একসময়ের সাড়াজাগানো যেসব প্রযুক্তি এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে!
পুরোনো দিনের অনেক প্রযুক্তি হাল আমলে খুবই সেকেলে আর সীমাবদ্ধ মনে হলেও কোনো একসময় এ প্রযুক্তিগুলোই মানুষের জীবনকে দারুণ সহজ করে দিয়েছিল। এ ধরনের কয়েকটি সেকেল প্রযুক্তির কথা জানিয়েছে পকেট-লিন্ট।
পাবলিক টেলিফোন বুথ
হলিউডের আশি-নব্বইয়ের দশকের অনেক সিনেমাতে টেলিফোন বুথ দেখতে পাওয়া যায়। লাল রংয়ের এ বুথগুলোতে পয়সা ফেলে ফোন করা যেত। ২০০২ সালে ফোন বুথ নামক একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের পুরো ঘটনাই গড়ে উঠেছে একটি ফোন বুথে নায়কের আটকা পড়াকে কেন্দ্র করে।
মোবাইল প্রযুক্তির অগ্রগতির পর টেলিফোনের চল উঠে যায়, সেই সঙ্গে সেকেলে হয়ে যায় রাস্তার পাশের ফোনবুথগুলো। পশ্চিমাদেশগুলোতে এখন এ ধরনের লাল ফোনবুথগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গা বই আর কিছু নয়।
রোটারি টেলিফোন ও ল্যান্ডলাইন
টেলিফোনের জন্ম হয়েছে সেই ১৮৪৪ সালের দিকে। এরপর থেকে এ প্রযুক্তির অনেক পরিবর্তন হয়েছিল। টেলিফোনের বিভিন্ন মডেলের মধ্যে একটি ছিল ডায়াল ঘুরিয়ে ফোন করার টেলিফোন। বাংলা সিনেমায় চৌধুরী ও খান সাহেবদের আঙুল দিয়ে টেলিফোনের ডায়াল ঘুরিয়ে ফোন করার দৃশ্যগুলো এখনো অনেকে মনে করতে পারবেন।
আজকাল হয়তো কেউ শখ করে এ ফোন সংগ্রহে রাখতে পারেন, কিন্তু ব্যবহারিক দিক থেকে রোটারি ফোনের কোনো উপযোগ এখন আর নেই। তারওয়ালা ল্যান্ডফোনও এখন বিলুপ্তির পথে।
পেজার ও বিপার
আবারও হলিউডের উদাহরণ দিতে হবে। হলিউডের অনেক সিনেমার চরিত্রের কোমরে বাঁধা পেজার ও বিপারের দেখা মেলে। যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত এ যন্ত্রগুলো তৈরি হয়েছিল সেই ১৯৫০-এর দশকে। কিন্তু জনপ্রিয়তা পায় কেবল ১৯৮০-এর দশকে।
পেজারে কেবল একদিক থেকে যোগাযোগ করা যেত। ডাক্তার, ইমার্জেন্সি সার্ভিস ও নিরাপত্তাকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই এটি বেশি ব্যবহার করতেন।
তবে মজার ব্যাপার হলো, মোবাইল ও স্মার্টফোনের উদ্ভব ঘটার পরেও দীর্ঘ অনেক বছর ধরে ব্যবহারকারীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল পেজার ও বিপার। স্থায়িত্ব, সহনশীলতা ও ব্যাটারি ক্ষমতার কারণেই এর ব্যবহার এতদিন টিকে ছিল। কানাডা তো এই ২০১৩ সালেও পেজার সার্ভিসের জন্য ১৮.৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে।
বাটন ফোন
স্মার্টফোনের দুনিয়ায় আজকাল আর বাটন ফোনের চল নেই। এ ফোনগুলো ফিচার ফোন, ডাম ফোন নামেও পরিচিত।
প্রথমদিকের বাটন ফোনগুলো দিয়ে ফোন করা, এসএমএস করার সুবিধা বাদে আর উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু ছিল না। হয়তো কয়েকটা গেম খেলতে পারতেন ব্যবহারকারী। তবে পুরোনো দিনে এ ফোনগুলোই গুরুত্ব কোনো অংশেই কম ছিল না। একবার চার্জ করেই বেশ কয়েকদিন চালানো যেত এগুলো।
তবে বর্তমানে বিশ্বের অনেক মানুষ ডিজিটাল পর্দা থেকে চোখকে বিশ্রাম দিতে বাটন ফোনের দিকে ঝুঁকছেন আবারও। যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকায় বাটনফোনের বিক্রি পুনরায় বাড়ছে। কিছু কোম্পানি ফোরজি সুবিধাসম্পন্ন বাটন ফোন বাজারে ছেড়েছে।
ডিভিডি
প্যানাসনিক, ফিলিপস, সনি ও তোশিবার মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল ভিডিও ফরম্যাটের ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছিল ডিভিডি তথা ডিজিটাল ভার্সেটাইল ডিস্কের মাধ্যমে। তুলনামূলক বেশি স্টোরেজ সক্ষমতা থাকায় এ ডিস্কগুলো কম্পিউটারের বিভিন্ন ফাইল, সফটওয়্যার, উচ্চমানের ভিডিও ইত্যাদি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ভিডিও স্ট্রিমিং প্রযুক্তি, ও ব্লু-রে'র মতো অন্যান্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ফরম্যাট বাজারে আসার পর বর্তমানে ডিভিডিও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।
কমপ্যাক্ট ক্যাসেট টেপ
১৯৬৮ সালে প্রথমবারেরো মতো বাজারে এসে কমপ্যাক্ট ক্যাসেট টেপ। চৌম্বকীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ টেপগুলোতে অডিও ধারণ করা হতো। কখনো কখনো এ টেপগুলো খালি থাকত, যেগুলোতে শব্দ রেকর্ড করা যেত।
তবে ক্যাসেট টেপ জনপ্রিয় ছিল সংগীত শোনার ক্ষেত্রে। এক বা একাধিত টেপ মিলে গড়ে উঠত এক একটি অ্যালবাম। আশির দশকে জনপ্রিয়তা অর্জন করে এ টেপগুলো। ২০০১ সালের পর থেকে প্রি-রেকর্ডেডে ক্যাসেট টেপের বিক্রি বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। আর ফাঁকা ক্যাসেট টেপগুলো বাজারে চলেছিল ২০১২ সাল পর্যন্ত।
পেন্সিল ঘুরিয়ে ক্যাসেটের ফিতা ঠিক করার মধুর স্মৃতি এখনো অনেককে পুরোনো দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
ফোনবুক
ফোনবুক সে অর্থে কোনো প্রযুক্তি নয়, কিন্তু প্রযুক্তি কল্যাণেই হারিয়ে গেছে এটি। বড় কলেবরের এ বইগুলোতে মানুষের আবাসিক ও ব্যবসায়িক সব ফোন নাম্বার লেখা থাকত। মানুষ অভিধানের মতো নাম খুঁজে খুঁজে ফোন নাম্বার বের করতেন।
আজকাল একটা সাধারণ বাটন ফোনেই কয়েকশ থেকে হাজারেরও বেশি ফোন নাম্বার সংরক্ষণ করা যায়। আর স্মার্টফোনগুলোতে এ সুবিধা তো আরও বেশি। ক্লাউড সার্ভারেও ফোন নাম্বার সংরক্ষণ করে রাখার দারুণ সুবিধা রয়েছে।
টাইপরাইটার
নিজের সময়ে টাইপরাইটার প্রযুক্তির অন্যতম আশ্চর্যকর আবিষ্কার ছিল। টাইপরাইটের সূচনা হয়েছিল সেই ১৫৭৫ সালের দিকে। কম্পিউটার, ল্যাপটপের এ যুগে আজকাল টাইপরাইটারের ব্যবহার অতি বিরল।
ফিল্ম ক্যামেরা
আধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরার কল্যাণে গতানুগতিক ফিল্ম ক্যামেরা বাজার থেকে আরও অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আর আজকাল তো স্মার্টফোনের ক্যামেরা দিয়েই চমৎকার সব ছবি তোলা যায়।
এখন আর ছবি তোলার জন্য কাউকে রিলের ওপর নির্ভর করতে হয় না, পাড়ার দোকানেও দৌড়াতে হয় না। তবে কিছু পেশাদার ফটোগ্রাফার এখনো নান্দনিক ছবি তোলার উদ্দেশ্যে ফিল্ম ক্যামেরা ব্যবহার করেন।
