কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের ‘বাস্তব হুমকি’ রয়েছে, বিবিসিকে পেত্রো
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার একটি 'বাস্তব হুমকি' তৈরি হয়েছে। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
পেত্রো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোকে নিজেদের 'সাম্রাজ্যের' অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পরই এমন মন্তব্য করেন পেত্রো।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারকারী রাষ্ট্র থেকে ধীরে ধীরে বিশ্ব থেকে 'বিচ্ছিন্ন' একটি দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে পেত্রো মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) বাহিনীর কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করে তাদের 'নাৎসি ব্রিগেড'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসন ও অপরাধ দমনের নামে আইসের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান 'যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে'।
তিনি একাধিকবার পেত্রোকে সতর্কও করেছেন। ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট।
বুধবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প ও পেত্রোর মধ্যে ফোনালাপ হয়। এরপর ট্রাম্প জানান, তিনি 'নিকট ভবিষ্যতে' হোয়াইট হাউসে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প ওই কথোপকথনকে 'বিশাল সম্মান' বলে উল্লেখ করেন।
তবে বৃহস্পতিবার পেত্রোর বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের তেমন উন্নতি হয়নি বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ফোনালাপটি এক ঘণ্টারও কম সময়ের ছিল এবং 'বেশির ভাগ সময় আমিই কথা বলেছি'। আলোচনায় কলম্বিয়ায় মাদক পাচার, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এবং লাতিন আমেরিকাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা উঠে আসে।
পেত্রো আবারও মার্কিন অভিবাসন অভিযানকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, আইস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা শুধু লাতিন আমেরিকার মানুষদেরই রাস্তাঘাটে নিপীড়ন করছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও হত্যা করছে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ ও মানব পাচারের জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে আসছেন। এই যুক্তিতে তিনি বড় আকারের অভিযান চালাচ্ছেন এবং কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলো মাদক পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে আইস এজেন্ট মোতায়েন করেছেন। সংস্থাটি অভিবাসন আইন প্রয়োগ, অবৈধ অভিবাসন তদন্ত এবং অনথিভুক্ত অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ার কাজ করে।
প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ লাখ ৫ হাজার মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ১৯ লাখ অভিবাসী 'স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ' করেছে বলে দাবি করা হয়। গ্রেপ্তার বা আটক এড়াতে দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করতে চালানো আগ্রাসী প্রচারণার পর এসব মানুষ দেশ ছেড়েছে বলে প্রশাসন জানায়।
সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রানজ্যাকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিংহাউসের অভিবাসন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ আইসের হেফাজতে ছিলেন।
এ সপ্তাহে মিনিয়াপোলিস শহরে এক মার্কিন অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে ৩৭ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিক নিহত হন।
ফেডারেল কর্মকর্তারা জানান, রেনি নিকোল গুড নামের নিহত ওই নারী অভিবাসন কর্মকর্তাদের গাড়ি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে শহরের ডেমোক্র্যাট মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেন, গুলি চালানো কর্মকর্তা বেপরোয়া আচরণ করেছেন। তিনি শহর থেকে ফেডারেল এজেন্টদের প্রত্যাহারের দাবি জানান।
পেত্রো বলেন, আইস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি আর শুধু লাতিন আমেরিকার মানুষদের বিরুদ্ধে কাজ করছে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও হত্যা করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধারা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র একটি সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্নের পেছনে ছুটে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারকারী রাষ্ট্র নয়, বরং বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দেশে পরিণত হবে। তিনি বলেন, 'বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে কোনো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে না।'
ট্রাম্প ও পেত্রো দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে নিয়মিত কটাক্ষ ও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে আসছেন।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন 'তেল ও কয়লা'র জন্য যুদ্ধ খুঁজছে।
গুস্তাভো পেত্রো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে না যেত, তাহলে কোনো যুদ্ধ হতো না এবং বিশ্বের সঙ্গে তার, বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে, সম্পর্ক হতো আরও গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ।
তার মতে, 'ভেনেজুয়েলার বিষয়টি মূলত এটাই।'
কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর দেশজুড়ে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের পক্ষে বিক্ষোভ হয়।
বিবিসিকে পেত্রো বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য একটি 'বাস্তব হুমকি'।
বিশ শতকে পানামাসহ বিভিন্ন ভূখণ্ড হারানোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এই হুমকি দূর হওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে কলম্বিয়া কীভাবে আত্মরক্ষা করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে পেত্রো বলেন, তিনি 'সংলাপকেই প্রাধান্য দিতে চান' এবং এ বিষয়ে 'কাজ চলছে'।
তবে তিনি বলেন, কলম্বিয়া কীভাবে বড় বাহিনীর মুখে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা দেশটির ইতিহাসে থেকে জানা যায়।
তিনি বলেন, আমরা বলব না যে আমাদের কাছে নেই এমন অস্ত্র দিয়ে আমরা বিশাল সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করব। আমাদের কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নেই। বরং আমরা জনগণ, পাহাড় ও জঙ্গলের ওপর নির্ভর করি—যেমনটি সবসময় করেছি।
পেত্রো জানান, তিনি ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তেলমন্ত্রী ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গেও কথা বলেছেন এবং তাকে কলম্বিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপের শিকার। এসব সংস্থার কলম্বিয়ায় কাজ করার অনুমতি থাকলেও তা কেবল মাদক পাচার দমনের জন্য। তিনি কলম্বিয়ায় অন্যান্য 'গোপন অভিযানের' চেষ্টার নিন্দা জানান।
ভেনেজুয়েলার মতো কলম্বিয়াতেও সিআইএ গোপন অভিযান চালাতে পারে কি না বা তার নিজের সরকার কিংবা ঘনিষ্ঠ মহলে তথ্যদাতা থাকতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি পেত্রো।
ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরের এক সিআইএ সূত্রের সহায়তায় মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ডেল্টা ফোর্স নিকোলাস মাদুরোর অবস্থান শনাক্ত করে তাকে আটক করে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন উৎপাদনকারী দেশ কলম্বিয়া বৈশ্বিক মাদক পাচারের একটি প্রধান কেন্দ্র। দেশটিতে তেলের বড় মজুত রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে স্বর্ণ, রৌপ্য, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লার মতো নানা উল্লেখযোগ্য সম্পদ।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রস্তুতির মধ্যেও দেশটির তেল বিক্রি 'অনির্দিষ্টকাল' নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।
ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প পেত্রোকে 'একজন অসুস্থ মানুষ' বলে আখ্যা দেন, যিনি কোকেন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করেন।
ট্রাম্প বলেন, 'তিনি খুব বেশি দিন এটা করতে পারবেন না।'
পেত্রো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'সবসময়ই প্রমাণ হয়েছে যে আমি এর সঙ্গে জড়িত নই।'
তিনি জানান, গত ২০ বছর ধরে তিনি মাদক কার্টেলের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, যার কারণে তার পরিবারকে নির্বাসনে যেতে হয়েছে।
সাবেক গেরিলা যোদ্ধা পেত্রো ক্ষমতায় আসার পর 'পূর্ণ শান্তি' কৌশল অনুসরণ করছেন, যার লক্ষ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংলাপ।
সমালোচকদের মতে, এই নীতি অতিরিক্ত নরম হওয়ায় কোকেন উৎপাদন রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে।
তার উদ্যোগ কী ব্যর্থ হয়েছে এবং এর দায় তিনি নেবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পেত্রো বলেন, কোকা চাষের বৃদ্ধি ক্রমে ধীর হচ্ছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুটি সমান্তরাল পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। একদিকে দস্যু গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলছে, অন্যদিকে যারা শান্তি চায় না, তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ কলম্বিয়ায় আলোচনা চলছে, যেখানে কোকা পাতার চাষ সবচেয়ে বেশি কমেছে এবং হত্যার হারও সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে। কোকা গাছের পাতা থেকেই কোকেন তৈরি হয়।
পেত্রোর ভাষায়, সংলাপের লক্ষ্য সহিংসতা কমানো।
তিনি বলেন, 'আমরা বোকা নই, আমরা জানি কার সঙ্গে আলোচনা করছি।'
