'টাকা হাতে ফিরে আসুন, বন্দুক হাতে নয়', তালেবান গভর্নরের বার্তা
আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে তালেবানদের স্বীকৃতি দিতে পশ্চিমাদের আহ্বান জানিয়েছেন হেলমান্দ প্রদেশের নতুন তালেবান গভর্নর তালিব মৌলভি।
বছরের পর বছর ধরে ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই চালিয়েছেন তিনি। সাঙ্গিনে ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধের সেনাপতি। ডেস্কে পড়ে থাকা একটি অ্যাসল্ট রাইফেল সঙ্গে নিয়েই তালিব মৌলভি অতিথিদের স্বাগত জানান। তবে জোর দিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় শেষ হয়েছে।
তিনি ব্রিটিশ এবং বাকি ন্যাটো সদস্যদের জন্য বার্তা দিয়েছেন- "তালেবানকে আফগানিস্তানের বৈধ অভিভাবক হিসাবে স্বীকৃতি দিন এবং ফিরে আসুন; তবে, টাকা হাতে ফিরে আসুন, বন্দুক নিয়ে নয়।"
তালেবানের পক্ষে যুদ্ধে জয়ী তালিব মৌলভি বলেন, "আমরা যুদ্ধে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিলাম; তবে, স্বাভাবিক সময়ে আমরা একে অপরকে চিনতে পারিনি। এখন এই সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে আপনারা আমাদের হৃদয় জয় করতে পারেন এবং আমাদের খুশি করতে পারেন।"
তালেবানরা হেলমান্দের রাজধানী লস্কর গাহের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় দুই দশক ধরে চলা যুদ্ধ শেষ হয়েছে। দীর্ঘ এই যুদ্ধে মারা যাওয়া ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সৈন্যের বেশিরভাগই এই প্রদেশে মারা গেছেন।
আফগানিস্তানের অধিকাংশ প্রদেশের মতো, হেলমান্দের অর্থনীতির অবস্থাও বেশ করুণ। সারা দেশের তালেবান কর্মকর্তাদের মতো, এই প্রদেশের গভর্নরও বিদেশি সরকারদের প্রতি অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, "বিদেশি শক্তিগুলো আমাদের নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীকে আক্রমণ করে হত্যা করেছে এবং সবকিছু ধ্বংস করেছে। তাই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মানবিক সহায়তা দিয়ে আমাদের সাহায্য করা এবং আমাদের শিক্ষা, ব্যবসা ও বাণিজ্য উন্নয়নে মনোনিবেশ করা।"
তিনি আরো বলেন, "নাগরিকদের সমর্থন রয়েছে এমন সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাহায্য করে থাকে। আমরা নিরাপত্তা নিয়ে এসেছি, এবং আমাদের প্রতি জনগণের সমর্থনও রয়েছে; তাই তাদের (আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়) উচিত আমাদের সাহায্য করা এবং আমাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।"
এ আবেদন এমন একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছে, যিনি একসময় হেলমান্দ প্রদেশে ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে আর্ক-নেমিসিস (প্রধান শত্রু) ছিলেন। বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর দৃশ্যপট কতটা বদলে গেছে এবং তালিব মৌলভির মতো লোকেরাই যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে নেতৃত্ব দিতে চলেছেন, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে এ আবেদন।
বিগত সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং নতুন সরকার গঠনের মুখে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারি কর্মজীবীদের বেতন দেওয়া হয়নি। বিদেশি এনজিওগুলোতে কাজ করা অনেক মানুষই পালিয়ে গেছেন বা তাদের প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। রেস্টুরেন্টগুলো প্রায় অর্ধেক খালি এবং দোকানে ব্যবসা-বাণিজ্যও বেশ ধীরগতিতে চলছে।
অন্যদিকে, বিদেশি সাহায্যের সম্ভাবনা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন আটকে আছে। আফগান নারীদের বাইরে গিয়ে কাজ করা এবং পড়াশোনা করার সুযোগ থাকবে কি না, এই প্রশ্নের উপরেই বিদেশি সাহায্য সংস্থা এবং দাতা রাষ্ট্রগুলো জোর দিচ্ছে। তালেবানরা পুরো আফগানিস্তান দখল করার আগে, সাঙ্গিনসহ হেলমান্দের যে অংশটুকু তারা নিয়ন্ত্রণ করছিল, সেখানে নারী শিক্ষা ও কর্মের সুযোগ দেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
কিন্তু হয় পরিবর্তিত নেতৃত্ব বা আন্তর্জাতিক মতামতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থা তৈরিতে, কিংবা নারী শিক্ষাকে অস্বীকার করার যে মূল্য চুকাতে হবে তালেবানকে, তা বিবেচনায় দেশব্যাপী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আবারো খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লস্করগাহও এর ব্যতিক্রম নয়; একটি স্কুলে গার্ডিয়ানের অঘোষিত এক পরিদর্শনের সময় মেয়েদেরকে তাদের ডেস্কে দেখা গেছে।
নারীদের জন্য পুনরায় উচ্চশিক্ষাও চালু হবে বলে জানা গেছে; যদিও পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে সেখানে কিছুটা লিঙ্গ বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে।
পোশাকের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, "সরকার সুপারিশ করেছে, নারীরা যেন আগের মতো মুক্ত পোশাকে না আসে, তাদের বোরকা বা হিজাব পরা উচিত।"
তবে মেয়েদের জন্য উচ্চ বিদ্যালয়গুলো ফের চালু হবে কি না, কিংবা স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতের বাইরে কর্মরত নারীরা তাদের চাকরিতে ফিরতে পারবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।
মৌলভি জানিয়েছেন, তিনি এই বিষয়গুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করবেন। তিনি বলেন, "মন্ত্রণালয়গুলো এখনও এই বিষয়গুলো নির্ধারণে বৈঠক করছে; তারা যা ঘোষণা করবে আমরা তা করব। "
গত ২০ বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি হেলমান্দের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুদ্ধ করেছেন। এই সময়ের মধ্যে বেসামরিক মানুষের উপর হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে তালেবানদের বিরুদ্ধে। এমনই এক বোমা হামলায় গত শরতে হেলমান্দের অন্যতম প্রধান সাংবাদিক ইলিয়াস দায়েসহ বেসামরিক মানুষ হত্যার খবরও জানা গিয়েছিল।
তালেবান সেই হামলার দায় অস্বীকার করলেও মৌলভি স্বীকার করেছিলেন, কয়েক মাস আগে তিনি লস্করগাহে ইউএসএইড-অর্থায়িত সদর দফতরে যাওয়ার আগে, একজন ব্রিটিশ সাংবাদিকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎটি ছিল অন্যরকম।
তিনি বলেন, "ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালীন আমি সাঙ্গিনের কমান্ডার ছিলাম। আমরা মাত্র দুই কিলোমিটার দূর থেকে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলাম, জেলার সব মানুষ আমাদের সাহায্য করেছিল। তারা সেখানে ব্রিটিশদের অবস্থানের বিরুদ্ধে ছিল।"
সাঙ্গিন তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর, তিনি মুসা কালায় যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখন মানুষ শান্তিতে নতুন জীবন শুরু করতে পারবে, জীবিকা উপার্জন করতে সক্ষম হবে।
তিনি আরো বলেন, "২০ বছর ধরে লড়াই চলেছে, তাই স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে কিছুটা সময় লাগবে।"
তুমুল যুদ্ধে অনেক বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার পরও প্রাদেশিক রাজধানী লস্করগাহের জনগণ এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতি এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনে তালেবানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আবারো ফিরে আসবে কি না, তা নিয়ে মানুষ বেশ উদ্বিগ্ন।
নারীদের বাজারে গহনা ও সাজসজ্জা সামগ্রী বিক্রেতা ২৬ বছর বয়সী সামিউল্লাহ বলেন, "ব্রিটিশদের প্রতি আমার প্রথম আবেদন, দয়া করে আমাদের সরকারকে স্বীকৃতি দিন এবং আমাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করুন।"
তিনি এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, "এই শহরের প্রত্যেকেই কাউকে না কাউকে হারিয়েছে; তবে, কোনো পরিবার পালিয়ে যায়নি।"
তিনি জানান, তালেবানের পূর্ববর্তী শাসনের গল্পও তিনি শুনেছেন। তবে, সেইসঙ্গে বলেন, "আমি আশা করি তারা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করবে না।"
চার সন্তানের জননী খাতেরার সৈনিক স্বামী, চলতি বছরের শুরুর দিকে যুদ্ধে মারা যান। এরপর জীবিকা উপার্জনে খাতেরা শহরের কিছু ধনী পরিবারে গৃহকর্ম শুরু করেছিলেন; কিন্তু তাকে কাজ দেওয়া বেশিরভাগ ধনী পরিবার এখন শহর ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
সামরিক বিধবা হিসেবে তিনি যে সামান্য সুবিধাটুকু পেয়ে আসছিলেন, তাও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ভাড়া দেওয়ার টাকা না থাকায়, তিনি এখন পরিবারসহ বাজারে ঘুমাচ্ছেন।
তিনি বলেন, "তালেবানদের নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই, আমার বাচ্চাদের খাবার দরকার। বিগত সরকারকে সমগ্র বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছিল, এখন তাদের তালেবান সরকারকেও স্বীকৃতি দিতে হবে, যাতে তারা আমাদের সাহায্য করতে পারে।"
ঠিক একই বার্তা মৌলভিও দিতে চান পুরো বিশ্বকে।
"ন্যাটোভুক্ত সব দেশের জন্য আমাদের শেষ বার্তা হলো- আমরা তাদের সাহায্য করেছি। তাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত যে আমরা তাদের শান্তিপূর্ণভাবে চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছি; আমরা তাদের থামাতে পারতাম, যেনো তারা কোনো ধরনের লড়াই ছাড়াই চলে যেতে না পারে। এবং তাদের উচিত আমাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।"
- সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
