বিখ্যাত স্প্যানিশ গায়ক হুলিও ইগলেসিয়াসের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা
বিখ্যাত স্প্যানিশ গায়ক হুলিও ইগলেসিয়াসের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন দুই নারী। ভুক্তভোগীদের দাবি, গায়কের অধীনে কাজ করার সময় তিনি ওই নারীদের জন্য বলপূর্বক, ভীতিকর ও সহিংস এক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন—যেখানে 'নির্যাতনকে স্বাভাবিক' করে তোলা হয়েছিল। খবর বিবিসি'র।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম 'এল ডিয়ারিও' এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'ইউনিভিশন'-এর প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব অভিযোগ বর্তমানে স্পেনের বিচার বিভাগ তদন্ত করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গায়ক ডোমিনিকান রিপাবলিকের পুন্টা কানা এবং বাহামাসের লাইফোর্ড কে-তে অবস্থিত তার সম্পত্তিতে এই দুই নারীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে সেখানে যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটে।
৮২ বছর বয়সী ইগলেসিয়াস ১৯৬০-এর দশক থেকে স্পেনে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। বিশ্বজুড়ে তার বিক্রি হওয়া রেকর্ডের সংখ্যা মিলিয়নের ঘর ছাড়িয়েছে।
'এল ডিয়ারিও' ও 'ইউনিভিশন' জানিয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের আগে অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে ইগলেসিয়াস ও তার আইনজীবীর কাছে বারবার অনুরোধ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেননি।
তবে ক্যারিবীয় অঞ্চলে গায়কের একটি সম্পত্তির ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক নারী এসব অভিযোগকে 'বাজে কথা' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বিবিসি মন্তব্যের জন্য ইগলেসিয়াসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও এখনো কোনো উত্তর পায়নি।
প্রতিবেদনে রেবেকা (ছদ্মনাম) নামে পরিচিত এক গৃহকর্মী জানান, দিনের কাজ শেষে গায়ক নিয়মিত তাকে নিজের ঘরে ডাকতেন এবং তার সম্মতি ছাড়াই আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করতেন। তিনি বলেন, 'তিনি প্রায় প্রতি রাতেই আমাকে ব্যবহার করতেন। আমার নিজেকে একটি বস্তু বা দাসীর মতো মনে হতো।'
ডোমিনিকান নাগরিক রেবেকা জানান, ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ২২ বছর।
প্রতিবেদনে লরা নামে উল্লিখিত অপর নারী, যিনি ভেনেজুয়েলার একজন ফিজিওথেরাপিস্ট, বলেন যে ইগলেসিয়াস তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার স্পর্শ করেছেন এবং চুম্বন করেছেন। তিনি আরও জানান, গায়ক নিয়মিত তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার হুমকি দিতেন এবং তিনি কতটা খাবার খাবেন তা নিয়ন্ত্রণ করতেন।
লরা বলেন, 'তিনি সব সময় বলতেন আমি মোটা এবং আমাকে ওজন কমাতে হবে।'
তিনি জানান, যদিও তিনি প্রায়ই গায়কের কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতেন, তবে 'এমন অনেক মেয়ে ছিল যারা না বলতে পারত না। আর তিনি তাদের সঙ্গে যা খুশি তাই করতেন।'
'এল ডিয়ারিও' ও 'ইউনিভিশন' তিন বছর ধরে যৌথভাবে এই বিষয়টি তদন্ত করে জানিয়েছে, ছবি, ফোন রেকর্ড, টেক্সট মেসেজ এবং মেডিকেল রিপোর্টসহ বিভিন্ন নথিপত্র অভিযোগগুলোকে সমর্থন করে।
প্রতিবেদনগুলোতে ইগলেসিয়াসের আরও কয়েকজন সাবেক কর্মীর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, যারা সেখানে কর্মরতদের জন্য একটি ভীতিকর কর্মপরিবেশের কথা বলেছেন।
জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি রেবেকা ও লরা স্পেনের ন্যাশনাল কোর্টে (জাতীয় আদালত) ইগলেসিয়াসের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন ও মানব পাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। এই আদালত স্পেনের সীমান্তের বাইরে সংঘটিত কথিত অপরাধের তদন্ত করে থাকে।
ইগলেসিয়াসের পুরোনো বন্ধু জাইমে পেনা ফিয়েল এসব অভিযোগকে 'ডাহা মিথ্যা' বলে অভিহিত করেছেন। গায়কের আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী, সাংবাদিক মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল পাস্তুর বলেন, 'তিনি এ ধরনের কাজ করতে পারেন—এমন কোনো ইঙ্গিত আমি কখনোই শুনিনি।'
তবে স্পেনের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বাধীন সরকারের সমতা বিষয়ক মন্ত্রী আনা রেডন্ডো বলেছেন, তিনি আশা করেন মামলাটি 'পুরোটা' তদন্ত করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, 'যখন সম্মতি থাকে না, তখন সেটাই নির্যাতন।'
এদিকে মাদ্রিদ অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ও রক্ষণশীল নেতা ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো স্প্যানিশ এই গায়কের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, 'মাদ্রিদ অঞ্চল কখনোই শিল্পীদের অপবাদ দেওয়ায় ভূমিকা রাখবে না—আর সর্বকালের সবচেয়ে সর্বজনীন গায়ক হুলিও ইগলেসিয়াসের ক্ষেত্রে তো প্রশ্নই আসে না।'
ইগলেসিয়াসের জীবনীকার ইগনাসিও পেইরো এবং প্রকাশনা সংস্থা 'লিব্রোস দেল অ্যাস্টেরয়েড'-ও এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, গত বছর প্রকাশিত জীবনীটি তারা হালনাগাদ করবেন, যাতে এসব অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা যায়। পাশাপাশি তারা 'ভুক্তভোগীদের প্রতি সমর্থন ও সংহতি' প্রকাশ করেছে।
