পাইপলাইন লিকেজে তীব্র গ্যাস সংকট, ভোগান্তিতে ঢাকাবাসী
রাজধানীর কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা আক্তার (৬০) জানান, সকালে সাধারণত চুলায় গ্যাস না থাকায় ফজরের নামাজের পরই সারাদিনের রান্না সেরে নিতে হয়। তবে গত তিন দিন ধরে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একেবারেই গ্যাস না থাকায় তাদের হোটেল থেকে সকালের নাস্তা কিনে খেতে হচ্ছে।
একই চিত্র মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দাদেরও। মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির এক বাসিন্দা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আজ (বুধবার) সকালে আমার বাসায় নাস্তা হয়েছে শুধু বিস্কুট দিয়ে। দোকানে ব্রেড পাওয়া যায়নি। রুটি-পরোটার হোটেলগুলোতে দীর্ঘ লাইন। আমি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করি, আমাদের স্কুলে ডে-কেয়ারও আছে। শিশুদের জন্য স্কুলেই রান্না হয়, কিন্তু গ্যাস না থাকায় গত দুই দিন তা বন্ধ। ছোট বাচ্চাদের হোটেল থেকেই খাবার কিনে দিতে হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "গ্যাস না থাকায় বাড়ির সিনিয়র ও জুনিয়র সদস্যদের খাবার ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। তাদের খাবারে নানা বিধিনিষেধ থাকে। এই সুযোগে ইনডাকশন চুলা ও রাইস কুকারের দামও বেড়ে গেছে। আমার এক সহকর্মীকে বাড়তি দাম দিয়ে ইনডাকশন চুলা কিনতে হয়েছে।"
তীব্র গ্যাস সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অপারেশন ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমিনবাজার থেকে আসা গ্যাস পাইপলাইনটি বুড়িগঙ্গা নদীর নিচে লিকেজ হয়েছে। ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় গ্যাসের চাপ কমিয়ে রাখা হয়েছে।"
রাজধানীর কাফরুল, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়াসহ অধিকাংশ আবাসিক এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। অনেক বাসাবাড়ির পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে চুলা জ্বলছে না। কোথাও কোথাও ভোর বা গভীর রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাস মিললেও তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক পরিবার একবেলার খাবার রান্না করতেই হিমশিম খাচ্ছে, ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিনের জীবনযাত্রা।
সাইদুল হাসান আরও বলেন, "গত তিন দিন ধরে কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল একসঙ্গে মেরামতের কাজ করছে। বুধবার একটি লিক ক্ল্যাম্প বসানো সম্ভব হয়েছে, তবে পুরোপুরি মেরামত শেষ হয়নি। বিশেষ আকারের নতুন লিক ক্ল্যাম্প তৈরি করে আবার কাজ শুরু করতে হবে। আপাতত লিকেজের পরিমাণ কিছুটা কমানো গেছে। ধাপে ধাপে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হবে।"
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, শনিরআখড়া, মগবাজারের নয়াটোলা, চেয়ারম্যানগলি, রামপুরা, বাড্ডা, বাসাবো এবং পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার ও লক্ষ্মীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, গত এক মাস ধরে তাদের বাসায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একেবারেই গ্যাস থাকে না। গত তিন দিন ধরে পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ।
তিনি বলেন, "আজ সকালে গ্যাস না থাকায় নাস্তা না করেই অফিসে যেতে হয়েছে। হোটেলে গেলেও দীর্ঘ লাইনের কারণে খাবার পাওয়া যাচ্ছে না।"
এ বিষয়ে সাইদুল হাসান বলেন, "গ্যাস না থাকার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে। মূলত ওই এলাকায় গ্যাস সঞ্চালন লাইনে লিকেজ দেখা দেওয়ায় সরবরাহ কমানো হয়েছিল। কয়েক দিনের চেষ্টায় লিকেজের স্থান চিহ্নিত করে তা সারানো হয়েছে। এখন ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। আশা করছি দুই-এক দিনের মধ্যেই সংকটের সমাধান হবে।"
ঢাকার অন্যান্য এলাকার সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "তিতাসের বৈধ গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অবৈধ সংযোগের কারণে কিছু এলাকায় বৈধ গ্রাহকরাও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। আমরা অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু তিতাস একা এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।"
তিনি বলেন, "পরিস্থিতি অনেকটা চোর-পুলিশ খেলার মতো। আমরা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গেলে আবারও অবৈধভাবে সংযোগ স্থাপন করা হয়। এতে বৈধ গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। তিতাসের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। তা না হলে গ্যাস সংকট কাটানো কঠিন হবে।"
এদিকে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাস বা সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করছেন ভোক্তারা।
