিনি।
এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ হলো কঠোর সময়সীমা ও সীমিত সম্পদের মধ্যে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা করা।
মামুন আল রশীদ আরও বলেন, যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের একটি প্রধান অংশ হলো পণ্য, সেবা ও পূর্ত কাজ ক্রয়। এর জন্য সরকারি ক্রয় বিধিমালার গভীর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন এবং এই বিধিমালার আওতায় গঠিত বিভিন্ন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়।
সাবেক এই পরিকল্পনা সচিব বলেন, 'প্রকল্প বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হলো এই প্রকিউরমেন্ট।' তিনি আরও বলেন, কর্মকর্তারা প্রায়ই ভবিষ্যতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার আশঙ্কা করেন, যার ফলে তাদের চাকরিচ্যুতি এমনকি কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ইআরএফের অনুষ্ঠানে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও সামনে বড় বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আছে, অস্থিরতা আছে।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। অর্থ পাচার ও অব্যবস্থাপনার ফলে ব্যাংক খাতের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। তবে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।
উপদেষ্টা বলেন, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিময় হার এখন স্থিতিশীল। রিজার্ভ বাড়ছে। ঋণ পরিশোধের কারণে যেটুকু রিজার্ভ কমে যাচ্ছে, সেটা কেনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি যতটা কমার কথা, ততটা কমেনি। খুব ধীরে কমছে। তার ধারণা, মূল্যষ্ফীতি ধীরে ধীরেই কমবে। মজুরি বেড়েছে। অর্থনীতি নতুন একটি জায়গায় এসেছে, আগের জায়গায় যাবে না। দামের প্রত্যাশা (প্রাইস এক্সপেকটেশন) থেকে মূল্যষ্ফীতি হচ্ছে। এটা 'সেলফ জেনারেটিং', এজন্যই কমতে সময় লাগবে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমান অবস্থায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বার্থে দীর্ঘ সময় ১০ শতাংশ নীতি সুদহার বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত।
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, 'রাজস্ব সংগ্রহে বাংলাদেশ সব উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় সবচেয়ে নিচে রয়েছে—জিডিপির ৭ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ। এই রাজস্ব সংগ্রহ দিয়ে আমরা যত উন্নয়ন কৌশল করি না কেন, কোনোটাই সম্ভব হবে না।'
'আমরা যে রাজস্ব আয় করছি, তার পুরোটা পরিচালন ব্যয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন ব্যয় করা হচ্ছে ঋণের ওপর নির্ভর করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ,' বলেন তিনি।
জ্বালানি খাতকে ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান করা দরকার।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি অধ্যাদেশ করেছে। সেখানে বেসরকারি খাতকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই অধ্যাদেশ করার সময় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, বেসরকারি খাত সৌরবিদ্যুৎ বিক্রি করলে পিডিবির ভর্তুকি বেড়ে যাবে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে বড় বড় দুর্নীতি কমেছে। 'কিন্তু অন্য দুর্নীতি আছে। মামলা বাণিজ্য আছে, বদলি বাণিজ্য আছে। কলেজে একটি বদলি করতে ৮ লাখ টাকা লাগে। গোয়েন্দা সংস্থাকে বলেছি, কিন্তু তারা এসব বের করতে পারেনি।'
শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শত শত তদবির হয়। 'আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলেই কাজ হতো, মন্ত্রণালয়ে আসতে হতো না। এখন সবাই বলে, একটা সুযোগ এসেছে, তাই মন্ত্রণালয়ে চলে আসেন। আমার রুমের সামনে অনেক লোক আসত। আমি তাদের ডিঙিয়ে রুমে যেতাম।'
