দেশে হামের বিস্তার নীতিগত ঘাটতি ও ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরছে: বিশেষজ্ঞরা
পর্যাপ্ত পরিমাণে টিকা থাকার পরেও পরিকল্পনা, সমন্বয় ও মাঠপর্যায়ে সেবার ঘাটতির কারণে দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে এক নীতিনির্ধারণী সংলাপে জানিয়েছেন বক্তারা।
দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা নীতি, অর্থায়ন ও সেবা প্রদানে বড় ধরনের ঘাটতির কথা তুলে ধরেন।
শনিবার রাতে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এ সংলাপে হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে নীতি ও ব্যবস্থাপনার দ্বৈত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ সেশনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়ে ব্যবস্থাগত দুর্বলতা মূল্যায়ন ও সমাধানের প্রস্তাব দেন।
টিকাবিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, এ সংকটের মূল কারণ নীতি ও অর্থায়নসংক্রান্ত সমস্যা। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত টিকা সংগ্রহের জন্য সরকার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সমর্থিত কোভিড-১৯ টিকা সুবিধার আওতায় উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথভাবে টিকা সংগ্রহের অনুমোদন থাকলেও ফাইল ছাড়ে দেরি হওয়ায় কার্যক্রম এগোয়নি। তার মতে, টিকার কোনো ঘাটতি ছিল না, তবে বিতরণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে ব্যর্থতার কারণে সেবা কেন্দ্রে যথাসময়ে টিকা পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. সাইদা হুমাইদা হাসান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে হামের রোগী দ্রুত বেড়েছে। ১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত হাসপাতালে ২২৬ জনের বেশি সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া গেছে, যাদের বেশিরভাগই নিম্নআয়ের, অপুষ্টিতে ভোগা এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী শিশু।
তিনি বলেন, অনেক শিশু টিকা নেয়নি বা আংশিক টিকা নিয়েছে, ফলে এ রোগে আক্রান্ত বেশি। পাশাপাশি আগের বছরের তুলনায় এবার গুরুতর রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কোয়ালিটি কেয়ার কনসার্নের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ডা. মো. আমিনুল হাসান বলেন, টিকাদান ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাতের কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুনে দীর্ঘদিনের সেক্টর প্রোগ্রামটি সঠিক রূপান্তর পরিকল্পনা ছাড়াই বন্ধ হওয়ায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। পরে প্রকল্পভিত্তিক ব্যবস্থায় যাওয়ার ফলে ক্রয়, সরবরাহ শৃঙ্খল ও সেবা প্রদানে দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, ইউনিসেফের সহায়তায় টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থা থেকে সরকারি ব্যবস্থায় রূপান্তরে দেরি হওয়ায় এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত ও অনুমোদন জটিলতার কারণে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
আমরা কমিউনিটি হাসপাতালের ডা. মহসিন জিল্লুর করিম বলেন, অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, যার প্রভাব চিকিৎসায় পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভয়ের কারণে রোগ নির্ণয়ে দেরি হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় বা ভুল চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে—ফলে এড়ানো সম্ভব এমন জটিলতা ও মৃত্যুও বাড়ছে।
তিনি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সমন্বিত স্থানীয় উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে ডা. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলা এখনই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করতে ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তিনি নিয়মিত টিকাদান জোরদার এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবার ও কমিউনিটিতে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে টিকা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে বিতরণ করা সম্ভব হয়নি–এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থার গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, "প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে জনসচেতনতার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে জোরদার করতে হবে।"
