২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ নির্বাচন ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ‘অভিনব পরিকল্পনা’: নির্বাচন তদন্ত কমিশন
২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের 'উদ্ভাবনী পরিকল্পনার' অধীনে পরিচালিত হয়েছিল বলে জানিয়েছে এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করতে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে একটি সমন্বিত প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়েছে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তিন নির্বাচনের নকশা ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সিভিল প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি বাছাইকৃত অংশকে পদ্ধতিগতভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। এই বিশেষ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ সমন্বয় ইউনিট গঠন করা হয়েছিল, যা 'ইলেকশন সেল' বা 'নির্বাচন সেল' হিসেবে পরিচিত ছিল।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করতে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আসার জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি 'অনৈতিক প্রতিযোগিতা' কাজ করত। এর ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হার ১০০ শতাংশও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নির্বাচন কমিশন থেকে প্রশাসনিক যন্ত্রের হাতে চলে যায়। এই এক দশকে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন গৌণ হয়ে পড়ে এবং প্রশাসনই মূখ্য শক্তিতে পরিণত হয়।
কমিশন আরও জানিয়েছে, এই তিনটি নির্বাচনে হাজার হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি নির্বাচনী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে তদন্তের জন্য নির্ধারিত সময় সীমিত হওয়ায় প্রত্যেক ব্যক্তির নাম বা তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা আলাদাভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তে উঠে আসা অন্যান্য অনিয়মের মধ্যে রয়েছে- ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে কারসাজি, ব্যালট বাক্স আগেভাগে ভর্তি করা, ভোটার উপস্থিতির সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো, কেন্দ্রে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করা, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করা বা প্রলুব্ধ করা এবং নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে 'ডামি প্রার্থী' দাঁড় করানো।
সাবেক হাইকোর্ট বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত কমিশন গত ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন- সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসেন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আব্দুল আলীম।
