১৫৯ উন্নয়ন প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি শূন্য: আইএমইডি
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের কোনো ভৌত অগ্রগতি হয়নি, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব প্রকল্পের অনুকূলে ৮ হাজার ৩৮৩.৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু প্রকল্পে কেবল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও অফিস খরচের পেছনে অর্থ ব্যয় হয়েছে, মূল কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, পরিবহন, যোগাযোগ অবকাঠামো ও কৃষি খাতের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্প এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।
এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শূন্য অগ্রগতির প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ২১১টি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১০৪টি।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ১১টি প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ২৫ শতাংশের কম, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। একইভাবে ২১৮টি প্রকল্পের অগ্রগতি ২৬ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে এবং ৪৮টি প্রকল্পের অগ্রগতি ৫১ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন এখনও সন্তোষজনক নয়।
প্রতিবেদনে গত অর্থবছরে সমাপ্ত হওয়া ৩১১টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৪টি প্রকল্পের ভৌত কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন না করেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতার ভিত্তিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) অন্তর্ভুক্ত ১ হাজার ৪৬৮টি প্রকল্পকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অন্তত ২৩টি প্রকল্পে কোনো কাজ হয়নি, অর্থাৎ এগুলোর ভৌত অগ্রগতি ছিল শূন্য।
অগ্রগতিহীন উল্লেখযোগ্য প্রকল্প
শূন্য অগ্রগতির তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য সড়ক ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে: বামনডাঙ্গা (গাইবান্ধা)-শঠিবাড়ী-আফতাবগঞ্জ (দিনাজপুর) জেলা সড়ক প্রশস্তকরণ; কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়ক (শিকলবাহা-আনোয়ারা সড়ক) লেনিং ও আনোয়ারা উপজেলা কোয়ার্টার লিংক রোড নির্মাণ; সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ; কুমিল্লা (ময়নামতি)-ব্রাহ্মণবাড়িয়া (ধরখার) জাতীয় মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ; সিলেট-চরখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প; মাদারগঞ্জ-জামথল সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ; সিলেট (তেলিখাল)-সুলতানপুর-বালাগঞ্জ সড়কের ২৫তম কিলোমিটারে বড়ভাঙ্গা সেতু নির্মাণ; রহমতপুর-বাবুগঞ্জ-মুলাদী-হিজলা মহাসড়কের ৮ম কিলোমিটারে আড়িয়াল খাঁ নদীর ওপর মীরগঞ্জ সেতু নির্মাণ; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প; জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনী জেলার সংযোগ সড়কগুলোর মানোন্নয়ন এবং ভাঙ্গা-যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর প্রকল্প।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অন্তত ১১টি প্রকল্পে কোনো কাজ হয়নি বা শূন্য ভৌত অগ্রগতি দেখা গেছে।
এ প্রকল্পগুলো হলো: উন্নয়নের মহাসড়কে জয়রথে বিজয়ের জয়ধ্বনি; দাগনভূঞায় ভাষা শহীদ সালাম মেমোরিয়াল প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র ও কমিউনিটি হাসপাতাল নির্মাণ; কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলায় প্রতিবন্ধী ও বিধবাসহ দরিদ্র, অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়ন; দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত, প্রতিবন্ধী ও এতিম তরুণ-তরুণীদের জীবনমান উন্নয়নে সেবা প্রদান; জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ; ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হালিমা-নজির ডায়াবেটিক হাসপাতাল স্থাপন; বৈশ্বিক মহামারির প্রেক্ষাপটে জয়পুরহাট জেলার প্রান্তিক কৃষক, প্রতিবন্ধী এবং সুবিধাবঞ্চিত, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের আয়বর্ধক কর্মসূচির মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়ন; আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও আত্মকর্মসংস্থান উৎসাহিত করার মাধ্যমে পরিবারকল্যাণ ও দারিদ্র্য বিমোচন; মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কর্মসংস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং চা-বাগান জনগোষ্ঠীর জন্য সচেতনতা ও সক্ষমতা উন্নয়ন উন্নয়ন কর্মসূচি (আত্ম-উন্নয়ন)।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার একাধিক প্রকল্পে কোনো ভৌত অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৬টি প্রকল্পে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এছাড়া জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৯টি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ৫টি ও বাংলাদেশ রেলওয়ের চারটি প্রকল্পের কাজ থমকে আছে।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন-আল-রশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, 'প্রকল্পে অগ্রগতি না হওয়ার কারণ হলো অনেক প্রকল্পের জরুরি উপাদান বা প্রযুক্তিগত দিকগুলো শুরু হওয়ার আগে পরিষ্কার করা হয় না। কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়াই সংস্থাগুলো প্রকল্প নেয়। ফলে সংস্থাগুলো প্রজেক্ট ইনসেপশন পর্যায়ে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'বছরের পর বছর কাজ না হলেও এর জন্য প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কোনো রকমের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয় না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করে না। ফলে প্রতি বছর একই সমস্যা থেকে যাচ্ছে। এতে করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও ভৌত অগ্রগতি এগিয়ে নেওয়া যায় না।
'অগ্রগতিহীন প্রকল্প দেশের উন্নয়ন ব্যয় এবং অর্থনীতির কার্যকারিতাকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করছে। এছাড়া প্রকল্প বিলম্বের জন্য প্রকল্পের মেয়াদের সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। যে লক্ষ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়, তার সুফল পেতেও দীর্ঘ দিন অপেক্ষায় থাকতে হয়।'
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর আরএডিপির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২২৪টি প্রকল্পে ব্যয়ের হার ছিল শূন্য থেকে ২৫ শতাংশের নিচে। পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে 'হতাশাজনক' বলে অভিহিত করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ হাজার ৪৫৯.৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকার পরও ১১০টি প্রকল্পে এক টাকাও খরচ করা হয়নি। অন্যদিকে ১৩৪টি প্রকল্পে ১১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৫ শতাংশের কম।
প্রকল্প ব্যয়ের এই ধীরগতির পেছনে কিছু চিরাচরিত কারণ চিহ্নিত করেছে আইএমইডি: ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিকল্পনার অভাব এবং বৈদেশিক অর্থায়নের নিশ্চয়তা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ১ হাজার ৪৬৮টি প্রকল্পের মধ্যে ১৩৮টি প্রকল্পের ব্যয়ের হার ২৬ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। প্রায় ১৯৯টি প্রকল্পে ৫১ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। তবে ১০৬টি প্রকল্পে ১০০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যা 'প্রশংসনীয়' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
