এপস্টিনের সহযোগী কে এই গিলেইন ম্যাক্সওয়েল?
মার্কিন যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন সংক্রান্ত নথি প্রকাশে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক হওয়ায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েলকে ঘিরে নজরদারি বেড়েছে। এপস্টিনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে যৌন পাচারসংক্রান্ত মামলায় ২০ বছরের সাজা ভোগ করছেন।
৬৩ বছর বয়সী সাবেক ব্রিটিশ সমাজকর্মী ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে ফেডারেল কারাগারে বন্দি। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) জানিয়েছে, গত দুই দিনে তিনি ডিওজের উপ-মহাপরিদর্শক টড ব্ল্যাঞ্চের সঙ্গে একাধিক ঘণ্টা বৈঠক করেছেন। তবে ওই আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
ব্ল্যাঞ্চ এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, 'উপযুক্ত সময়ে আমরা যা জানতে পেরেছি সে বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ করা হবে।' ম্যাক্সওয়েলের আইনজীবী ডেভিড অস্কার মার্কাস জানান, ম্যাক্সওয়েল রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা করেননি, যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে ট্রাম্পের সে ক্ষমতা রয়েছে। শুক্রবার তিনি বলেন, 'রাষ্ট্রপতি আজ সকালে বলেছেন, তার সে ক্ষমতা আছে। আমরা আশা করি, তিনি তা ন্যায্য ও সঠিকভাবে প্রয়োগ করবেন।'
এদিকে, এপস্টিন মামলার আলোকে কংগ্রেস সদস্যরাও ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন। হাউস ওভারসাইট কমিটি বুধবার রাতে ভোটের মাধ্যমে তার জবানবন্দির জন্য সমন জারি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল এবং এ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ায়, বিশেষ করে ডানপন্থীদের মধ্যে। ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এপস্টিন সংক্রান্ত আরও তথ্য প্রকাশ না করে বরং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বন্ধ করতে একটি স্মারকলিপি জারি করলে তার ম্যাগা সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি এপস্টিন মামলার গ্র্যান্ড জুরি নথি প্রকাশের আবেদন করেন। ফ্লোরিডার এক ফেডারেল বিচারক বুধবার তার একটি আবেদন নাকচ করেন, তবে নিউইয়র্কে আরও দুটি আবেদন এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
এপস্টিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু নথি আগেই উন্মুক্ত করা হয়েছে; এর মধ্যে ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে করা এক মামলার কাগজপত্রও রয়েছে।
এপস্টিনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক
ব্রিটিশ মিডিয়া মোগল রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের কন্যা গিলেইন ম্যাক্সওয়েল বাবার মৃত্যুর পর নিউইয়র্কে চলে গিয়ে আশির দশকের শেষ দিকে বা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এপস্টিনের সঙ্গে পরিচিত হন। একসময় তাদের সম্পর্ক ছিল রোমান্টিক।
ধনী ও অভিজাত মহলে ম্যাক্সওয়েলের যোগাযোগ এপস্টিনকে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে সহায়তা করে। এর মধ্যে ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রু অন্যতম, যিনি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে এপস্টিনের জন্মদিন উপলক্ষে তৈরি করা বইটির নেপথ্যে ছিলেন ম্যাক্সওয়েল, যেখানে ট্রাম্প একটি চিঠি লিখেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ফ্যাশন ডিজাইনার ভেরা ওয়াংসহ আরও অনেকে ওই চামড়ায় বাঁধানো অ্যালবামে বার্তা দিয়েছিলেন।
নারী পাচারসহ একাধিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত
ফেডারেল অভিযোগপত্র, আদালতের নথি ও বিচারে উপস্থাপিত প্রমাণ অনুযায়ী, ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে প্রায় এক দশক ধরে ম্যাক্সওয়েল এপস্টিনের মাধ্যমে নাবালিকা মেয়েদের যৌন নির্যাতনে সহায়তা ও অংশগ্রহণ করেন। প্রসিকিউটরদের দাবি, তিনি ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদেরও প্রলুব্ধ ও নিয়োগ করেছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ম্যাক্সওয়েল তরুণীদের কেনাকাটায় নিয়ে যেতেন, ভ্রমণ বা শিক্ষার সুযোগের খরচ বহন করতেন এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি যৌন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন এবং ভুক্তভোগীদের সামনে পোশাক খুলে 'যৌন নির্যাতনকে স্বাভাবিক' ও 'সহজতর' করার চেষ্টা করতেন।
নির্যাতনের শিকার হবে জেনেও ম্যাক্সওয়েল নাবালিকাদের বিভিন্ন রাজ্যে এপস্টিনের বাড়িতে যেতে বাধ্য করতেন। প্রসিকিউটরদের মতে, তিনি মাঝে মাঝে ওই নাবালিকা ও এপস্টিনের সঙ্গে 'যৌন প্রকৃতির ম্যাসাজ'-এ উপস্থিত থাকতেন বা অংশ নিতেন।
এই কর্মকাণ্ডের পর ভুক্তভোগীদের নগদ শত শত ডলার দেওয়া হতো বলে প্রসিকিউটররা জানান। কিছু ক্ষেত্রে, অন্য নাবালিকাদের নিয়ে আসোতে তাদের অর্থ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এক মাসব্যাপী বিচারের পর ম্যাক্সওয়েলকে নারী পাচারসহ একাধিক ফেডারেল অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ২০২২ সালে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের একজন ভার্জিনিয়া জিউফ্রে একটি মামলায় অভিযোগ করেন, তিনি কিশোর বয়সে ট্রাম্পের মার-এ-লাগো রিসোর্টে কাজ করার সময় ম্যাক্সওয়েল তাকে এপস্টিনের জন্য ম্যাসাজ কর্মী হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। ম্যাক্সওয়েল তার অভিযোগকে 'স্পষ্ট মিথ্যা' বলায় জিউফ্রে ২০১৫ সালে মানহানির মামলা করেন।
পরে মামলাটি অঘোষিত অঙ্কে জিউফ্রের পক্ষে মীমাংসা হয় এবং ফেডারেল আপিল আদালত আংশিকভাবে নথি উন্মুক্ত করে। (জিউফ্রে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধেও নাবালিকা অবস্থায় ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছিলেন, যা তিনি অস্বীকার করেন। সেই মামলাটিও ২০২২ সালে মীমাংসা হয়।)
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ম্যাক্সওয়েল তার দণ্ড বাতিলের আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেন।
তার আপিলে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার প্রসিকিউটরদের সঙ্গে এপস্টিন যে চুক্তি করেছিলেন, তার আওতায় তাকে ফেডারেল অভিযোগ থেকে সুরক্ষা দেওয়া উচিত ছিল। ওই চুক্তিতে এপস্টিন দুইটি রাজ্য পর্যায়ের পতিতাবৃত্তি-সংক্রান্ত অভিযোগে দোষ স্বীকারের বিনিময়ে ফেডারেল মামলা না করার নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন। চুক্তির আওতায় তার সহ-ষড়যন্ত্রকারীদেরও সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল।
তবে চলতি মাসের শুরুতে বিচার বিভাগ সুপ্রিম কোর্টকে ম্যাক্সওয়েলের আপিল খারিজের অনুরোধ জানিয়েছে।
