তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন: ২০২৪ সালের নির্বাচনে ‘ডামি প্রার্থী’ চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন
২০২৪ সালের বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ছিল মূলত গণতন্ত্রের এক পরিকল্পিত 'অপব্যাখ্যা'। প্রধান বিরোধী দলগুলোর অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের একটি কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ দেখাতে 'ডামি প্রার্থী' দাঁড় করানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) তদন্ত কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জন করার পর, তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দেশিয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক হিসেবে দেখাতে এই কৌশল অবলম্বন করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচন কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাজানো একটি নিয়ন্ত্রিত আয়োজন। প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন থেকে দূরে থাকায়, তৎকালীন প্রশাসন 'স্বতন্ত্র' প্রার্থীদের উৎসাহিত করে—যাদের অনেকেই ছিলেন সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত এবং তারা মূলত 'ডামি প্রার্থী' হিসেবে ভোটের মাঠে ছিলেন।
মূলত ২০১৪ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি এড়াতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। সে সময় ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে নেটিজেনসহ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এই ডামি প্রার্থীদের মাঠে নামানোর মাধ্যমে হাসিনা সরকার একটি বহুদলীয় প্রতিযোগিতার বিভ্রম তৈরির চেষ্টা করেছিল, যদিও নির্বাচনের ফলাফল ছিল আগে থেকেই নির্ধারিত।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদনটি গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা বলেন, 'দেশের মানুষ আগে থেকেই ভোট কারচুপির কথা জানলেও, তৎকালীন শাসনামলে ইচ্ছা অনুযায়ী কীভাবে পদ্ধতিগতভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে কাগজে কলমে রায় লেখা হয়েছিল, এই প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট হয়েছে।'
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, 'জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এ ধরনের নির্বাচনের আয়োজন করা ছিল গোটা জাতির জন্য একটি শাস্তি। কারণ দেশের মানুষ তখন অসহায়ভাবে নিজেদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার দৃশ্যটি দাঁড়িয়ে দেখেছিল।'
কমিশন উল্লেখ করেছে যে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রশাসনই নির্বাচন পরিচালনার প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যার ফলে নির্বাচন কমিশন একটি নামমাত্র প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের 'ডামি' কৌশল ছিল গত এক দশকে ভোটাধিকার হরণের একটি চূড়ান্ত বিবর্তন। এর আগে ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে 'মধ্যরাতের ভোট'—যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালট আগেভাগেই সিল মারা হয়েছিল—সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই অংশ ছিল ২০২৪-এর এই আয়োজন।
হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত কমিশন বলেছে, এসব কর্মকাণ্ড দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কলুষিত করে দিয়েছে।
