ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে আজ থেকে ই-ভ্যাট রিফান্ড চালু করছে এনবিআর
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এক পদক্ষেপ হিসেবে, কর রিফান্ড প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। যা ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের সমালোচিত ধীরগতির, কাগজনির্ভর ও দুর্নীতিপ্রবণ ম্যানুয়াল পদ্ধতির অবসান ঘটানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনবিআরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আজ বুধবার থেকে শুরুতে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) রিফান্ড বা ই-ভ্যাট সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি করদাতাদের ব্যাংক হিসাবে ভ্যাট রিফান্ড পাঠানোর মাধ্যমে এই পদ্ধতিটি চালু করা হচ্ছে। আয়কর ও কাস্টমস শুল্কসহ অন্যান্য করের রিফান্ডও ধাপে ধাপে এই অনলাইন পদ্ধতির আওতায় আনা হবে।
ব্যবসায়ীরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, পুরোদমে বাস্তবায়ন হলে কার্যকর একটি অনলাইন রিফান্ড পদ্ধতি সময় সাশ্রয় করবে, হয়রানি কমাবে এবং কর অফিসে বারবার যাতায়াতজনিত বাড়তি খরচ কমাতেও সহায়ক হবে।
নতুন প্ল্যাটফর্মের আওতায়, ব্যবসায়ীরা এনবিআরের কর্মকর্তাদের কাছে সরাসরি হাজির না হয়েই অনলাইনে আবেদন করে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অতিরিক্ত ভ্যাট রিফান্ড পেতে পারবেন বলে ব্যবসায়ী, কর বিশেষজ্ঞ ও এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে আছে রিফান্ডে
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেবল এনবিআরের ভ্যাটি উইংয়ের কাছে ব্যবসায়ীদের রিফান্ড তৈরি হয়ে আছে ১,৪৬৬ কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশই বছরের পর বছর ধরে আটকে আছে।
এর বাইরে আয়কর ও কাস্টমস উইংয়ে কী পরিমাণ রিফান্ড সৃষ্টি হয়েছে, তার সামষ্টিক কোনো তথ্য এনবিআর থেকে পাওয়া যায়নি। তবে এনবিআর সূত্র জানায়, এর পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে।
ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, আইন অনুযায়ী রিফান্ড পাওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়মিতভাবে বিলম্বিত হয়। বেশিরভাগ ভ্যাট রিফান্ড তৈরি হয় বাণিজ্যিক পণ্য আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে, যাদের থেকে আমদানি পর্যায়ে আগাম কর (এটি) কেটে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে হিসাব সমন্বয়ের পর যদি দেখা যায়, প্রকৃত মূল্য সংযোজনে আগাম করের চেয়ে পরিশোধযোগ্য ভ্যাটের পরিমাণ কম হয়েছে, তাহলে আইন অনুযায়ী কর্তিত করের বাকী অংশ রিফান্ডযোগ্য হয়ে পড়ে।
তবে এই রিফান্ড দাবি করা প্রচলিতভাবে দীর্ঘ ও ব্যয়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কর অফিসে বারবার যেতে হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় ৬ হাজার বাণিজ্যিক আমদানিকারক রয়েছে, এর মধ্যে একটি বড় সংখ্যকেরই নিয়মিত রিফান্ড তৈরি হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাভিত্তিক এক ব্যবসায়ী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "রিফান্ড পেতে তিন বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়, আর টাকা ছাড় করাতে প্রায় ২০ শতাংশ কর্মকর্তাদের পেছনেই খরচ হয়ে যায়।"
ফয়সাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোলায়মান পার্সি ফয়সাল বলেন, বিদ্যমান ম্যানুয়াল ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। তিনি বলেন, "এনবিআরের কাছে রিফান্ড ক্রিয়েট হলে বর্তমান বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করে- তা আদায় করতে গেলে কর্মকর্তারা জিম্মি করে ফেলেন। অনেক ডকুমেন্টস চান এবং হয়রানি করেন।"
"এতে অনেক সময় চলে যায় এবং বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়" –যোগ করেন তিনি।
ফয়সাল বলেন, "রিফান্ড ব্যবস্থাকে অনলাইন করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দাবি ছিল। অনলাইন করা হলে হিউম্যান ইন্টারেকশন কমে যাবে, ফলে হয়রানি ও বাড়তি খরচের ঝামেলা কমে আসার সুযোগ তৈরি হবে।"
আস্থা ফেরানোর সুযোগ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
এনবিআরের সাবেক সদস্য লুৎফর রহমান বলেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এই উদ্যোগ করদাতা ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
টিবিএসকে তিনি বলেন, "যেসব দেশে কমপ্লায়েন্ট কর ব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে রিফান্ড অটোমেটিক্যালি করদাতার একাউন্টে জমা হয়। এ কারণে মানুষ কর দিতেও আগ্রহী হয়। কিন্তু, বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার অনুপস্থিতি করের বিষয়ে অনেকেরই অনীহার অন্যতম একটি কারণ।"
তিনি আরও বলেন, করদাতা ও রাজস্ব কর্মকর্তা—দুই পক্ষের মধ্যেই অবিশ্বাস রয়েছে, ফলে অনেক ব্যবসায়ী পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে চান না। তবে বাড়তি আদায় করা কর অটোমেটিক ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার হলে, হয়রানি কমার পাশাপাশি মানুষ যথাযথ ট্যাক্স প্রদানে উৎসাহী হবেন। ভ্যাট ব্যবস্থায় চালু হলেও দ্রুতই আয়কর ও কাস্টমসেও অনলাইন রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করা দরকার। এজন্য অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করাকে সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংশয় কাটেনি পুরোপুরি
তবে অনলাইন রিফান্ডের আশাবাদের মধ্যেও কিছু ব্যবসায়ী নেতা সংশয় প্রকাশ করেছেন।
ইস্পাত আমদানিকারক ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমির হোসেন নূরানি বলেন, কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান এখনো জরুরি। "আমার ক্ষেত্রে প্রকৃত ভ্যালু এডিশন হয় ১ শতাংশের কম, অথচ আমাকে আমদানি পর্যায়ে পরিশোধ করতে হয় ৭.৫ শতাংশ। বাকী অর্থ এপর্যন্ত রিফান্ড পাইনি।"
"রিফান্ড পাওয়ার শর্ত যদি সহজ করা না হয়, এবং তাহলে অনলাইন-ভিত্তিক করা হলেও রিফান্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হবে না"– বলেন তিনি।
রিফান্ড কেন তৈরি হয়
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, আমদানি পর্যায়ে পরিশোধিত কর প্রকৃত ভ্যাট দায়ের চেয়ে বেশি হলে মূলত রিফান্ড তৈরি হয়। "যেমন দেখা গেল কারো ভ্যাটের পরিমাণ হবে ৩০ টাকা, কিন্তু পরিশোধ করেছেন ৫০ টাকা। বাকী ২০ টাকা তার রিফান্ড হওয়ার কথা।"
আবার একই সার্ভিসের ক্ষেত্রে দুই দফায় ভ্যাট কর্তন করা হলে রিফান্ড তৈরি হয়। কিংবা ভ্যাট মওকুফ থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিমুখী শিল্পে আমদানিকৃত কাঁচামালে ভ্যাট বা অগ্রিম কর পরিশোধ করলে সেখানেও রিফান্ড সৃষ্টি হয়।
"আইন অনুযায়ী এসব রিফান্ড পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যবসায়ীরা এসব অর্থ পাওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের হয়রানি, ঘুষ ও বছরের পর বছর অপেক্ষার মুখে পড়েন। নতুন করে অনলাইন পদ্ধতিতে রিফান্ড ব্যবস্থা চালু হলে এসব হয়রানি কমবে" – যোগ করেন স্নেহাশীষ।
৩–১০ দিনের মধ্যে রিফান্ড
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন ভ্যাটের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদনের পর রিফান্ড পেতে ৬ মাস বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি সময় লেগে যেত। পুরোদমে অনলাইনে পদ্ধতিতে রিফান্ড ব্যবস্থা চালু হলে ৩ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে এই রিফান্ড পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এজন্য কিছু শর্ত মানতে হবে বলে জানান তারা।
ঢাকার একজন ভ্যাট কমিশনার টিবিএসকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনলাইনে রিফান্ড পেতে হলে অবশ্যই রিটার্ন জমা দিতে হবে অনলাইনে। বর্তমানে এনবিআরে যত ভ্যাট রিটার্ন জমা হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশ অনলাইনে জমা হয়।
নতুন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়ই প্রয়োজনীয় নথিপত্র ডিজিটালি আপলোড করার ব্যবস্থা থাকবে। আবেদন আসার পর তা ডিভিশন অফিস পরীক্ষা করবে, যেখানে ২৪টি পয়েন্ট বিবেচনা করা হবে। এসব বিষয় সঠিকভাবে পাওয়া গেলে- তা অনুমোদনের জন্য কমিশনারের কাছে পাঠানো হবে। কমিশনারের অনুমোদনের পর প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে প্রযোজ্য রিফান্ড এর অর্থ সরাসরি ট্রান্সফার হবে।
"এজন্য ব্যবসায়ী বা তার প্রতিনিধির ভ্যাট অফিসে আসার প্রয়োজন হবে না"– বলেন ওই কর্মকর্তা। "কিন্তু যদি কোনো ডকুমেন্ট এর ঘাটতি থাকে, বা কোথাও কর্মকর্তাদের অবজার্ভেশন থাকে, কেবল সেক্ষেত্রে অফিসে এসে ওই ডকুমেন্ট জমা দিতে হবে।"
