অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রয়নীতির কারণেই হামের টিকার ঘাটতি: রিপোর্ট
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের টিকা ক্রয় বা সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এই নীতিগত পরিবর্তনের কারণেই মূলত বর্তমান হাম মহামারির সূত্রপাত ঘটেছে, যাতে এরই মধ্যে বাংলাদেশে আড়াইশোর বেশি শিশুর প্রাণহানি হয়েছে। সায়েন্স ডটঅর্গ-এর এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞান বিষয়ক এই জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংকটের শুরুটা হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেসময় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করার দীর্ঘদিনের পুরোনো ব্যবস্থাটি বাতিল করে।
কয়েক দশক ধরে গ্যাভি বা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই)-এর অর্থায়নে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি (ইউনিসেফ) বাংলাদেশে টিকা সরবরাহ করে আসছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার সেই ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি 'উন্মুক্ত দরপত্র' প্রক্রিয়া চালু করে। এই নতুন প্রক্রিয়ায় সরকার ব্যক্তিগত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে টিকার জন্য দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করতে শুরু করে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরপরই জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছিল ইউনিসেফ। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ারস সায়েন্স ডটঅর্গ-কে জানিয়েছেন, তিনি এই ঝুঁকি নিয়ে সে সময়কার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে বারবার সতর্ক করেছিলেন।
ফ্লাওয়ারস স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি উপদেষ্টার কাছে অনুনয় করে বলেছিলেন, 'ঈশ্বরের দোহাই লাগে... এই কাজটি করবেন না।' হামের মহামারির ঝুঁকি সম্পর্কে জাতিসংঘের সংস্থাটির বারবার দেওয়া সতর্কবার্তায় কান না দেওয়ায় তিনি চরম হতাশা প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দরপত্রভিত্তিক এই নতুন ব্যবস্থাটি শুরুতেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়ে। টিকা কেনার এই প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার ফলে দেশে হাম ও রুবেলা (এমআর) টিকার বিশাল সংকট দেখা দেয়।
এমনকি ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, এমন একটি সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচিকে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে পিছিয়ে দেয় এবং পরে তা পুরোপুরি বাতিলই করে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপর খুব দ্রুতই গিয়ে পড়ে। মার্চ মাসের শেষের দিকের অভ্যন্তরীণ সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে যোগ্য শিশুদের মাত্র ৫৯ শতাংশ হামের টিকা পেয়েছে। অথচ মহামারি ঠেকানোর জন্য অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার এই ঘাটতির সুযোগেই হামের প্রাদুর্ভাব দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে সাবেক উপাচার্য ও অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান সায়েন্স ডটঅর্গ-কে পাঠানো এক ইমেইলে এই নীতিগত পরিবর্তনের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
তিনি বলেন, আগের ব্যবস্থাটি ছিল মূলত জরুরি অবস্থার জন্য প্রণীত একটি আইনি ধারার ওপর নির্ভরশীল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পক্ষপাত বা অস্বচ্ছতা এড়াতে একটি 'নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা' চালু করতে চেয়েছিল মাত্র।
তবে নীতিগত এই পরিবর্তনের মারাত্মক পরিণতিগুলো আইনি লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে টিকা সংগ্রহের ব্যর্থতা এবং এর পেছনে থাকা সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ এনে গত ১২ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস।
হামের মহামারিতে আড়াইশোর বেশি শিশুর মৃত্যুর ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে ইউনিসেফের রানা ফ্লাওয়ারসও একমত হয়েছেন যে, সেসময় টিকা ক্রয়ের ব্যবস্থা পরিবর্তনের ওই সিদ্ধান্তটির একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত।
এদিকে, এই সংকটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যখন চরম ক্ষোভ ও একে অপরকে দোষারোপ করার হিড়িক পড়েছে, তখন সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই পরিস্থিতির জন্য সদ্য ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার উভয়কেই দায়ী করেছেন।
তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত থাকা শেখ হাসিনা সায়েন্স ডটঅর্গ-কে দেওয়া এক ইমেইল বার্তায় দাবি করেছেন, তাঁর সরকার টিকাদান কর্মসূচিকে সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তাঁর ১৫ বছরের শাসনমালে দেশে কখনো হামের বড় ধরনের কোনো প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।
