যুক্তরাষ্ট্রে বসে ঢাকায় রিমোট–কন্ট্রোলড ল্যাবে অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ চাষ, নারী সহযোগী ও কেয়ারটেকার আটক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত ক্যানাবিস চাষের কৌশল শিখে রাজধানীর ওয়ারীতে রিমোট–কন্ট্রোলড ল্যাব বসিয়ে অপ্রচলিত মাদক 'কুশ' (এক ধরনের গাঁজা) চাষ করছিলেন তৌসিফ হাসান (২২) নামের এক যুবক।
সম্প্রতি গাজীপুরে এক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রগামী মাদকভর্তি একটি পার্সেল আটক হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
তদন্তকারীরা জানান, 'কুশ' চাষ ও পাচারের এই নেটওয়ার্কটি ঢাকা থেকে পরিচালিত হলেও তদারকি করা হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে।
ডিএনসির তথ্যমতে, অভিযুক্ত তৌসিফ হাসান ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসের সময় ক্যানাবিস চাষের কৌশল শেখেন। পরে পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকায় নিজের বাসার ভেতরে একটি ল্যাব স্থাপন করেন এবং বিদেশে অবস্থান করেই রিমোট কন্ট্রোল প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবের তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন পরিবেশগত অবস্থা নজরদারি করতেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এ কার্যক্রম পরিচালনায় তার এক বান্ধবীও তাকে সহায়তা করেছেন।
ডিএনসি জানায়, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা হচ্ছে—এমন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার একটি কুরিয়ার অফিসে অভিযান চালিয়ে ৩২টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে গত ৩ জানুয়ারি পার্সেলটি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর জন্য বুকিং দেওয়া হয়েছিল।
ডিএনসি সূত্র জানায়, উদ্ধার হওয়া ইয়াবাগুলো ঢাকায় অবস্থানরত ওই নারী সহযোগী ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা তৌসিফের কাছে পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কুরিয়ার অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই নারীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়েছে।
তাকে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের পর ডিএনসি পুরান ঢাকার ওয়ারীতে তৌসিফের বাসায় অভিযান চালায়। অভিযানের সময় বাড়ির কেয়ারটেকার মো. রাজু শেখকেও (৩৯ বছর) আটক করা হয়।
কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি ওই নারীকে ইয়াবা সরবরাহ করতেন। এ ঘটনায় টঙ্গী পশ্চিম থানায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছে।
ইনডোর ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত হতো 'কুশ'
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তৌসিফের বাসায় ঘরের ভেতরে 'কুশ' চাষের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি ল্যাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। 'কুশ'কে ক্যানাবিসের উন্নত ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি জাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
ওই বাসা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আনা 'কুশ' বীজ, গাছ, সদ্য সংগ্রহ করা কুশ, বিশেষায়িত চাষ ও ধূমপানের সরঞ্জাম এবং বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে।
এছাড়া বাড়ির ছাদের ওপর টিনশিট ও ফয়েল পেপার দিয়ে তৈরি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত একটি কক্ষে 'কুশ' চাষের একাধিক টিউব পাওয়া গেছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ডিএনসির গোয়েন্দা শাখার উপপরিচালক মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। তিনি বলেন, "তৌসিফ একজন মার্কিন নাগরিক। তিনি বছরে কয়েকবার দেশে আসেন। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কুশের বীজ এনে নিজের বাসায় চাষের জন্য ল্যাব স্থাপন করেছিলেন।"
তদন্ত ও পটভূমি
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তৌসিফ পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকায় বড় হন। তার বাবার মৃত্যুর পর মা পুনরায় বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। এরপর দাদা–দাদির কাছে বড় হন তিনি। বাংলাদেশে ও-লেভেল শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে সেখানে নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তবে তিনি বছরে একাধিকবার বাংলাদেশে আসতেন বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তে আরও জানা যায়, ও-লেভেলে পড়ার সময়ই ওই নারীর সঙ্গে তৌসিফের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাকে মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজীপুরে আটক করা পার্সেলটিতে বিশেষভাবে লুকানো অ্যামফেটামিনজাত ইয়াবা বড়ি ছিল। টঙ্গীর ওই কুরিয়ার অফিসে অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ম্যানেজার মো. আবদুল গাফফার (৩৬) এবং কর্মচারী খুরশিদ আলম (৩৫) উপস্থিত ছিলেন।
পার্সেলটির বাণিজ্যিক ইনভয়েসে প্রাপক হিসেবে তৌসিফ হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়। ঠিকানা দেওয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সানফ্রান্সিসকোর ৮২৫ বুশ স্ট্রিট, অ্যাপার্টমেন্ট ৫০১। প্রেরক হিসেবে ঢাকায় অবস্থানরত তার বান্ধবীর নাম উল্লেখ ছিল।
ডিএনসি কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই এবং এই চক্রটি কোনো বৃহৎ মাদক পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
