‘এই এলাকায় সবাই নেতা, মানুষের যাতনা বোঝার মতো একজন মানুষ নাই’

১৪ নভেম্বর। সময় সকাল ৯টা ৩৮। টঙ্গি।
উত্তরা-টঙ্গি হয়ে গাজীপুরের রাস্তা। রাস্তা তো নয় যেন খানা-খন্দক নামের এক মরণফাঁদ পাড়ি দেওয়ার প্রতিযোগিতা। এই পথে চলতে যাদের গাড়ির চেসিস অথবা মেরুদণ্ড স্বাভাবিক থাকবে – তারাই এই পথ পাড়ি দিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসতে পারে। গতকাল থেকে বৃষ্টির সাথে টঙ্গী ব্রিজের ফাটল এই পথ ব্যবহারকারী সব মানুষকে ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। স্কুল-কলেজ অথবা কাজে যাওয়া মানুষের মনের রং এই হেমন্তে মন কেমন করা বৃষ্টিবিলাসে আর রঙিন হয় না। বৃষ্টি-হেমন্ত-কুয়াশা, শীতের আগমন –এই শব্দগুলো এই রাস্তায় চলাচল করা মানুষের মননে, চেতনায় নতুন কোনো বর্ণমালার রং হয়ে আর ধরা দেয় না। ভোরে কাজে ছুটে চলা মানুষগুলো জীবনযুদ্ধের এই খাঁচায় আটকে পড়ে ছটফট করতে থাকে। কখন অফিসের কাছাকাছি অথবা গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে!
ভয়াবহ জ্যাম। হাজার হাজার বাস-ট্রাক থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের ভিড়। বাস-কার কোনো কিছুরই আর সামনে এগুনোর সম্ভাবনা না থাকায় কিছু মানুষ হাঁটতে শুরু করেছে। উদভ্রান্ত পথিকের মতো। সেই কাদা প্যাঁচপেচে রাস্তা ধরে মানুষের ঢল ক্রমেই বেড়ে চলছে। সবাই হাঁটছে। ছুটছে- গন্তব্যে।
মনে পড়ল গত আগস্ট মাসে ঠিক এই স্থানে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার কথা। রাস্তায় চেসিস ভেঙে আটকা পড়েছে মাওয়া-শ্রীপুরগামী একটা বাস। যানজট ছোটাতে মরিয়া একজন ট্রাফিক পুলিশ ছুটে এসে লাঠি দিয়ে কয়েক ঘায়ের সাথে গালি দিল বাস-কন্ডাক্টরকে। ড্রাইভার কোনোরকমে বাসটা এক পাশে একটু সরিয়ে নিল। তাদের পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য একটু ফাঁকা পেয়ে কেটে পড়ছিলাম।
সেই সময় বলা কন্ডাক্টরের কথাগুলো আজো আমার কানে বাজে– 'শালারা বারো বছরে বারো মাইল রাস্তা ঠিক করতে পারে না। গাড়ির আজ এডা ভাঙে তো কাল ওডা ভাঙে – আমাদের পাছায় লাথি আর লাঠি জোটে… আর সারা দেশের … পুতগুলান ব্যস্ত পরিমনিকে নিয়ে!'
কথাগুলো মনে হয়ে হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু একটা দৃশ্য দেখেই আমার ভেতরে হাহাকার করে উঠল। হাসির বদল চোখ দুটো ঝাঁপসা হয়ে উঠল-
স্কুল ড্রেস পরা একজন মেয়ে চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ানোর চেষ্টা করছে। কেডসের ছড়ানো পথের কাদায় মেখে/ভিজে গেছে তার স্কুল ইউনিফর্মের পেছনটুকু। তার বাবাও মেয়ের পাশে অপরাধীর মতো জট ঠেলে ঠেলে মেয়েকে সামনে এগিয়ে দেওয়ার যুদ্ধ করছেন।
পায়ের গতি থামামাত্র বাচ্চাটা কাঁদছে। তার ঠোঁট উলটে যাচ্ছে আবেগের কান্নায়। স্বপ্নভঙ্গের হতাশায়। মেয়েটির আজ সকাল দশটা থেকে এস এস সি পরীক্ষা! আজ যে আমার মেয়েরও পরীক্ষা। মনে হলো মেয়েটা আমারই।
হৃদয় ভেঙে গেল। চোখ ভিজে উঠল। সে আজ পরীক্ষার কেন্দ্রে সময়মতো পৌঁছাতে পারবে তো? সারা বছর কত স্বপ্ন, কত আশা নিয়ে আমাদের বাচ্চারা পড়াশুনা করে –আগামী দিনে তারা যোগ্য নাগরিক হয়ে উঠবে বলে। কিন্তু তাদেরই আগামী দিনকে সুন্দর করতে যে রাষ্ট্র এত বড় বড় মেগা প্রজেক্ট হাতে নিল – কীভাবে তারা সেই 'উন্নয়ন' শব্দ থেকে 'মানবিক' শব্দটা বাদ দিয়ে দিল? সকল উন্নয়নের আগে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা তো সবার আগে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
উন্নয়নের ডামাডোলে চলাচলের জন্য বর্তমানে পথের যে চিত্র তা কোনো সভ্য জনপদের চিত্র হতে পারে না (এমনকি বর্বর মানুষদের চলার পথও এত জঘন্য হতে পারে না।) মানুষের সেই পথটা এক যুগ ধরে যদি তাদের ভোগান্তির কারণ হয় –তাহলে এই উন্নয়নকে তো মানুষ অভিশাপ হিসেবে নেবে। এত বড় প্রজেক্ট নিশ্চিত করার আগে মানুষের সামান্য পথচলার নিশ্চয়তা যারা দিতে কার্পণ্য করে তাদের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ জাগে।
টঙ্গী হতে গাজীপুর পর্যন্ত ঘরে ঘরে, মোড়ে মোড়ে অনেক নেওতা (নেতা)। তবু, বিগত ১২ বছর ধরে মাত্র এগারো কি.মি. রাস্তার নির্মাণ কাজ তো আর শেষ হলো না। বারো বছরে লক্ষ লক্ষ মানুষের মেরুদণ্ড গেল – কত কত করুণ সব দৃশ্য 'দৃশ্যকল্প' হয়ে গেল; কিন্তু রাস্তা মেরামতের খরচ বাড়ানো ছাড়া নেতাদের কোনো ভাবলেশ নেই।
এই এলাকায় সবাই নেতা কিন্তু মানুষের যাতনা বোঝার মতো একজন মানুষ নাই।