জ্যাক রিচি-র রোমাঞ্চ গল্প | ২২ তলা উপরে—২২ তলা নিচে

ঘাড়ের রগে টান লেগে গেছে। জায়গাটায় হাত বোলাল ডিটেকটিভ সার্জেন্ট গ্যালেন। এই ধরনের কাজ আমার জন্যে না। ব্যাটার জন্য খারাপ লাগছে না। লোকটা বোধহয় বোকা।
জানালার গোবরাট ধরে আরেকটু বাইরের দিকে ঝুঁকল সে। ভাবতে চেষ্টা করল, আর কী বলা যায় বাইশতলার কার্নিশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই লম্বা, ধীর-স্থির লোকটাকে।
তুমি চাইছ কেউ তোমার হাতটা ধরুক। কেউ বলুক, সবাই তোমাকে ভালোবাসে। কিন্তু দুঃখিত, মিস্টার, দুনিয়াটা এমন না। তুমি মরো কি বাঁচো, তাতে কারও কিছু যায়-আসে না।
বাতাসের টান লেগে মাথার হ্যাট সরে যাওয়ার উপক্রম হতেই হাত দিয়ে আটকাল গ্যালেন। ইশ, কথাগুলো যদি মুখ ফুটে বলতে পারতাম! বলতাম, আগে মন ঠিক করো। নাটক বন্ধ করো। হয় ফিরে এসো, নইলে লাফ দাও।
মাথার চুল ধূসর হতে শুরু করেছে দীর্ঘদেহী লোকটার। ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে হাসল সে। 'দুঃখিত...খুব ঝামেলায় ফেলে দিলাম আপনাদের। আসলে বিশ মিনিট আগেই লাফ দেওয়ার কথা ছিল। হোটেলের ঘরটা ভাড়া নেয়ার সময়ই ঠিক করেছিলাম, সাথে সাথে লাফ দেব। কিন্তু জানালায় দাঁড়ানোর পর মনে হলো, নিচে লোকজন কেউ থাকলে সে-ও আমার সাথে মরতে পারে—অথবা জখম হতে পারে। তাই রাস্তাটা পুরোপুরি ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম।'
বহু কষ্টে নিষ্ঠুর হাসি চাপল গ্যালেন। তুমি বড় বিবেচক মানুষ হে, মিস্টার টার্নার। কিন্তু এখন নিচে কেউ নেই, দোস্ত। লাফ দিলে তুমি একাই পটল তুলবে।
টার্নারের মুখে ক্ষীণ হাসির রেখা। গ্যালেনের মনে হলো, ওর মনের কথা পড়ে ফেলছে যেন লোকটা। ঈষৎ লাজুক হাসি দিল সে। 'বিরাট বোকামি করছেন, মিস্টার টার্নার। টাকা জিনিসটা এত গুরুত্বপূর্ণ না যে এর জন্য...আত্মহত্যা করতে হবে।'
নিচের রাস্তার দিকে তাকাল টার্নার। 'আমি কিন্তু নাটক করতে আসিনি। ইচ্ছা ছিল, কাউকে সাক্ষী না রেখেই কাজটা করব।'
গ্যালেনও তাকাল নিচে। রশি দিয়ে ঘিরে ফেলা জায়গাটার চারদিকে মানুষের ভিড় জমে গেছে। ওরা নিশ্চয়ই বাজি ধরছে তোমাকে নিয়ে। হঠাৎ গ্যালেনের কাঁধে আলতো টোকা পড়ল। ঘুরে দাঁড়াল সে।
প্যাট্রলম্যান হল্যান্ড কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল: 'টার্নারের বউকে পেয়েছি। আসছে। এলিভেটরে আছে।'
নড করল গ্যালেন। 'তুমি লোকটার সাথে কথা চালিয়ে যাও, হল্যান্ড। যতটা পারো, বোঝাও।'
হোটেল ড্রেসারটার দিকে এগিয়ে গেল সে। ফের তুলে নিল টার্নারের ওয়ালেট। এডওয়ার্ড জর্জ টার্নার। জন্ম: ১৯১০। ড্রাইভিং লাইসেন্স, সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড, কিছু স্লিপ আর কার্ড। সাতচল্লিশ ডলার আর কিছু খুচরো।
গ্যালেনের পার্টনার, সার্জেন্ট মরিস হাই তুলে বসে পড়ল বিছানায়। 'চিঠিতে টার্নার লিখেছে, তিরিশ হাজার ডলার হেরেছে ঘোড়ার রেসে বাজি ধরে। চেহারা দেখে তো মনে হয় না এভাবে টাকা ওড়ানোর মতো লোক।'
কাঁধ ঝাঁকাল গ্যালেন। মানিব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলল ড্রেসারের ওপর।
সিগারেট ধরিয়ে ঘড়ি দেখল মরিস। 'লোকটা নাটক খতম করলে ভালো হয়। রাতে বোলিং আছে আমার।'
এই সময় টোকা পড়ল দরজায়। গ্যালেন খুলে দিল।
এক যুবতী দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়। কালো চুল। বয়েস কুড়ির কোঠায়। চোখে সতর্ক দৃষ্টি।

মুখ থেকে সিগারেট নামাল গ্যালেন। 'মিসেস টার্নার?'
মেয়েটি মাথা দোলাতেই কানের হিরের দুল ঝিকমিকিয়ে উঠল।
একপাশে সরে দাঁড়াল গ্যালেন। 'বাইরের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে আপনার স্বামী। হুমকি দিচ্ছে, নিচে লাফ দেবে।'
চোখ সরু করল মেয়েটা। 'ও অমন কাজ করতে যাবে কেন?'
টার্নারের চিঠিখানার ভাঁজ খুলে তার দিকে এগিয়ে দিল গ্যালেন। 'এতে লেখা, অফিস থেকে টাকা চুরি করেছেন উনি। বলছেন, রেসে বাজি ধরে হেরেছেন।'
চিঠিটা পড়তে পড়তে যুবতীর চোখ দুটো যেন খানিকটা ঝিকিয়ে উঠল।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে গ্যালেন। 'আপনি কিছু জানতেন?'
'না, কিছুই না,' গলা চড়িয়ে বলে উঠল মেয়েটি। 'জানব কী করে?'
'আপনি তো ওঁর স্ত্রী।' খানিকটা কৌতূহলী হয়ে উঠল গ্যালেন। 'আপনার স্বামী কেমন মানুষ, মিসেস টার্নার?'
কাঁধ ঝাঁকাল যুবতী। 'নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে। কী ভাবছে না-ভাবছে, বোঝা যায় না।'
'বিয়ের কতদিন হলো আপনাদের?'
'দু'বছর।'
কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করল গ্যালেন। 'আপনার স্বামী তো বয়েসে আপনার চেয়ে অনেকটা বড়, না?'
কণ্ঠস্বর ঝাঁঝালো হয়ে এল মিসেস টার্নারের। 'ভালোবেসে বিয়ে করেছি ওকে।'
গ্যালেন ফের ঘাড়ের রগে হাত বোলাল। টানটা যেন আরও বেড়েছে। 'কথাটা বলুন স্বামীর সাথে। হয়তো ওঁর মত পাল্টাবে।'
নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠল ইলেন টার্নার। কোটের কলার গলা পর্যন্ত তুলে দিল। এবার চোখ চলে গেল স্বামীর দিকে।
টার্নারের চেহারা পাণ্ডুর। চোখ বন্ধ।
রাগের একটা ঢেউ উঠল ইলেনের মনের মধ্যে। হাজার হাজার মানুষের সামনে নিজে তো হাঁদারাম হচ্ছেই, সাথে আমাকেও গর্দভ বানিয়ে ছাড়ছে।
কনুইয়ের কাছে গ্যালেনের উপস্থিতি টের পেল ইলেন। কথা বলার সময় রাগ চাপা দেয়ার চেষ্টা করল সে। 'এডওয়ার্ড, বোকামি কোরো না।'
চোখ মেলে তাকাল টার্নার। 'তোমাকে আবার দেখব, ভাবিনি, ডিয়ার।'
এবার আর কথায় রাগ লুকাতে পারল না ইলেন। 'নিজেকে সবার সামনে বোকা বানিয়ে ছাড়ছ তুমি। সাথে আমাকেও।'
ফ্যাকাসে হাসি ফুটল টার্নারের ঠোঁটে। 'দুঃখিত। বুঝতে পারছি, এর আগে কখনও এভাবে স্বামী হারাওনি তুমি।'
চোরাচোখে গ্যালেনের দিকে তাকাল ইলেন। 'চিঠিতে নাকি লিখেছ, অফিস থেকে টাকা চুরি করেছ তুমি?'
নড করল টার্নার—হাসিটা এবার চোখ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
গ্যালেনের চোখ এখন ওর ওপর স্থির, টের পেল ইলেন। নার্ভাস ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়ে ধরল সে। 'আমি কিছুই জানতাম না, এডওয়ার্ড। তুমি আমাকে কিছুই বলোনি। কসম খেয়ে বলছি।'
প্রায় অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাসল টার্নার। 'হ্যাঁ, তুমি আসলেই কিছু জানতে না, ডিয়ার। টাকাটা আমি রেসের ট্র্যাকে উড়িয়ে দিয়েছি।'
গ্যালেনের দিকে ফিরল ইলেন। 'আপনাকে কি কান পেতে আমাদের কথা শুনতেই হবে?'
একনজর টার্নারকে দেখে নিয়ে জানালা থেকে সরে এল গ্যালেন।
ফের স্বামীর দিকে তাকাল ইলেন। টার্নার এবার তার চোখে চোখ রাখল। 'মামুলি এক অফিস ম্যানেজার প্রতি মাসে কীভাবে বেতনের তিনগুণ টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরে, তুমি কখনও ভেবেও দেখনি, তাই না?' শুকনো গলায় বলল সে।
মুখটা আরক্ত হয়ে উঠল ইলেনের। 'ভাবতাম, তোমার সেভিংস থেকে আনছ।'
'সেই সেভিংস তুমি প্রথম বছরেই শেষ করে ফেলেছ। মনে নেই?'
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল ইলেনের। 'সব তো ঠিকঠাকই সামলে নিচ্ছিলে। এখন এই নাটক কেন?'
রাস্তার ওপারের গির্জার ঘড়ির দিকে তাকাল টার্নার। 'অডিট হবে, মাই ডিয়ার। দু'-একদিনের মধ্যেই হিসাব খতিয়ে দেখা হবে।' স্ত্রীর দিকে ফিরে আবার হাসল সে। 'তোমার ফার কোট আর গয়নাগুলো লুকিয়ে রেখো। আমি যে রেসে টাকা খুইয়েছি, পুলিশ বিশ্বাস না-ও করতে পারে।'
ধক করে জ্বলে উঠল ইলেনের দু'চোখ । 'ওগুলো আমার। কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।'
ফের হাসল টার্নার। 'তুমি লড়বে, আমি জানি। ওগুলো তোমার খুব প্রিয়।'
'এভাবে মরে তুমি কারও কোনো উপকার করছ না। বীমার একটা পয়সাও আমি পাব না, জানো তো?'
টার্নারের চোখের চারপাশের চামড়ায় কুঁচকে গেল। 'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। ব্যাপারটা নিয়ে আমি ভেবেছিও। দায়িত্বজ্ঞান তো আমার যথেষ্টই আছে, মাই ডিয়ার। ব্যবস্থা করে রেখেছি; কিছুদিন অন্তত তোমার কোনো কষ্ট হবে না। আমি নিশ্চিত, বছর দুয়েকের মধ্যে তোমার দেখাশোনা করার মতো কাউকে ঠিকই খুঁজে পাবে, ইলেন।'
স্ত্রীর চোখে চোখ রাখল সে। 'আমার ঘরের ড্রয়ারে একটা সেফ-ডিপোজিট বক্সের চাবি আর একটা চিঠি রেখেছি। ওতে যা লেখা আছে, সে অনুযায়ী কাজ করলেই দশ হাজার ডলার পেয়ে যাবে।'
নিঃশব্দ হাসিতে ঠোঁটজোড়া প্রসারিত হয়ে গেল তার। 'ওটাও অফিসের টাকাই। তবে তুমি ওটাকে আমার বীমা মনে করতে পারো।'
স্বস্তির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল ইলেনের ভেতরে। মনে পড়ে গেল, দ্বিতীয় স্বামী মারা যাওয়ার পর কী ধাক্কাটাই না খেয়েছিল ও। একটা ফুটো কড়ি রেখে যায়নি লোকটা। বাড়িটা বন্ধক দেয়া ছিল, এমনকি বীমার ওপরেও ঋণ নেয়া ছিল। সব ঝামেলা মিটিয়ে হাজার ডলারও আসেনি হাতে।
তখন ফের চাকরি নিতে হয়েছিল ইলেনকে। উফ্, সে কী কষ্ট! শর্টহ্যান্ড প্রায় ভুলেই বসেছিল, নখ কেটে ফেলতে হয়েছিল টাইপরাইটার চালানোর জন্যে। সুন্দর হাত দুটোর বারোটা বেজে গিয়েছিল।
ওর চোখ গেল স্বামীর দিকে। ইলেন জানে, এডওয়ার্ডের অফিসে ও চাকরি নেয়ার আগে লোকটার জীবন ছিল বড্ড নীরস। সকাল থেকে সন্ধে অবধি অফিস, তারপর নিঃসঙ্গ এক ফ্ল্যাটে ফেরা—ব্যস, এ-ই ছিল এডওয়ার্ডের জীবন। ইলেনই শিখিয়েছে ওকে, জীবন উপভোগ কাকে বলে, কীভাবে আনন্দে থাকতে হয়, কোন্ কোন্ জায়গায় গেলে দেখা যায় মানুষ।
আপনমনেই হেসে ফেলল ইলেন। এডওয়ার্ডকে পেতে মোটেই পেতে হয়নি। লোকটা মনোযোগ পেতে অভ্যস্ত ছিল না। কোনো আকর্ষণীয় রমণীর সান্নিধ্য পাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
হঠাৎ মুহূর্তের জন্যে এডওয়ার্ডের সেক্রেটারি, মিস অ্যাডামসের কথা মনে পড়ে গেল ইলেনের। মাথা নাড়ল ও। নজরে পড়তে হল সাজতে জানতে হয়। প্রাণবন্ত হতে হয়। শুধু বছরের পর বছর মুখ গুঁজে কাজ করা, চুপচাপ বুদ্ধিমতী হয়ে থাকাটা বোকামি।
স্বামীর দিকে তাকাল ও। এডওয়ার্ড হয়তো ঠিকই বলছে। এভাবে শেষ হওয়াটাই বোধহয় ভালো।
অকস্মাৎ বুক কেঁপে উঠল ইলেনের। এখন যদি মত পাল্টা লোকটা? যদি লাফ না দেয়? তাহলে তো দশ হাজার ডলারও কপালে জুটবে না। ওর ফার কোট, গয়নাগুলোও হয়তো কেড়ে নেবে পুলিশ।
চিন্তাটাই আতঙ্কে জমিয়ে দিল ইলেনকে।
একটা নতুন সিগারেট ধরাল গ্যালেন। জানালার পাশে দাঁড়ানো মিসেস টার্নারের দিকে তাকিয়ে খানিকটা বিতৃষ্ণা বোধ করল। মহিলা কী বলছে, শুনতে পারলে ভালো হতো। পরক্ষণেই কাঁধ ঝাঁকাল সে। শুনে লাভ কী? মহিলা যা-ই বলুক না, কথাগুলোর তেমন প্রভাব পড়ছে না টার্নারের ওপর।
সার্জেন্ট মরিস ফোন তুলল। 'আমি কফি আর স্যান্ডউইচ আনাচ্ছি। তুমি কিছু খাবে?'
ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল গ্যালেন। 'ধরো, খাবারটাও এল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিল লোকটা। খিদে নষ্ট হয়ে যাবে না?'
কোন বিকার দেখা গেল না মরিসের মধ্যে। 'আমি অত সংবেদনশীল মানুষ না। আমার পেটই আমার আত্মা।'
গ্যালেনেরও খিদে পাচ্ছিল, তবুও মাথা নাড়ল সে। 'আমার জন্য শুধু কফি বলো।'
এই সময় টোকা পড়ল দরজায়। গ্যালেন হাত বাড়িয়ে দরজাটা খুলে দিল।
ছোটখাটো গড়নের নার্ভাস এক লোক দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। রিমলেস চশমার ওপাশ থেকে চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে। 'আমি হেনরি ওয়েলচ। আমাকে এখানে ডেকে আনার কারণ বুঝলাম না। আমি কিছুই করতে পারব না।'
লোকটাকে আপাদমস্তক দেখল গ্যালেন। 'তা হয়তো করতে পারবেন না, তবুও আমাকে সব চেষ্টাই করতে হবে। টার্নার চিঠিতে লিখেছে, সে তোমার অফিস থেকে টাকা চুরি করেছে।'
'ওটা আমার অফিস না,' খিটখিটে গলায় বলল ওয়েলচ। 'আমি স্রেফ অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। মালিক মিস্টার চেম্বার্স।'
লম্বা দম নিল গ্যালেন। 'মিস্টার চেম্বার্স কোথায়?'
'ফ্লোরিডায়,' তিক্ত কণ্ঠে বলল ওয়েলচ। 'সবসময় ওখানেই থাকেন।'
কাঁধ ঝাঁকাল গ্যালেন। 'তাহলে তোমাকে দিয়েই কাজ চালিয়ে নেব। তুমি তো অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। তোমার হয়তো সন্দেহ হচ্ছিল, টার্নার টাকা আত্মসাৎ করছে।'
'আমি কিছুই জানতাম না,' গলা শক্ত করে বলল ওয়েলচ। 'নিজের কাজ নিয়েই থাকি আমি। আশা করি অন্য কেউও আমার কাজে নাক গলাবে না।'
জানালার পাশ থেকে ইলেন বলল, 'সার্জেন্ট, আমি বোধহয় কিছুই করতে পারব না। আমার স্বামী মনস্থির করে ফেলেছে, লাফ দেবেই।'
ওর দিকে তাকাল গ্যালেন। মেয়েটার ধারণা, চেষ্টা করেও লাভ নেই। এখন অপেক্ষা করছে নাটকের পরিণতির জন্যে।
ওয়েলচের দিকে ফিরল সার্জেন্ট ডিটেকটিভ। 'তুমি কথা বলো ওর সাথে।'
মুখব্যাদান হয়ে গেল ওয়েলচের। 'ওর নিজের বউই সাহায্য করতে পারছে না, আমি কী বলব?'
'জানি না,' খেঁকিয়ে উঠল গ্যালেন। 'কেউই জানে না। কিন্তু এসেছ যখন, চেষ্টা করে দেখ। একটা শব্দ—হয়তো কোনো একটা শব্দই ওকে ফিরিয়ে আনতে পারে। ওই শব্দটা খুঁজে বের করতে হবে আমাদের।'
ওয়েলচ মাথা নাড়ল। 'কোনো লাভ নেই।'
রাগে কটমট করে তার দিকে চেয়ে রইল গ্যালেন।
ওর অগ্নিদৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে গেল ওয়েলচ। কাঁচুমাচু করে বলল, 'বেশ, চেষ্টা করব। না বলার সুযোগ তো দেখি না।'
জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে আতঙ্কে জমে গেল সে। গোবরাট আঁকড়ে ধরল সর্বশক্তি দিয়ে।
টার্নার চেয়ে আছে সোজা সামনের দিকে। গির্জা টাওয়ারের ঘড়িটা দেখছে বোধহয়।
দম আটকে ফেলল ওয়েলচ। ব্যাটা এখনই লাফ দেবে। পষ্ট বুঝতে পারছি। এক্ষুনি দেবে লাফ!
ফিসফিস করে তাড়া দিল গ্যালেন: 'কিছু একটা বলো—জলদি!'
মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল ওয়েলচ। দেখল, টার্নারের ডান পা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে কিনারার দিকে। আর পাঁচ সেকেন্ড—তারপর সব শেষ।
গ্যালেন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল ওকে। 'টার্নার!' গর্জে উঠল সে। 'মিস্টার ওয়েলচ তোমার সাথে কথা বলতে চায়।'
ইতস্তত করতে লাগল টার্নার। ভুরু কুঁচকাল—বাধা পেয়ে বিরক্ত হয়েছে হয়তো। তারপর শরীরটা একটু শিথিল করল।
ওয়েলচকে ফের ঠেলে দেয়া হলো জানালার সামনে। 'ঠিক আছে,' বিরক্ত গলায় বলে উঠল অ্যাসিস্ট্যন্ট ম্যানেজার । 'কথা বলব ওর সাথে। এত খারাপ ব্যবহার করার কিছু নেই।'
গলা খাঁকারি দিল সে। 'মিস্টার টার্নার, এসবের কোনো দরকার নেই। নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করা যাবে।'
ভুরু উঁচিয়ে হাসল টার্নার। 'তুমি এখানে কী করছ, হেনরি?'
ওর কণ্ঠে সেই পরিচিত রাগের সুর টের পেয়ে পাক খেয়ে উঠল ওয়েলচের পাকস্থলি। তুমি এখানে কী করছ, হেনরি? দুপুরের মধ্যে ভাউচারগুলো রেডি রেখো, হেনরি। তোমার জন্য আরেকজন কেরানি নিলাম, হেনরি। তোমার একজন কেরানিকে ছাঁটাই করে দিলাম, হেনরি। আজকে একটু ওভারটাইম করতে হবে, হেনরি। গুড মর্নিং, হেনরি। গুড নাইট, হেনরি।
বাতাসের বিপরীতে গলা চড়াল ওয়েলচ। 'এভাবে কিছুই মিটবে না, মিস্টার টার্নার। আমি নিশ্চিত, আপনি টাকা ফেরত দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।'
নিস্তেজ, ফ্যাকাসে হাসি দিল টার্নার। 'তোমার বুঝি তা-ই মনে হয়, হেনরি?'
তোমার বুঝি তা-ই মনে হয়, হেনরি? না, আমার তা মনে হয় না। আমি, হেনরি, তা মনে করি না। গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, ব্যাটা? লাফ দে! মর্!
তেতো একটা স্বাদ জমে আছে ওয়েলচের মুখে। তুই মরার পর মিস্টার চেম্বার্স নিশ্চয়ই নতুন কাউকে বসাবেন ম্যানেজারের চেয়ারে। আমি যে পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এই অফিসে খেটে মরছি, তাতে কিছু যায়-আসে না। আমাকে ওই চেয়ারে বসানোর কথা কখনও কেউ ভাবেনি। মিস্টার চেম্বার্স লম্বা-চওড়া, সুদর্শন কাউকে চাইবেন। এমন কাউকে এনে বসাবেন, যে এসে অফিসের টাকা চুরি করবে।
পেছন থেকে গ্যালেনের বিরক্ত গলা শুনতে পেল সে। 'কথা চালিয়ে যাও।'
ঘুরে দাঁড়াল ওয়েলচ, মুখে অসন্তোষের ছাপ। 'দেখছেন না, কোনো কাজ হচ্ছে না?'
গ্যালেনের চোখে সন্দেহের ছায়া। 'তুমি কি চাইছ, লোকটা লাফ দিক?'
'মোটেই না,' চটজলদি বলল ওয়েলচ। 'কিন্তু আমার আসলেই কিছু করার নেই।'
রাগে দাঁতে দাঁত চেপে ফের টার্নারের দিকে তাকাল সে। লাফ দাও, মিস্টার টার্নার। এখনই। এক্ষুনি!
আচমকা হ্যাঁচকা টানে ওকে ঘরের ভেতর নিয়ে এল গ্যালেন।
টাই ঠিক করে নিল ওয়েলচ। 'আসলেই বুঝতে পারছি না, লোকটাকে আর কী বলব, সার্জেন্ট।'
দেখল, জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি মারছে গ্যালেন।
তোমারও তো কিছু করার নেই। অত মরিয়া হয়ে চেষ্টা করার কী আছে?
গ্যালেনের চোখ চলে গেল গির্জার টাওয়ারের ঘড়ির দিকে। ছ'টা বাইশ।
ওর দিকে তাকাল টার্নার। 'অধৈর্য হবেন না, সার্জেন্ট। সাড়ে ছ'টায় লাফ দেব। নিখুঁত সময়। আমি বোধহয় মনে-প্রাণেই হিসাবরক্ষক।'
হাওয়ার ঝাপটা থামার আগপর্যন্ত অপেক্ষা করল গ্যালেন। তারপর বলল, 'তুমি নিশ্চয়ই রেসের ট্র্যাকে এন্তার সময় কাটিয়েছ। চমৎকার জায়গা হায়ালিয়া।'
'হ্যাঁ,' বলল টার্নার। 'অনেক টাকা খুইয়েছি ট্র্যাকে।'
টাকরায় জিভ ঠেকিয়ে চুকচুক আওয়াজ করল গ্যালেন। 'রোজ এতদূর যাওয়া-আসা করতে নিশ্চয়ই কষ্ট হতো। হায়ালিয়া তো এখান থেকে প্রায় বারোশো মাইল দূরে।'
কাঁধ ঝাঁকাল টার্নার। 'আমি নামধাম ঠিকঠাক মনে রাখতে পারি না। এখানকার কোনো রেস ট্র্যাকেই যেতাম।'
এবার গ্যালেনের কথার সুর বদলে গেল। 'তুমি আসলে টাকাটা বউয়ের পেছনে খরচ করেছ, টার্নার।'
মাথা নেড়ে অস্বীকার করল অপরজন । 'না। সব টাকা রেসে উড়িয়েছি। এক পয়সাও বাকি নেই।'
তাচ্ছিল্যের হাসি দিল গ্যালেন। 'কিছু মানুষ আছে, কোনো মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেবার আগে নিজের ব্যাংকে কত টাকাপয়সা আছে সেটা দেখায়। তোমাকে ওরকম মানুষ মনে হচ্ছে।'
লাল হয়ে উঠল টার্নারের চেহারা।
'আর ঠিক এই কারণেই মানতে কষ্ট হচ্ছে, তুমি বউকে পথে বসিয়ে চলে যাবে,' বলে চলল গ্যালেন। 'আত্মহত্যা করলে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি কিন্তু তোমার বউকে একটা টাকাও দেবে না।'
কিছু বলল না টার্নার।
'তুমি মরার পর আমরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খতিয়ে দেখব, টার্নার। সবকিছু। ব্যাপারটা এখানেই শেষ হবে না। তোমার বউ যদি বড়সড় কোনো খরচ করে ফেলে, সে-ও বিপদে পড়তে পারে।'
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা টার্নারের দিকে তাকিয়ে রইল গ্যালেন কিছুক্ষণ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ব্যাটাকে ফিরিয়ে আনার মতো আর কিছু মাথায় আসছে না। ওকে ফেরানোর মতো কোনো শব্দই কি নেই? জানি না।
টার্নারের মুখে ম্লান হাসি। 'আপনি বোধহয় চাইছেন, আমি যেন এখুনি লাফ দিয়ে সব ঝামেলা চুকিয়ে দিই, তাই না, সার্জেন্ট?'
মুখ খারাপ করে গাল দিতে গিয়েও অনেক কষ্টে নিজেকে সামলাল গ্যালেন। 'না। তুমি একজন মানুষ। আমি চাই তুমি বাঁচো।' ওর চোখ চলে গেল গির্জার ঘড়ির কাঁটার দিকে। ছয়টা আটাশ। 'আর পাঁচটা মিনিট অপেক্ষা করো। অনন্ত কালের বিচারে এই পাঁচ মিনিট কিছুই না।'
ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাসল টার্নার। 'ঠিক বলেছ, সার্জেন্ট। তবুও আমি লাফ দেব—সাড়ে ছয়টাতেই।'
গ্যালেন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল তার দিকে। একটা শেষ চেষ্টা করে দেখতে হবে। 'সবাই একা, টার্নার।'
চমকে উঠল টার্নার। 'এই কথা বললেন কেন?'
এই তো! আসল জায়গায় টোকা পড়েছে, খানিকটা বিস্মিত হয়ে ভাবল গ্যালেন। তুমি নিজেও হয়তো জানো না, টার্নার, টাকা, বউ কিংবা অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে তুমি প্রাণ দিচ্ছ না। তোমার জীবন শূন্য, একা। তুমি নিঃসঙ্গ, ক্লান্ত। জীবনের আর কোনো অর্থ নেই তোমার কাছে। বেঁচে থাকার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছ না।
এই সময় পেছন থেকে ওর কাঁধে হাত রাখল প্যাট্রলম্যান হল্যান্ড। 'মিস অ্যাডামস নামের এক মহিলা এসেছে। মিস ফ্রান্সেস অ্যাডামস।'
ফিরে তাকাল গ্যালেন। মহিলাকে দেখে মনে হলো, ত্রিশের ঘরে বয়স। সাদামাটা চেহারাটা, কিন্তু চোখে কেমন অদ্ভুত একটা চাউনি।
'সম্ভব হলে আমি সাহায্য করতে চাই,' শান্ত কণ্ঠে বলল মহিলা।
জানালার বাইরে উঁকি দিল গ্যালেন। 'টার্নার, একজন ভদ্রমহিলা এসেছেন—মিস অ্যাডামস। তোমার সাথে কথা বলতে চান।'
ভুরু কুঁচকাল টার্নার। 'ওকেও ডেকেছিলে নাকি?'
মাথা নাড়ল গ্যালেন। 'না। ওনার কথাই তো জানা ছিল না।'
টার্নারের চোখে চিন্তার ছায়া, পুরনো কোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেছে যেন। 'হুম, মেয়েটা খুব চুপচাপ। বড় শান্ত। আমার সেক্রেটারি।'
মুহূর্তের জন্যে গ্যালেনকে জানালা থেকে সরে যেতে দেখল টার্নার। অদ্ভুত ব্যাপার, আমার এই কার্নিশে এনে দাঁড়ানোর আসল কারণটা ঠিক ধরে ফেলেছে সার্জেন্ট। আমি নিজেও বোধহয় কখনও সজ্ঞানে বুঝতে পারিনি, জীবনটা এমন শূন্য হয়ে গেছে। আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিচ্ছু নেই আমার জীবনে। সম্পূর্ণ একা আমি।
বিষণ্ন হাসি ফুটল টার্নারের ঠোঁটের কোণে। বউ চায় আমি মরে যাই। কিন্তু তাতে আমার কিছু আসে-যায় না। আর বেচারা হেনরিও আমাকে এতটাই ঘৃণা করে যে ও-ও চায় আমি যেন মরে যাই। কিন্তু আমি মরলেও ওর কোনো লাভ নেই। আমি মরলেও ম্যানেজারের চেয়ারটা ওর হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
মিস অ্যাডামস? আসলে এর আগে ওকে নিয়ে কখনও ভাবিনি। সবসময় কাছে কাছে থেকেছে। চুপচাপ; কিন্তু যখনই দরকার পড়েছে, পাশে পেয়েছি ওকে।
অজস্র গুরুত্বহীন কিন্তু অতিপরিচিত মুহূর্তের স্মৃতি এসে ভিড় জমাল টার্নারের মনে। টার্নারের কখন কী প্রয়োজন, তার মেজাজ কখন কেমন আছে, সব প্রায় নিখুঁতভাবে আন্দাজ করে ফেলত মেয়েটা। নিজে থেকেই গভীর রাত পর্যন্ত খাটাখাটনি করে রিপোর্ট শেষ করে জমা দিয়ে যেত। কখন টার্নারের মাথা ধরতে শুরু করবে, আশ্চর্য ক্ষমতাবলে বুঝে যেত—আর সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে দিত অ্যাসপিরিন আর পানির গ্লাস।
সহসা উচ্চতার ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠল টার্নার। সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে সরে এল দেয়ালের কাছে। কতদিন ধরে আমার সাথে কাজ করছে মেয়েটা? দশ বছর? না, নয়? হ্যাঁ, নয় বছরই। বহু আগেই ওর মনের কথা বুঝে ফেলা উচিত ছিল।
জানালায় উদয় হলো মিস অ্যাডামস। একজন মানুষ। ব্যস, এ-ই যথেষ্ট। মাত্র একজন মানুষ আমাকে চায়—এই সত্যটুকুই যথেষ্ট বেঁচে থাকার জন্যে।
টার্নারের মনে পড়ে গেল, ইলেনকে বিয়ে করার কথা যেদিন জানিয়েছিল, সেদিন কেমন বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল মিস অ্যাডামস। কাগজের মতো সাদা হয়ে গিয়েছিল ওর চেহারা। বিয়েতেও আসেনি।
মিস অ্যাডামসের দিকে তাকিয়ে হাসল টার্নার। কী ভয়ানক কষ্টটাই না পেয়েছিলে তুমি। কী ভীষণ নিঃসঙ্গ, কী ভীষণ একা হয়ে পড়েছিলে। এখন বুঝতে পারছি তোমার অনুভূতি।
কিন্তু টার্নারকে হাসিটা ফিরিয়ে দিল না মিস অ্যাডামস। তার চোখে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল ঘৃণার আগুন। ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, নিঃশব্দে উচ্চারণ করল একটা ক্রোধোন্মত্ত শব্দ।
ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন অতল গহ্বর থেকে ভেসে এল যেন গির্জার ঘণ্টার আওয়াজ। সাড়ে ছয়টার ঘণ্টা।
গ্যালেনের পেছন পেছন এলিভেটরে ঢুকল সার্জেন্ট মরিস। 'লোকটা অন্তত কথা রেখেছে। যখন লাফ দেবে বলেছিল, কাঁটায় কাঁটায় সেই সময় লাফ দিল।'
গ্যালেন চুপচাপ মাথা দোলাল। এলিভেটরের দরজা টেনে বন্ধ করে দিল অপারেটর। ঈশ্বর, ভাবল সার্জেন্ট, ভয়ানক খিদে পেয়েছে।