ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ভারতেও গ্যাস সংকট, বন্ধের মুখে হাজারো হোটেল-রেস্তোরাঁ
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের প্রভাবে তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়েছে ভারত। রান্নার গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় দেশটির হাজার হাজার হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ভারতের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও হোটেল মালিকরা ব্যবসায়িক অচলাবস্থা এবং সম্ভাব্য শাটডাউনের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং শিল্প খাতের অনুরোধ পর্যালোচনায় ইতিমধ্যে একটি প্যানেল গঠন করেছে ভারত সরকার।
যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ ব্যাহত
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের ফলে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি কাতার ও সৌদি আরবের মতো শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলপিজি আমদানিকারক দেশ ভারত গত সপ্তাহে জরুরি ক্ষমতা বলে শোধনাগারগুলোকে শিল্প খাতের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ বা গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের জন্য উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির সেবা খাত প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ পেতে হিমশিম খাচ্ছে।
সংকটে ব্যবসায়ীরা
ভারতের বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লি ও নয়ডায় ১০০টিরও বেশি শাখা থাকা মেক্সিকান ফুড চেইন 'ক্যালিফোর্নিয়া বারিটো'-এর প্রতিষ্ঠাতা বার্ট মুলার বলেন, 'আমাদের কাছে মাত্র দুই দিনের এলপিজি স্টক আছে। আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছি। বর্তমানে আমরা গ্যাস সাশ্রয় করছি এবং কিছু কিছু শাখায় ইনডাকশন স্টোভ (বৈদ্যুতিক চুলা) বসানোর কাজ শুরু করেছি।'
প্রায় ৫ লাখেরও বেশি রেস্তোরাঁ পরিচালনাকারী ভারতের ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (এনআরএআই) সোমবার খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে যে, রেস্তোরাঁ শিল্প মূলত বাণিজ্যিক এলপিজির ওপর নির্ভরশীল।
এনআরএআই তাদের চিঠিতে সতর্ক করে বলেছে, 'গ্যাস সরবরাহে যেকোনো ধরনের ব্যাঘাত এই শিল্পে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবে।' ফেডারেশন অফ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়াও (এফএইচআরএআই) এই সংকট নিরসনে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে।
দাম বৃদ্ধি ও আমদানিতে ধস
ভারত তার বার্ষিক এলপিজি চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। যুদ্ধের কারণে আমদানিকৃত গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় কোম্পানিগুলো প্রায় এক বছর পর এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলার পর গত সপ্তাহে ভারতের বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতার উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।
রান্নাঘরও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা
ভারতের সিলিকন ভ্যালি হিসেবে পরিচিত বেঙ্গালুরুর অনেক রেস্তোরাঁ জানিয়েছে, সিলিন্ডার সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বেঙ্গালুরুর 'উডুপি ফুড হাব'-এর পরিচালক মনিষ ভি শেঠি রয়টার্সকে বলেন, 'আজ আমাদের একটি রেস্তোরাঁ কোনো গ্যাস সিলিন্ডার পায়নি। ভাগ্য ভালো যে আমাদের একজন পুরনো সরবরাহকারী সাহায্য করেছেন, কারণ আমরা বাকি না রেখে নগদ টাকায় পেমেন্ট করি।' তিনি আরও জানান, রান্নার কাজে ব্যবহৃত সানফ্লাওয়ার অয়েলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
বেঙ্গালুরু হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বীরেন্দ্র কামাত বলেন, 'নিরাপত্তার কারণে খুব কম রেস্তোরাঁই এলপিজি সিলিন্ডার মজুত রাখে, তারা নিয়মিত সরবরাহের ওপর নির্ভর করে।'
এনআরএআই-এর বেঙ্গালুরু শাখার অনন্ত নারায়ণ এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত 'গুরুতর' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, অধিকাংশ কোম্পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি যেসব রেস্তোরাঁর কাছে কিছু গ্যাস মজুত আছে, তাও এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য শিল্পে এলপিজি সরবরাহের আবেদনগুলো পর্যালোচনার জন্য ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ প্যানেল গঠন করেছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা কাটবে না বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
