এআই শিক্ষক থেকে সাইবারনেটিক্স—২০৫০ সালে বিশ্ব কেমন হতে পারে?
গত ২৫ বছরে প্রযুক্তি এমন সব পরিবর্তন এনেছে, যা একসময়ের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। অথচ এই শতাব্দীর শুরুতে অধিকাংশ কম্পিউটার ইন্টারনেটে যুক্ত হতো শব্দময় ডায়াল-আপ সংযোগের মাধ্যমে, নেটফ্লিক্স ছিল অনলাইনে ডিভিডি ভাড়ার একটি প্রতিষ্ঠান, আর স্মার্টফোন শব্দটি সম্পর্কে তখনো অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা ছিল না। বিবিসি অবলম্বনে
দুই দশক পেরিয়ে আড়াই দশকে এসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্সসহ নানা ক্ষেত্রে উদ্ভাবন এমন গতিতে এগোচ্ছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর।
এই প্রেক্ষাপটে, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে চায়—আগামী ২৫ বছরে কী আসতে পারে।
এখানে ২০৫০ সালে আমরা যে প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করতে পারি এবং সেগুলো কীভাবে আমাদের জীবন বদলে দিতে পারে—তা নিয়ে তাঁদের পূর্বাভাস তুলে ধরা হলো।
মানুষ ও যন্ত্রের মেলবন্ধন
২০৫০ সালকে ঘিরে নির্মিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়—মানুষ প্রযুক্তিগত সংযোজনের মাধ্যমে আরও ফিট, সুখী ও কর্মক্ষম হয়ে উঠছে।
২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া জনপ্রিয় গেম ডেউস এক্স–এ (যার কাহিনি ২০৫২ সালের প্রেক্ষাপটে) খেলোয়াড়রা নিজেদের শরীরে 'ন্যানাইট' নামে ক্ষুদ্র রোবট প্রবেশ করাতে পারে।
এই অতি ক্ষুদ্র রোবটগুলো পরমাণু স্তরে বস্তু নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে অতিমানবীয় ক্ষমতা—যেমন অতিদ্রুত গতি বা অন্ধকারে দেখার ক্ষমতা—অর্জন করা সম্ভব হয়।
শুনতে ভবিষ্যতের গল্প মনে হলেও ন্যানোপ্রযুক্তি—অর্থাৎ মিলিমিটারের দশ লাখ ভাগের এক ভাগ মাত্রার প্রকৌশল—ইতোমধ্যেই আমাদের দৈনন্দিন প্রযুক্তির বহু জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাস্তবে, আপনি এই লেখাটি যে স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে পড়ছেন, সেটিও চলছে একটি কেন্দ্রীয় চিপের মাধ্যমে, যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ক্ষুদ্র ট্রানজিস্টর রয়েছে—যেগুলো ন্যানোস্কেলে তৈরি এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণকে দ্রুততর করে।
লন্ডন সেন্টার ফর ন্যানোটেকনোলজির অধ্যাপক স্টিভেন ব্রামওয়েল বিবিসিকে বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে যন্ত্র, ইলেকট্রনিক্স ও জীববিজ্ঞানের মধ্যকার সীমারেখা "উল্লেখযোগ্যভাবে ঝাপসা হয়ে যাবে"।
এর অর্থ, তখন ন্যানোপ্রযুক্তিভিত্তিক ইমপ্ল্যান্ট দেখা যেতে পারে—তবে ডেউস এক্স–এর মতো অদৃশ্য হওয়ার জন্য নয়, বরং "স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ বা যোগাযোগ সহজ করতে"।
অধ্যাপক ব্রামওয়েল বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ন্যানোমিটার মাত্রার যন্ত্রের ব্যবহারও সাধারণ হয়ে উঠতে পারে, যা "ওষুধ ঠিক যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই পৌঁছে দিতে পারবে"।
সাইবারনেটিক্সের অধ্যাপক কেভিন ওয়ারউইকও মানবদেহে প্রযুক্তিগত সংযোজন নিয়ে গভীরভাবে কাজ করছেন, আর সেক্ষেত্রে অনেকের থেকে এক ধাপ এগিয়ে আছেন তিনি।
১৯৯৮ সালে তিনি প্রথম মানুষ হিসেবে নিজের স্নায়ুতন্ত্রে একটি মাইক্রোচিপ প্রতিস্থাপন করেন, যার কারণে তিনি পরিচিত হন 'ক্যাপ্টেন সাইবর্গ' নামে।
অধ্যাপক ওয়ারউইকের বিশ্বাস, ২০৫০ সালের মধ্যে সাইবারনেটিক্স—যা প্রাকৃতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে—এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা রোগ চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
তিনি মনে করেন, কিছু রোগের ক্ষেত্রে ওষুধের বদলে 'ডিপ ব্রেইন ইলেকট্রনিক স্টিমুলেশন' আংশিক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, যেমন স্কিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে।
তিনি আরও বলেন, তাঁর নিজের পরীক্ষিত প্রযুক্তির মতো সাইবারনেটিক সংযোজন ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, ফলে "আপনার মস্তিষ্ক ও শরীর (একইসময়ে) ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে পারবে"।
আর যদি আমরা নতুন কোনো সংযোজন বা এমনকি নতুন খাদ্যাভ্যাস আমাদের শরীরে কী প্রভাব ফেলবে—তা ঝুঁকি ছাড়াই আগে থেকে পরীক্ষা করতে চাই, সেক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ কী বয়ে আনবে?
সায়েন্স মিউজিয়াম গ্রুপের পরিচালক অধ্যাপক রজার হাইফিল্ড মনে করেন, 'ডিজিটাল টুইন'—অর্থাৎ বাস্তব কোনো বস্তুর ভার্চুয়াল সংস্করণ, যা রিয়েল-টাইম ডেটায় আপডেট হয়—আমাদের জীবনের নিয়মিত অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তিনি এমন এক পৃথিবীর কল্পনা করেন, যেখানে প্রত্যেক মানুষের "হাজার হাজার সরলীকৃত ডিজিটাল টুইন" থাকবে, যেগুলোর মাধ্যমে বোঝা যাবে "ভিন্ন ভিন্ন ওষুধ বা জীবনযাপনের পরিবর্তন আপনার অনন্য জীববিজ্ঞানে কী প্রভাব ফেলে"। অর্থাৎ, আমরা কোনো নতুন পণ্য বা সেবায় অভ্যস্ত হয়ে জীবনযাপনের আগেই— এর মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যৎ একঝলক দেখে নিতে পারব। ফলে ডিজিটাল টুইনের ওপর তার ভালো বা মন্দ প্রভাব দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
এআইয়ের পরবর্তী প্রজন্ম
গুগল, আইবিএমসহ বহু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বহুবিলিয়ন ডলারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে—এআইসহ নানা খাতকে আরও এগিয়ে নিতে, যার কেন্দ্রবিন্দু কোয়ান্টাম কম্পিউটিং।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার এমন যন্ত্র, যা অত্যন্ত জটিল গণনা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় করতে পারে—যেমন নতুন ওষুধ তৈরির জন্য অণু-পরমাণুর মিথস্ক্রিয়া কেমন হবে তার অনুকরণ।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শীর্ষ চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং বলেন, তাঁর ধারণা অনুযায়ী "অত্যন্ত কার্যকর" কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আসতে আরও ২০ বছর লাগবে।
এআই নিজেই ২০৫০ সালের পথে আমাদের সমাজে বড় ভূমিকা রেখে যাবে।
ভবিষ্যতবিদ ও লেখক ট্রেসি ফলোজ—যিনি যুক্তরাজ্যের ২০৫০ সালের শিক্ষা নিয়ে একটি সরকারি শ্বেতপত্র তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন—মনে করেন, ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে "ভার্চুয়াল ও বাস্তব জগতের সমন্বয়ে", যেখানে এআই শিক্ষকরা "রিয়েল টাইমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে"।
পাঠ্যবইয়ের বদলে শিশুরা ব্যবহার করবে "ইমার্সিভ সিমুলেশন"। একই সঙ্গে শিক্ষা হবে কম মানদণ্ডভিত্তিক; কারণ প্রতিটি শিশুর ডিএনএ বা বায়োমেট্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বোঝা হবে, সে কীভাবে সবচেয়ে ভালো শিখতে পারে।
যানজটহীন সড়ক ও চাঁদের ঘাঁটি
লেখক বিল ডগলাস ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দিতে অভ্যস্ত—২০০০ সালে তিনি 'দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ২০৫০' শীর্ষক বৈশ্বিক ফিউচারিস্ট লেখালেখি প্রতিযোগিতায় ২০ হাজার ডলার পুরস্কার জিতেছিলেন।
তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, তাঁর একটি পূর্বাভাস—পাইলটবিহীন বিমান—২০৫০ সালের মধ্যে বাস্তব হবে। তবে তার আগে চালকবিহীন গাড়ির ব্যাপক অগ্রগতি ঘটবে, যা যানজটকে "প্রায় অতীতের বিষয়" বানিয়ে দেবে।
"গাড়িগুলো এখনকার চেয়ে অনেক কাছাকাছি চলবে," তিনি বিবিসিকে বলেন। "একটি গাড়ি ব্রেক করলে, সব গাড়িই একসঙ্গে ব্রেক করবে।
"স্বয়ংক্রিয় যানবাহনের জন্য নির্ধারিত টোল সড়কে গতি ঘণ্টায় ১০০ মাইল পর্যন্ত হতে পারে—এতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।"
পৃথিবীর বাইরে মহাকাশ প্রতিযোগিতাও সমান গতিতে চলবে বলে মনে করেন স্পেস বফিনস পডকাস্টের সহ-উপস্থাপক ও সাংবাদিক সু নেলসন।
তিনি বলেন, ২৫ বছরের মধ্যে চাঁদে বসবাসযোগ্য একটি ঘাঁটি গড়ে উঠতে পারে এবং কিছু শিল্প কার্যত পুরোপুরি মহাকাশকেন্দ্রিক হয়ে যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে—অর্থাৎ কক্ষপথে থাকা মহাকাশযানে—পরবর্তী প্রজন্মের ওষুধ তৈরি করতে পারে।
এর কারণ, তাঁর ভাষায়, এভাবে তৈরি ওষুধের ক্রিস্টাল বা স্ফটিক "সাধারণত আরও বড় ও উন্নত মানের" হয়।
কল্পবিজ্ঞান থেকে বাস্তব বিজ্ঞান
ফিলিপ কে ডিকের একটি ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র মাইনরিটি রিপোর্ট মুক্তি পায় ২০০২ সালে, যার পটভূমি ২০৫৪ সাল।
চিত্রায়ন শুরুর তিন বছর আগে পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ ভার্চুয়াল রিয়ালিটির পথিকৃৎ জ্যারন ল্যানিয়ারসহ ১৫ জন বিশেষজ্ঞকে তিন দিনের এক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানান—২০৫০-এর দশকে কোন প্রযুক্তিগুলো বাস্তবে সম্ভব হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করতে।
এই আলোচনা থেকেই চলচ্চিত্রের বহু প্রযুক্তিগত ধারণা গড়ে ওঠে।
যদি টম ক্রুজ অভিনীত এই সায়েন্স ফিকশন থ্রিলারের গল্প সত্য হয়, তবে ২০৫০-এর মাঝামাঝি সময়ে আমরা সবাই স্বচ্ছ মনিটরে হাতের ইশারায় ভিডিও ঘোরাব, আর জেটপ্যাক পরা পুলিশ ভবিষ্যৎ অপরাধ দমনে এমন লাঠি ব্যবহার করবে যেটি বমি উদ্রেককারী।
শিল্পকলায় থাকা বহু কল্পবিজ্ঞানের মতোই এই চলচ্চিত্র ভবিষ্যৎকে এক ধরনের অন্ধকার দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরে।
এমন আশঙ্কা আজকের সময়েও কিছু বিশেষজ্ঞের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে—এমনকি কেউ কেউ বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির বিলুপ্তির কারণও হতে পারে।
তবে ২০৫০ সালের ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত হতাশ হওয়ার আগে, ফিলিপ কে ডিকের নিজের কথায় ফিরে তাকানো যেতে পারে।
তিনি ১৯৬৮ সালে লেখা নিজের আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ সেল্ফ পোর্ট্রেট-এ লিখেছিলেন, "আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, বিজ্ঞান আমাদের সহায়তাই করবে।"
তিনি আরও বলেন, "বিজ্ঞান যত জীবন কেড়ে নিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জীবন আমাদের দিয়েছে। এই কথাটি আমাদের মনে রাখতে হবে।"
