যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার শঙ্কায় চাপা পড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুত বের করছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরান তার অস্ত্র পুনরুদ্ধারের কাজ জোরদার করেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও দুই ব্যক্তির বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি কর্তৃপক্ষ ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য গোলাবারুদ, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা বাড়িয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের বিশ্বাস, তেহরান দ্রুত তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চায়। এর মূল উদ্দেশ্য—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করেন, তবে যেন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দ্রুত পাল্টা হামলা চালানো সম্ভব হয়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। ইরানে নতুন করে কীভাবে হামলা চালানো যায়, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। একে সম্ভাব্য 'চূড়ান্ত' হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন নিউজ পোর্টাল অ্যাক্সিওস।
অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদক জানান, ৪৫ মিনিটের ওই বৈঠকে ট্রাম্পের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নতুন পরিকল্পনা তুলে ধরেন ব্র্যাড কুপার এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।
তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্পের পরিকল্পিত চীন সফর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে ট্রাম্পের বেইজিং সফরটি হোয়াইট হাউসের কাছে বর্তমানে একটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। ইরান যুদ্ধের কারণে এর আগে একবার এই সফর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা এবার আর করতে চায় না মার্কিন প্রশাসন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এর জবাবে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে। সেন্টকম কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত ৪১টি জাহাজকে এই প্রণালি পার হতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধ ও প্রণালিটি পুনরায় সচল করার বিষয়ে আলোচনার জন্য গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান আসেনি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ চলতি মাসে জানিয়েছেন, ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা আবারও গড়ে তোলার চেষ্টা করছে এমন ইঙ্গিত পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ১৬ এপ্রিল পেন্টাগনে তিনি বলেন, 'আমরা জানি আপনারা কোন সামরিক সরঞ্জাম কোথায় সরিয়ে নিচ্ছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আপনারা এখন ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্থাপনাগুলোর ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে যন্ত্রপাতি বের করার চেষ্টা করছেন, যা আসলে আপনাদের দুর্বলতাই প্রকাশ করছে। আপনারা আপনাদের অবশিষ্ট লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো খুঁড়ে বের করছেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো নতুন করে প্রতিস্থাপনের কোনো ক্ষমতা আপনাদের নেই।'
এদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সব লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, 'ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে, তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের নৌবাহিনী ডুবে গেছে এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।'
কেলি আরও জানান, এই সফল অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে এখন সব ধরনের পথ খোলা আছে। তবে তিনি কূটনীতিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। ট্রাম্প মার্কিন আলোচকদের এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত ২৫ মার্চ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মে মাসে ট্রাম্পের নির্ধারিত চীন সফরের আগেই এই যুদ্ধ শেষ হতে পারে। তিনি আনুমানিক ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের একটি সময়সীমার কথা জানিয়েছিলেন। তবে বর্তমান যুদ্ধবিরতি এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলাপ-আলোচনা এই সময়সূচিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে ইরান দাবি করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা এখনো তাদের রয়েছে।
ইরান প্রায় হেরে গেছে বলে হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগন দাবি করলেও, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী ইরান এখনো তাদের আগের অনেক সামরিক সক্ষমতা বজায় রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে—অনেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান বাহিনীর অর্ধেকের বেশি যুদ্ধবিমান এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অর্ধেকের বেশি নৌ-সরঞ্জাম।
মার্কিন কর্মকর্তা এবং এই বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা স্থবির হয়ে পড়া এবং পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় ইরান সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাদের মিসাইল ও গোলাবারুদ উদ্ধারের তৎপরতা আরও জোরদার করেছে।
বিশেষজ্ঞ এবং কংগ্রেসের সহযোগীরা এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ইরান সম্ভবত ভুয়া লক্ষ্যবস্তু ব্যবহার করে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের একটি অংশ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র যখন এই অঞ্চলে বিশাল সামরিক সমাবেশ ঘটাচ্ছিল, তখনই ইরান তাদের অনেক মিসাইল ও লঞ্চার মাটির নিচে পুঁতে বা অন্য কোনোভাবে লুকিয়ে ফেলেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং লঞ্চার সাইটসহ অসংখ্য লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ করেছে। যদিও এসব হামলায় ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের এখনও সেই সক্ষমতা রয়েছে।
গত বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র এখনও অবশিষ্ট আছে। ওভাল অফিসে তিনি বলেন, 'তাদের ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তবে প্রায় ৮২ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের ড্রোনও ছিল, যার বেশিরভাগই এখন আর নেই।'
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার জানান, ইরানের কাছে এখনও অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, খরা চলছে, তারা ঠিকমতো বেতন দিতে পারছে না, তাদের অর্থনীতি ধসে পড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে তারা পঙ্গু করে দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এই সব সমস্যার পাশাপাশি এখন তাদের হাতে মাত্র অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র আছে। তাদের কোনো কারখানা নেই, নেই কোনো নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনী। সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে, তাই তারা এখন অনেক বেশি দুর্বল ও শোচনীয় অবস্থায় আছে।'
