পাবলো এসকোবারের জলহস্তী মারতে চায় কলম্বিয়া, ভারতে এনে বাঁচাতে চান অনন্ত আম্বানি
কলম্বিয়ায় পাবলো এসকোবারের ৮০টি 'কোকেন জলহস্তী' মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছে সে দেশের সরকার। তবে এই জলহস্তীগুলোকে নিজের বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে আশ্রয় দিতে চেয়েছেন ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানি।
১৯৮০-এর দশকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশে জলহস্তী এনেছিলেন কুখ্যাত মাদকসম্রাট পাবলো এসকোবার। লাতিন আমেরিকার অন্যতম বড় ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা বানানোর শখ ছিল তার। সেখানে নানা ধরনের প্রাণী রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।
এরপর থেকে বংশবিস্তার হয়ে বর্তমানে জলহস্তীর সংখ্যা প্রায় ১৬০টিতে দাঁড়িয়েছে। এখন এসব জলহস্তীর কারণে কলম্বিয়ার স্থানীয় প্রজাতির প্রাণীরা হুমকির মুখে পড়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে কলম্বিয়া সরকার জানায়, তারা ৮০টি জলহস্তী মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছে। তাদের এই ঘোষণা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
অনন্ত আম্বানি কলম্বিয়া সরকারকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি জলহস্তীগুলোকে ভারতে তার পরিচালিত একটি উদ্ধারকেন্দ্রে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অনন্ত বলেন, 'এই ৮০টি জলহস্তী কোথায় জন্ম নেবে তা যেমন তারা নিজেরা ঠিক করেনি, তেমনি এখন তারা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, সেটাও তাদের তৈরি করা নয়। এগুলো জীবন্ত ও অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণী। একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাধানের মাধ্যমে তাদের বাঁচানোর সামর্থ্য যদি আমাদের থাকে, তবে সেই চেষ্টা করার দায়িত্বও আমাদের।'
অনন্ত আম্বানির প্রস্তাব
ভারতের গুজরাট রাজ্যের জামনগরে 'ভান্তারা' নামের একটি বন্য প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন অনন্ত আম্বানি। এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ২ হাজারেরও বেশি প্রজাতির ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রাণী রয়েছে।
কলম্বিয়ার পুয়ের্তো ত্রিউনফো এলাকার হাসিয়েন্দা নেপোলস এস্টেটের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো এই ৮০টি জলহস্তীকে ভান্তারাতে নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছেন অনন্ত। এই এস্টেটটি একসময় এসকোবারের ছিল, যা এখন পর্যটকদের জন্য ব্যবহার করা হয়।
সোমবার অনন্ত আম্বানির পক্ষে ভান্তারার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ভিভান কারানি এক বিবৃতিতে বলেন, 'এই জলহস্তীগুলোকে গ্রহণ করতে এবং যত্ন নিতে আমরা প্রস্তুত। তাদের জন্য আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করব, যা তাদের বর্তমান বাসস্থানের মতোই হবে এবং তাদের সুস্থতা নিশ্চিত করবে।'
কারানি তার বিবৃতিতে জানান, কলম্বিয়া সরকার এই প্রস্তাবে রাজি হলে 'প্রয়োজনীয় অনুমোদন, পারমিট, আইনি প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা শর্ত এবং লজিস্টিক পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতি রেখে' জলহস্তীগুলোকে ভারতে নেওয়া হবে। কোনো প্রাণীর ক্ষতি না করার নীতির ওপর ভিত্তি করে এদের আজীবন যত্নে রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
এই প্রস্তাবের বিষয়ে কলম্বিয়ার পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নমন্ত্রী আইরিন ভেলেজ তোরেসের মন্তব্য জানতে চেয়েছে সিএনএন, তবে এখনো কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
ভান্তারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই উদ্যোগ নিয়ে কলম্বিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করে তাদের ভান্তারা পরিদর্শনের আমন্ত্রণও জানিয়েছে ভান্তারা কর্তৃপক্ষ।
ভারতের অন্যতম বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত নিজেকে একজন প্রাণীপ্রেমী হিসেবে দাবি করেন। তিনি বলেন, 'আমি প্রাণীদের মাঝে ঈশ্বরকে দেখি, আর ভান্তারা হলো একটি মন্দির।' ২০২৪ সালে রাধিকা মার্চেন্টের সঙ্গে তার বিলাসবহুল বিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। কয়েক কয়েক মাস ধরে এই বিয়ের উদযাপন হয়েছিল।
'আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতি'
কলম্বিয়ার পরিবেশমন্ত্রী ভেলেজ জলহস্তী মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত জানানোর সময় বলেছিলেন, ম্যাগডালেনা নদীর অববাহিকায় এই 'আগ্রাসী প্রজাতির' অনিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধির কারণেই ৮০টি জলহস্তী মারার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ১৩ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'এই পদক্ষেপ না নিলে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। হিসাব বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জলহস্তীর সংখ্যা অন্তত ৫০০-তে গিয়ে দাঁড়াবে। ফলে আমাদের বাস্তুতন্ত্রের পাশাপাশি ম্যানাটি ও নদীর কচ্ছপের মতো স্থানীয় প্রাণীদের মারাত্মক ক্ষতি হবে। বাস্তুতন্ত্রের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।'
এর কয়েক সপ্তাহ আগে কলম্বিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারা এই প্রাণীদের ইকুয়েডর, পেরু, ফিলিপাইন, ভারত, মেক্সিকো, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ আফ্রিকা ও চিলির মতো দেশগুলোতে স্থানান্তরের উপায় খুঁজছে। তবে আন্তর্জাতিক বিধান এবং 'অপারেশনাল সীমাবদ্ধতার কারণে' সেই উদ্যোগ এগোয়নি।
৪০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারা এই জলহস্তীকে ২০২২ সালের মার্চ মাসে কলম্বিয়ার 'আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির' তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর পরই এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি সুযোগ পায় কলম্বিয়া সরকার।
