পোস্টাল ব্যালটে অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি, বিএনপি-জামায়াতের উদ্বেগের পর জানাল ইসি
বাহরাইনে একটি বাসায় প্রবাসী ভোটারদের কাছে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটের খাম গণনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর গতকাল নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, ওই ঘটনায় পোস্টাল ব্যালট বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট নিয়ে ছড়িয় পড়া ওই ভিডিওকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী পৃথকভাবে এই ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং প্রবাসী ভোট নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। এরপরই ইসির এই বক্তব্য এল।
ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি একটি বাসায় অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুনছেন। ব্যালটগুলোর খামে বাহরাইনের ঠিকানা লেখা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। তবে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, এ ঘটনায় তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন হয়নি। কোনো খাম খোলা হয়নি। তবে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কোথাও অনিয়ম পেলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিএনপির নেতারা প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
গতকাল আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের পৃথক দুটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে।
বৈঠক শেষে বিএনপির প্রতিনিধি দলের প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট যেভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, তা নিয়ে তাদের দল এখনো উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, 'যারা এই পোস্টাল ব্যালট প্রণয়নের এবং প্রেরণের কাজে ছিল বা এগুলোর বিষয়ে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল, তাদেরকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। ইলেকশন কমিশনকে ব্যাখ্যা দিতে হবে।'
সালাহউদ্দিন অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একেকটি বাড়িতেই শত শত ব্যালট দেখা গেছে। এছাড়া কিছু জায়গায় ব্যালট জব্দ করার খবর এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার দাবি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দের পরদিন, ২২ জানুয়ারি থেকে ভোট শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই ভোট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি একজনের পরিচয় ব্যবহার করে আরেকজনের ব্যালট সংগ্রহের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সালাহউদ্দিন আরও বলেন, প্রথমবার প্রবাসীদের ভোটদানের উদ্যোগ হওয়ায় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ গুরুতর এবং এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বিকেলের দিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হামিদুর রহমান বলেন, বিদেশে পোস্টাল ব্যালটের অনিয়মের সঙ্গে জামায়াতকে জড়িয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
'বাহরাইন বা বিদেশে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সাংগঠনিক শাখা নেই। যেখানে দলীয় কমিটি নেই, সেখানে রাজনৈতিক নেতার সম্পৃক্ততার প্রশ্নই ওঠে না,' বলেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
গতকাল নির্বাচন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, কমিশন ১১ জানুয়ারি বাহরাইনের একটি ভিডিও ক্লিপসহ বেশ কয়েকটি ভিডিও পর্যালোচনা করেছে এবং এতে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পায়নি।
তিনি বলেন, বাহরাইনের ঘটনায় প্রবাসী ভোটাররা কর্মস্থলে থাকায় তাদের একজন সহকর্মীর কাছে ব্যালট পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। সেজন্যই ডাককর্মীরা ব্যালটের খামগুলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে এসেছিলেন। ঘটনার পরপরই অধিকাংশ ব্যালট দূতাবাসে ফেরত পাঠানো হয় এবং ডাক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয় সরাসরি প্রত্যেক ভোটারকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যালট পৌঁছে দিতে।
সানাউল্লাহ বলেন, 'আমরা সবাইকে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি—কোনো অবস্থাতেই ইলেকটোরাল ইন্টেগ্রিটি নষ্ট করা যাবে না। যদি কেউ সামান্যতম অনিয়মে জড়িত থাকে, তার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল চার্জ দেওয়া হবে, এনআইডি ব্লক করা হবে এবং প্রয়োজনে তাকে ওই দেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।
'পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। কেউ যেন না ভাবে নির্বাচন কমিশন ঘুমাচ্ছে। এটা হবে না।'
সানাউল্লাহ আরও জানান, ঠিকানা ভুল লেখার কারণে কিছু ব্যালট ডেলিভার না হয়ে ফেরত আসছে। এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫২১টি ব্যালট ফেরত এসেছে। এগুলোর বেশিরভাগই এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এসেছে ইতালি থেকে।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভোটারদের অনুরোধে বিতরণের জন্য বাহরাইনে প্রাথমিকভাবে ১৬০টি ব্যালট খাম এক ব্যক্তির কাছে দেওয়া হয়েছিল। পরে এর মধ্য থেকে ১২৯টি খাম না খোলা অবস্থায় দূতাবাসে ফেরত দেওয়া হয়, যাতে ডাক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেগুলো সঠিকভাবে বিতরণ করা যায়।
নির্বাচন কমিশন বলেছে, তারা পোস্টাল ভোটিং প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোনো নিয়ম লঙ্ঘন ধরা পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
