দেশে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩,০০০ ছাড়াল; নিয়মিত টিকাদান জোরদারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চলমান হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শুধু জরুরি টিকাদান কার্যক্রম যথেষ্ট নয়; তারা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর সিরডাপ (সিআইআরডিএপি) মিলনায়তনে ২০২৬ সালে হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় তারা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
দেশজুড়ে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩ হাজার ছাড়িয়েছে, আর হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ২৫০।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) জানায়, রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও সংশ্লিষ্ট উপসর্গে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে সারাদেশে হামের মতো উপসর্গ নিয়ে ১,৪৪৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ল্যাব-পরীক্ষায় ৯০ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম সংক্রমণে অন্তত ৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামের মতো উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ২২০ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ল্যাব পরীক্ষায় ৪,৬৯৩ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয় গেছে।
মোট ৩৩,৩৮৬ সন্দেহভাজন সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে চিকিৎসা শেষে ইতোমধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ১৯,০১৮ জন।
দুই ডোজ এমআর কভারেজ ৯৫ শতাংশে উন্নীত করার ওপর জোর
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে চলমান হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় শুধু জরুরি টিকাদান কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। নিয়মিত টিকাদান সেবা পুনরুদ্ধার, দুই ডোজ এমআর কভারেজ ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে হবে।
একই সঙ্গে মিসড কোহর্ট চিহ্নিতকরণ, ভ্যাকসিন ও কোল্ড চেইনের সরবরাহ নিশ্চিত করা, নজরদারি ও কেস ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তারা।
সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত 'বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে তরুণ প্রজন্ম ও অংশীজনদের সমন্বিত কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় এবং ২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা' শীর্ষক আলোচনা সভাটি আয়োজন করে ইপিআই, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন।
সভায় গ্যাভির সিএসও কনস্টিটুয়েন্সি স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, টিকাদান কর্মসূচি বাংলাদেশের একটি সফল উদ্যোগ। এটিকে আরও কার্যকর ও স্থিতিস্থাপক করতে ইপিআই কর্মসূচির শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, নিয়মিত টিকার মজুদ নিশ্চিত করা, সিটি করপোরেশন এলাকায় নিজস্ব টিকাদান কর্মী নিয়োগ, বাজেট বরাদ্দ ও বিতরণ ত্বরান্বিত করা, সরকারি বাজেটের আওতায় ভ্যাকসিন সরবরাহ ও কোল্ড চেইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং দুর্গম ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, "দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ৮০ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় আসবে এবং মে মাসের মাঝামাঝি পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।"
এখন পর্যন্ত ৯৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৪ শিশু টিকা পেয়েছে
৫ এপ্রিল থেকে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে জরুরি এমআর টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, যেখানে প্রথমে ১৮টি অগ্রাধিকার জেলার ৩০টি উপজেলায় প্রায় ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়, যার সঙ্গে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল, আইসোলেশন ব্যবস্থা, জোরদার নজরদারি এবং সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত জরুরি এই কর্মসূচির আওতায় ৯৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৪ শিশু হাম টিকা পেয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং এটিকে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকির প্রাদুর্ভাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, যাদের অনেকেই টিকা নেয়নি বা আংশিক টিকা পেয়েছে, যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
বক্তারা বলেন, তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে টিকাদান বিষয়ে আস্থা তৈরি, গুজব প্রতিরোধ এবং পরিবারে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এখন জরুরি। এ ক্ষেত্রে যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুস্থ শিশুদের টিকা দেওয়া এবং আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।
তিনি বলেন, "হাম রোগ লক্ষণ প্রকাশের চার দিন আগ থেকেই ছড়াতে পারে, তাই আগে শনাক্ত করা কঠিন—এ কারণে প্রতিরোধমূলক টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর।"
তিনি আরও বলেন, "টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও তা কার্যকর হতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। তাই জরুরি ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ভিটামিন এ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ওষুধ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।"
