চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অভিযান, নথিপত্র তালা দিয়ে উপাচার্য ঢাকায়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র উপাচার্যের কার্যালয়ে তালাবদ্ধ থাকায় এবং উপাচার্য বর্তমানে বিদেশে থাকায় দুদকের এই অভিযান অনেকটা থমকে যায়।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১-এর একটি দল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এই অভিযান চালায়। তবে উপাচার্যের অনুপস্থিতির কারণে কোনো নথিপত্র যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দুদক চট্টগ্রাম-১-এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম অভিযানের বিষয়ে জানান, গত ১৫ মাসে অবৈধভাবে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ফিন্যান্স, ফার্সি ও ক্রিমিনোলজি বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শিক্ষকদের আত্মীয়দের নিয়োগ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই অভিযান। তিনি বলেন, 'নিয়োগের নথিপত্র উপাচার্যের কার্যালয়ে তালাবদ্ধ ছিল এবং উপাচার্য বর্তমানে ঢাকায় থাকায় আমরা সেগুলো দেখতে পারিনি। নথিপত্র পর্যালোচনা ছাড়া নিয়োগ বৈধ ছিল কি না তা বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা বিস্তারিত প্রতিবেদন আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কমিশনে দাখিল করব।'
অভিযোগের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ। অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীমকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ ডিসেম্বর ফিন্যান্স বিভাগের চারটি প্রভাষক পদের বিপরীতে নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৫১ জন আবেদনকারীর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৮ জন প্রেজেন্টেশন ও ভাইভায় অংশ নেন। সমন্বিত নম্বরের ভিত্তিতে চারজনকে সুপারিশ করা হয়, যার মধ্যে মাহিরা শামীমও রয়েছেন। উল্লেখ্য, মাহিরা ওই বিভাগেরই সাবেক শিক্ষার্থী এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় হয়েছিলেন।
নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নসরুল কাদির বলেন, 'ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মাহিরা শামীমের আন্তর্জাতিক জার্নালে দুটি গবেষণা থাকায় তিনি এগিয়ে ছিলেন।' একই সুরে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান বলেন, 'বোর্ডের সভাপতি ছিলেন উপাচার্য। আমি ওই বোর্ডের কেউ ছিলাম না। আমার মেয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতেই আবেদন করেছে এবং বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে।'
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তাঁর ভাই মো. আব্দুল কাইয়ুমকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চবি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম বলেন, 'আমার ভাই যেদিন আবেদন করেন, সেদিনই আমি নিয়োগ বোর্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম। কাইয়ুমের শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যন্ত ভালো এবং তিনি সৌদি আরবের জেদ্দা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলেও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন।' নেতিবাচক সমালোচনার কারণে তার ভাই আদৌ চাকরিতে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে এখন সংশয় দেখা দিয়েছে বলেও তিনি জানান।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্ত সব নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নথিপত্র সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। নথিপত্র পাওয়ার পরেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো আইনের লঙ্ঘন হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
