২০১৮-র ‘রাতের ভোট’ করতে ১০,০০০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেন এস আলম ও সালমান এফ রহমান: পুলিশ প্রতিবেদন
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৯৬৭ কোটি টাকা। তবে 'রাতের ভোট' হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকারি বরাদ্দের বাইরেও চাঁদাবাজির মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল আওয়ামী লীগ। মূল সরকারি বরাদ্দের প্রায় দশগুণ এই টাকা বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
২০১৮ সালের সেই বিতর্কিত নির্বাচনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা খাতেই প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।
পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ৪৫৬ পাতার ওই প্রতিবেদনের কিছু অংশ টিবিএসের হাতে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে ২০১৮ সালের 'রাতের ভোটের' রহস্য উদঘাটন করতে প্রায় ছয় মাস ধরে পুলিশের সব ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে। এতে 'রাতের ভোটের' কারিগরদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের তথ্যও উঠে এসেছে।
ভোট কারচুপির জন্য অর্থ বিতরণের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'রাতের ভোট' সম্পন্ন করতে লেনদেন হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এসব অর্থের মধ্যে চারটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (পুলিশসহ), দুটি গোয়েন্দা সংস্থা এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বিভাগীয় কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পেছনে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৫ হাজার কোটি টাকা ভাগাভাগি শেখ রেহানা, এস আলম, সালমান এফ রহমান ও এইচ টি ইমামের মধ্যে। এর মধ্যে শুধু পুলিশই পেয়েছিল ১ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী এস আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয় নির্বাচনের জন্য অর্থ সংগ্রহের। একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, তিনি ৮ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তা বিতরণ করেন।
অর্থ সংগ্রহের উৎস ছিল ব্যাংক দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শনের করে অর্থ আদায়, ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি ও সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ আদায়।
পুলিশকে দেওয়া হয়েছিল 'অর্থ প্রণোদনা'
নির্বাচনের সময়ে পুলিশকে 'প্রণোদনা' নামের যে আর্থিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল, তা আসলেই প্রণোদনা নাকি ভোট ডাকাতির অগ্রিম পেমেন্ট, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, প্রণোদনার মোড়কে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা প্রকৃতপক্ষে ব্যয় করা হয়েছে ব্যালট কারচুপি, বিরোধীদের দমন ও প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থায়ন ছিল এক রাজনৈতিক বিনিয়োগ, যার বিনিময়ে প্রত্যাশিত ছিল ভোট ডাকাতি। এই অর্থের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্রবিরোধী অভিযানের অগ্রিম পেমেন্ট।
দশ হাজার কোটি টাকার ১ হাজার কোটি টাকা শুধু পুলিশ বাহিনীকেই দেওয়া হয়। এই অর্থ কয়েক ধাপে সরাসরি পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই নগদ অর্থ সদর দপ্তরে পৌঁছানোর কাজে জড়িত ছিলেন সালমান এফ রহমান , এইচ টি ইমাম ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তাদের অনুগত তৎকালীন যুগ্ম সচিব হারুন উর রশিদ, উপসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস ও তৎকালীন ডিসি (সিটিটিসি) প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিআইজি হাবিবুর রহমান, ঢাকা জেলার এসপি শাহ মিজান শাফিউর রহমানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পুলিশ সদর দপ্তরে এই অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়াও তাদের কিছু বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরে পর্যায়ক্রমে কয়েকদিনে এই নগদ অর্থ পৌঁছে দেন।
পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার পেয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজি বলেন, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে 'দায়িত্ব পালন ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন' করার ক্ষেত্রে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, পুরস্কারের জন্য তাদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি ও পুরস্কৃত করার পেছনে। সব রেঞ্জের ডিআইজি ও ৬৪ জেলার পুলিশ সুপাররা পদক তালিকায় বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছেন। তাদের পদোন্নতির পাশাপাশি ভালো স্থানে পদায়ন করা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'নৈশভোটে' যারা সব ধরনের সহায়তা করেছেন, তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকাটি সরকারের শীর্ষ মহলের পাশাপাশি দুদকের কাছেও পাঠানো হয়। তদন্তে জানা যায়, রাতের ভোটের ধারণাটি প্রথমে পুলিশের মাধ্যমেই এসেছিল।
অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের ছয় নেতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ সংগ্রহের পেছনে আওয়ামী লীগের ছয় প্রভাবশালী নেতা সব ধরনের কলকাঠি নেড়েছেন। তারা দেশ-বিদেশে অবস্থান করা ব্যবসায়ী ও অন্যান্য খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। রাতের ভোট সম্পন্ন করতে নির্বাচনের তিন মাস আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের হাইকমান্ড। এর পেছনে কাজ করেছেন পুলিশের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তাও। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে পলাতক আছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে কয়েকজন কারাগারে থাকলেও বাকিরা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
তদন্তের সাথে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, এই ভোট জালিয়াতির কুশীলব কারা, তা উদঘাটন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ক্ষমতা ধরে রাখতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন অনেকটা বেপরোয়া। গণতন্ত্রবিরোধী নির্দেশ মেনে তা বাস্তবায়ন করতে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন পুলিশ, প্রশাসন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। যারা এসব কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের পরিচয়ও উদঘাটন করা হয়েছে।
রাতের বেলায় ভোট নেওয়ার কারিগর ও সহায়তাকারীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকায় সাবেক আইজিপি, ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ওসি, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, জেলা প্রশাসক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী ও সচিবদের নাম রয়েছে।
পলিশ সূত্র জানায়, ২০১৮-র নির্বাচনের মাস তিনেক আগে গণভবনে বিশেষ বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে শেখ রেহানা, তাতিক আহমেদ সিদ্দিক, সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, এইচ টি ইমাম, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
ওই বৈঠকে রাতের ভোট করতে একটি বাজেট ধরা হয়। বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করতে শেখ রেহানা, সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা দেশ-বিদেশে থাকা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন।
টাকা বিতরণের নেটওয়ার্ক
প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিতীয় ধাপে টাকার সুষম বিতরণের উদ্দেশ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের ভেতরেই গড়ে তোলা হয় একটি গোপন নেটওয়ার্ক। ২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, আটটি রেঞ্জের ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও বিশেষ ইউনিটের প্রধানদের হাতে এ অর্থ তুলে দেওয়া হয়। একেকটি জেলার জন্য বরাদ্দ ছিল ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা। রেঞ্জ পর্যায়ে দেওয়া হয় ৫ থেকে ১৫ কোটি টাকা। ডিএমপি ও অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনাররা পান ২ থেকে ৭ কোটি টাকা করে। থানা পর্যায়ে ওসিরা পান ১০ লাখ টাকা, তদন্ত ও অপারেশন শাখার পরিদর্শকরা পান ৫ লাখ এবং এএসপি ও সার্কেল অফিসাররা ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা করে পান।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, র্যাবের তৎকালীন প্রধান বেনজীর আহমেদ ১০০ কোটি, এসবির অতিরিক্ত আইজিপি মীর শহীদুল ইসলাম ৫০ কোটি ও তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী অন্তত ১৫০ কোটি টাকা পেয়েছিলেন। এর বিনিময়ে নির্বাচনের রাতে এই ইউনিটগুলো 'নীরব কার্যকর' ভূমিকা পালন করে। পুলিশের অন্তত ৫২ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এতে সরাসরি অংশ নেন। তারা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্সে সিল মারা, বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দেওয়া ও ভোটের ফল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযুক্তদের অধিকাংশই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত অন্তত ১৫ জন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, দুবাই ও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক কর্মকর্তা এখনো কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।
ওবায়দুল কাদের ছিলেন কারচুপির সার্বিক ব্যবস্থাপনায়
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচন কারচুপির সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকি করেছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী এতে জড়িত ছিলেন। এমনকি কিছু কেন্দ্রে মোট ভোটারের চেয়েও বেশি ভোট কেটে ফেলা হয়েছিল। পরে সেসব ব্যালট পুড়িয়ে ফেলে আবারও হিসাব করে বাক্স ভর্তি করা হয়।
এদিকে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন ছিল মূলত গণতন্ত্রের এক পরিকল্পিত 'অপব্যাখ্যা'। প্রধান বিরোধী দলগুলোর অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের একটি কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ দেখাতে 'ডামি প্রার্থী' দাঁড় করানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
কমিশন বলেছে, ২০২৪ সালের 'ডামি' কৌশল ছিল গত এক দশকে ভোটাধিকার হরণের চূড়ান্ত বিবর্তন। এর আগে ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে 'রাতের ভোট' হয়—যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালট আগেভাগেই সিল মারা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই অংশ ছিল ২০২৪-এর এই আয়োজন।
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের নির্বাচন মূলত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার জন্যই সাজানো হয়েছিল। সে সময় ১৫৩টি আসনেই প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাকি ১৪৭টি আসনে যে ভোট হয়েছিল, তা ছিল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায় সাজানো তথাকথিত প্রতিযোগিতা। বিএনপি ও অন্য অধিকাংশ দল এই নির্বাচন বর্জন করে এবং একে প্রহসন ও কারচুপির নির্বাচন বলে অভিহিত করে।
২০১৮ সালে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে রাত ১০টা থেকে ভোর ৩টার মধ্যে ব্যালট পেপারে সিল মারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলগুলো সেই নির্বাচনে অংশ নিলেও কারচুপির ব্যাপকতা আঁচ করতে পারেনি।
