প্রসঙ্গ যৌন হয়রানি: ছেলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা বাড়ছে
দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদের যৌন নিপীড়ন করার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের একজন অধ্যাপককে গ্রেপ্তার করার পর আমরা অনেকেই অবাক হয়েছি। অনেকের ধারণা শুধু নারীরাই যৌন নির্যাতনের শিকার হন। কারণ নারী যৌন হয়রানির শিকার হলে সেটা প্রকাশ করেন, বিচার দাবি করেন, সমাজ উচ্চকিত হয়। কিন্তু ছেলেশিশু কিশোর বা তরুণ কেউ যৌন হয়রানির শিকার হলে ব্যাপারটা গোপন করা হয়। আর এই গোপনীয়তাকে পুঁজি করেই এক শ্রেণির মানুষ এধরনের নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪৫ জন ছেলেশিশু ধর্ষণ বা বলাৎকারের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে মামলা হয়েছে ২৮টি। ৭ থেকে ১২ বছরের শিশুরা সবচেয়ে বড় ভিকটিম। এই সংখ্যা শুধু পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই অপরাধ শুধু শিশু-কিশোরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
যেমন–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অধ্যাপক গর্হিত অপরাধ করেছেন। তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের বিষয়ে ফেসবুকে লিখেছেন তার বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তারা এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। এখন প্রায় ১২ জন শিক্ষার্থী ওই শিক্ষকের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা তথ্য প্রমাণসহ জানিয়েছেন।
আলোচ্য ঘটনার পর ছেলেদের যৌন হয়রানি বিষয়ে প্রচুর কথা হচ্ছে। এর আগেও বলাৎকারের বহু ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসায়। কোনো কোনো অভিভাবক প্রকাশ্যে বা মিডিয়ার সামনে কথা বললেও, অনেকেই 'স্টিগমা' বা লোকলজ্জার ভয়ে গোপন করে যান। বিভিন্ন সামাজিক কারণে অভিভাবকরা যে শুধু চুপ করেই থাকেন, তা নয়, তারা তাদের সন্তানের প্রতি হওয়া এই অপরাধের বিচারও দাবি করেন না।
মেয়েশিশু ও নারীরাই যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়, এই ধারণা একেবারেই ভুল। বাংলাদেশে প্রতি চার জন মেয়েশিশুর মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, আর প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে যৌন নিপীড়নের শিকার হয় একজন। শুধু পুরুষ নয়, ছেলেশিশুরা কখনো কখনো নারীর দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হয়।
পুরুষই প্রধানত যৌন নির্যাতনকারী হলেও, নারীর বিরুদ্ধেও আছে যৌন হয়রানির অভিযোগ। মানুষ আগে ছেলেদের যৌন হয়রানি নিয়ে মুখ খুলতো না, ট্যাবুর কারণে। শুধু ট্যাবু নয়, কেউ বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে ধারণাই ছিল না যে ছেলেশিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে। অথচ এই ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে বাড়িতে, আত্মীয় বা পারিবারিক বন্ধুদের বাড়িতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ছাত্রাবাসে এমনকি বাসার গার্ড, চালক ও গৃহকর্মী দ্বারাও। মনোচিকিৎসকরা বলেন, পরিচিত জন ছাড়া শিশুদের যৌন হয়রানির ঘটনার নজির খুবই কম।
একইরকম আরেকটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন শিকদার আলী (ছদ্মনাম)। জেলা শহরে স্কুলে পড়ার সময়ে ছাত্রাবাসে থাকলেও, মাঝেমাঝে খালার বাসায় যেতো। সেখানে তার খালাতো বড় বোন নিয়মিত তাকে যৌনাচারে বাধ্য করতো। ক্রমে ভয়ে সে খালার বাসায় যাওয়া বন্ধ করেছিল। এইট/নাইনে ওঠার পর বন্ধুদের সামনে মুখ খুলতে পেরেছিল শিকদার। ততদিনে তার স্কুল জীবন প্রায় শেষ হয়ে আসাতে রক্ষা পেয়েছে সে। কিন্তু এই ঘটনা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তাকে নিয়মিতভাবে কাউন্সিলিং করাতে হয়েছে।
চাইল্ড এডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি নিয়ে কাজ করছেন অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানির শিকার শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন। আর এই কাজ করতে গিয়ে তিনি যৌন হয়রানি বিষয়ে ক্লিনিক্যাল গবেষণা করেছেন। তার এই গবেষণায় শিশুদের যৌন হয়রানি বিষয়ে কিছু ভীতিকর তথ্য উঠে এসেছে। তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, ছেলেশিশুরাও নিয়মিতভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। (ডয়েচে ভেলে)
আমাদের পরিবার ও সমাজে হয়তো এখন কিছু কিছু মেয়েশিশুকে বাবা–মা সাবধান করেন বা চোখে চোখে রাখেন। কোনটা গুড টাচ, কোনটা ব্যাড টাচ তাকে তা জানানো হয়। কিন্তু ছেলেশিশুর ব্যাপারে অভিভাবকরা একেবারে উদাসীন। তারা ধরেই নেন মেয়েরাই যৌন হয়রানির শিকার হয়, ছেলেরা নয়। একটি ছেলেশিশুকে কেউ চুরি বা অপহরণ করতে পারে, কিন্তু তাকে বলাৎকার করবে—এটা তারা ভাবেন না।
বাংলাদেশের সমাজে এটা খুব অপরিচিত এবং লজ্জার বিষয়। কাজেই এই ট্যাবুটাই ভাঙতে হবে প্রথমে। প্রচার করতে হবে, সাবধান হতে হবে যে, শুধু মেয়েশিশুই যৌন হয়রারি বা ধর্ষণের শিকার হয়না, ছেলেশিশুও হয়।
যৌন হয়রানি নিয়ে ছোটবেলা থেকে ছেলেশিশুদেরও মুখ খুলতে দেওয়া হয় না। তাই তারা সবসময় এই প্রসঙ্গ গোপন করে যায়, হয়রানির শিকার হয়েও কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করে না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসার কোনো শিক্ষকের হাতে নির্যাতিত হয়েও চুপ করে থাকে। বলাৎকারের শিকার হয়ে কেউ কেউ মারা গেছে বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
তাও ভালো যে রসায়নের সেই অভিযুক্ত শিক্ষকের নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন শিক্ষার্থী। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি সমস্যায় পড়েছিলেন তিনি। সেটা ঠিক করে দেওয়ার কথা বলে তাকে ওই শিক্ষক শেওড়াপাড়ায় নিজের বাসায় ডেকে নেন। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে ওই শিক্ষক তাকে যৌন নিপীড়ন করেন এবং বিষয়টি যাতে প্রকাশ না করেন, সেজন্য ভয়ভীতি দেখান।
এরপরও কয়েকবার তিনি ওই শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে শেওড়াপাড়ার বাসায় নিয়ে যৌন নিপীড়ন ও মারধর করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থী। যারা যৌন নির্যাতনকারী, তারা সবসময়ই ভিকটিমকে মুখ খুলতে মানা করেন। এমনভাবে ভয় দেখান, যাতে ভিকটিম মুখ না খোলেন, সে ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন। মাঝেমাঝে বিভিন্ন সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন অপরাধীরা।
অভিযুক্ত অধ্যাপকের উকিল দাবি করেছেন, মূলত কয়েক মাস পর তার বিভাগীয় প্রধান হওয়ার সুযোগ আসছে। সেজন্য অন্য শিক্ষকেরা তাকে ফাঁসিয়েছেন। তার স্ত্রী ও অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া সন্তান আছে উল্লেখ করে উকিল বলেন, তার মক্কেল কেন এসব করবেন? কিন্তু আমাদের জানা উচিত পরিবার বা সন্তান থাকলেই যে কোনো ব্যক্তি যৌন নিপীড়নকারী হবেন না, এমন কোনো কথা নেই। যারা এ ধরনের ঘৃণ্য চরিত্রের, তারা যেকোনো বয়সে, যে কারো সাথেই এই নোংরা আচরণ করতে পারেন।
আর তাই ছাত্ররা অভিযোগ করেছেন, প্রথমে এই শিক্ষক তাদের নিজের কক্ষে ডাকতেন, তারপর বাসায় ডাকতেন। গভীর রাতে কারণ ছাড়াই অনেককে ফোন করে অর্থহীন কথা বলতেন। সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীকে এই শিক্ষক বাসায় ডেকে নিয়ে নির্যাতন করে চুপ থাকতে হুমকি দিয়েছেন। ছাত্ররা মুখ খুলেছে বলেই শিক্ষকের এত বড় অপরাধ প্রকাশ্যে এসেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির বিষয়টি জবাবদিহিতার সংস্কৃতির আওতায় আনতে হবে। বাবা–মা বিশ্বাস করে তাদের শিশুকে শিক্ষাঙ্গনে পাঠান, সেখানে যদি এইভাবে নিপীড়নের শিকার হতে হয়, তাহলে তা খুবই উদ্বেগের বিষয়।
তিন/চার বছর আগে ময়মনসিংহের নান্দাইলে একজন শিক্ষার্থী 'নেইল কাটার' দিয়ে তার মাদ্রাসা শিক্ষকের পুরুষাঙ্গে আঘাত করেছে। কারণ তাকে রাতে খাবারের দাওয়াত দিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় পথে তাকে বলাৎকারের চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছিল ১৬ বছরের ওই ছাত্র। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সাত বছরের শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।
ভিকটিম শিশুর অভিভাবকদের একজন বলেছেন, 'ছেলের মুখ থেকে ঘটনা শুনে লোকলজ্জার বিষয় ভেবে প্রথমে চুপ ছিলাম। পরে যখন চিন্তা করলাম আজকে আমার ছেলের সঙ্গে এমন হয়েছে, কাল আরেকজনের সঙ্গে করবে। পরে লজ্জা-শরম বাদ দিয়ে প্রথমে ইউএনওকে জানালাম। তার সহযোগিতায় থানায় গিয়ে মামলা করেছি প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে।"
সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে শিক্ষাঙ্গনে কী হচ্ছে এবং কী হতে পারে। সময় এসেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতন বন্ধে একটা সামগ্রিক এপ্রোচ নেওয়ার।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ছেলেশিশুর প্রতি যৌন হয়রানি ও বলাৎকার প্রসঙ্গে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। তাই আইনজীবী ও পুলিশের কাছেও এটা সম্পর্কে ধারণা পরিস্কার নয়। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে রেপ বা যৌন নির্যাতনের যে সংজ্ঞা, সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারী ও মেয়েদের কথাই বলা আছে। আইনের এই দিকটার সুযোগ গ্রহণ করছে অপরাধীরা।
অথচ দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ১৬ বছরের কম বয়সী ছেলে বা মেয়েশিশুর ধর্ষণের বিচার একই আইনে হওয়ার কথা। কিন্তু সে আইনে আবার ধর্ষণের সংজ্ঞাটা এমন যে, ধর্ষণের শিকার মানেই নারীকে বোঝানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বিচারের সময়ও ছেলেশিশু ধর্ষণের বিচারকে হালকাভাবে দেখা হয় বা দুর্বল ধারায় তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে বিচার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
অনেক দিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন পুরুষ বা নারীর যৌন ক্ষুধার শিকার হয় ছেলে শিশু-কিশোররা। এছাড়াও সমকামী ও বিকৃত রুচির মানুষেরাও ছেলেদের, বিশেষ করে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালাতে পারে বা চালিয়ে থাকে। ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন ও শাস্তির জায়গাটা শক্ত করতে হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে ওই প্রতিষ্ঠানের ওপর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
ছেলেশিশু নির্যাতনের বিষয়টি আইনে স্পষ্ট হওয়া যেমন দরকার, এর চাইতেও বেশি প্রয়োজন আইনের প্রয়োগ। সচেতনতা বাড়াতে হবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার পলিসির মতো যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ পলিসি ও কমিটি থাকা দরকার। সময় এসেছে ছেলেদের যৌন নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার। অভিভাবক ও স্কুলের বড় দায়িত্ব এই বিষয়ে প্রচারণা চালিয়ে ট্যাবু দূর করা এবং সচেতনতাবোধ জাগিয়ে তোলা।
এ ধরনের অপরাধ গোপন করা মানে, আরও বেশি ও বড় অপরাধের পথ করে দেওয়া। স্কুল লেভেল থেকে শিশুদের সচেতন করা হলে তারা পরিবারে, বন্ধু ও আত্মীয়দের দ্বারা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হলে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও বলাৎকার বিষয়ে সচেতন হবে। এই সচেতনতাবোধ তৈরি করতে না পারলে ছেলেদের ওপর যৌন নির্যাতনকারীরা খুব সহজেই পার পেয়ে যাবেন।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
