নেপালের 'জেন জি' ভোটারদের স্বপ্ন এখন এক মিলেনিয়াল র্যাপারকে ঘিরে
নেপালের জনগণ বৃহস্পতিবার নতুন সরকার গঠনের জন্য ভোট দেবে। গত সেপ্টেম্বরে 'জেন জি বিপ্লব'-এর পর এটিই প্রথম নির্বাচন, যা হিমালয়ঘেরা দেশটিকে তরুণদের শক্তির এক অপ্রত্যাশিত প্রতীকে পরিণত করেছিল।
ভোটারদের প্রত্যাশা দেশটির আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলোর মতোই বিশাল—যদিও আগের নির্বাচনগুলো প্রায়ই জোট সরকার আর ক্ষমতার পালাবদলের চক্রই উপহার দিয়েছে। এবার একজন র্যাপার ভোটারদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছেন। আশা করা হচ্ছে, তিনি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করতে পারবেন—যাদের মধ্যে রয়েছেন সেই প্রধানমন্ত্রী, যিনি জেন জি আন্দোলনের পর ক্ষমতাচ্যুত হন।
বহু বছর ধরে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় জর্জরিত দেশটিতে প্রতিবছর লাখ লাখ নেপালি কাজের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। মানুষ এখন নিজ দেশে ন্যায্য সুযোগ এবং গত বছরের জেন জি আন্দোলনে চালানো প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের বিচার চায়। ওই দমন-পীড়নের পর দেশজুড়ে সমন্বিত অগ্নিসংযোগে হাজার হাজার ভবন ধ্বংস হয়।
আইটি কোম্পানির ফাইন্যান্স ম্যানেজার বিকি শ্রেষ্ঠা বলেন, 'এই নির্বাচন ঠিক করবে আমার চার বছরের ছেলে নেপালেই থাকবে, নাকি অন্য দেশে চলে যাবে। আমাদের পরিবর্তন দরকার।'
কে এই জেন জিদের প্রার্থী?
তরুণ নেপালিদের জিজ্ঞেস করলে, কে তাদের সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত করে—উত্তরটি সম্ভবত এক শব্দেই আসবে: 'বালেন'।
৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ, কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র, বয়সের হিসেবে পুরোপুরি জেন জি নন। তিনি র্যাপার হিসেবেও পরিচিত। যদিও তিনি ঠিক জেন জি প্রজন্মের নন, তবে শহরের বর্জ্য সংকট সমাধান করে তিনি নিজেকে পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
কালো সানগ্লাস, কালো স্যুট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একদল অনুসারী—যারা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে তার তীব্র মন্তব্যগুলো ছড়িয়ে দেন—এসব ছাড়া তাকে খুব কমই জনসমক্ষে দেখা গেছে। তিনি নিজেকে নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি পূর্ব নেপালের সেই একই আসনে নির্বাচন করছেন, যেখানে জেন জি আন্দোলনে ১৯ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি প্রার্থী হয়েছেন।
ভক্তপুরের শিক্ষক সুজন সিপাই বলেন, 'অনেক বছর ধরে আমরা একই রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখে আসছি, তারা নেপালে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। তাই এবার পুরো দেশ দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং বালেনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।'
নির্বাচনের আগে নেপালিরা হিন্দু উৎসব হোলি উদ্যাপন করেন। রাজনীতি যেন উৎসবের রঙে না মেশে—এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু কাঠমান্ডুর জনতা একে অপরকে রঙে রাঙিয়ে এক নামেরই স্লোগান দিচ্ছেন― 'বালেন'।
আর কে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন?
যদিও বালেন্দ্র শাহ মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন, এবার তিনি নিজের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে সমর্থন দিচ্ছেন। এই তরুণ রাজনৈতিক শক্তিটি নিজেদের পরিচ্ছন্ন ও প্রযুক্তি-নির্ভর দল হিসেবে প্রচার করছে। দলটি নয়জন জেন জি প্রার্থী দিয়েছে, যাদের কয়েকজন আগে শাহের সহযোগী ছিলেন।
এটি বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করেছে—দুটি কমিউনিস্ট দল এবং মধ্য-বামপন্থী নেপালি কংগ্রেস। এসব দলে জেন জি প্রার্থী খুব কম, যদিও তাদের শক্তিশালী সংগঠন ও দীর্ঘদিনের সমর্থক রয়েছে। এ পর্যন্ত দলগুলোতে সত্তরোর্ধ্ব নেতারা নেতৃত্ব দিয়েছেন যাদের মধ্যে কেউ কেউ একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সম্প্রতি ৪৯ বছর বয়সী গগন কুমার থাপা নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসায় দলটিতে কিছুটা পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। তিনি এসেই তার চেয়ে তিন দশক বড় দলীয় সভাপতিকে সরিয়ে দেন।
থাপা বলেন, 'জেন জি আন্দোলনের কারণেই আমাদের দল বুঝতে পেরেছে, সময় এসে গেছে।'
মোট ৬৫টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং প্রায় ১৬০ জন জেন জি প্রার্থী লড়ছেন, যাদের অর্ধেকই স্বতন্ত্র। গত বছরের বিক্ষোভে নারীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য হলেও, জেন জেড নারী প্রার্থী রয়েছেন মাত্র ১৫ জন।
নেপালে ভোট গ্রহণ পদ্ধতি কেমন?
প্রতিটি দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যালটে একটি প্রতীক ব্যবহার করে, যাতে সহজে চেনা যায়। রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির প্রতীক ঘণ্টা, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্টদের সূর্য। অন্য প্রতীকের মধ্যে রয়েছে ক্যাঙ্গারু (যা নেপালের প্রাণী নয়), মুরগি, স্ট্যাপলার, ব্যাডমিন্টন শাটলকক, কেবল কার এবং এক জোড়া প্লায়ার্স।
নেপাল একটি বৈচিত্র্যময় দেশ—এখানে যেমন রয়েছে উষ্ণমণ্ডলীয় জঙ্গল, তেমনি বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালাও। ভোটের দিন ভোটারদের হাঁটতেই হবে। বিশেষ অনুমতি ছাড়া কেউ গাড়ি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন না।
নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণেই এই ব্যবস্থা। দীর্ঘ মাওবাদী বিদ্রোহ, রাজপরিবার হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৮ সালে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের অবসানের পর নেপাল গণতন্ত্রকে গ্রহণ করেছে। ভোটার উপস্থিতি সাধারণত বেশি হলেও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। ভোট উপলক্ষে প্রায় তিন লাখ ৩৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার বিশেষ নির্বাচন পুলিশ।
এছাড়া চীন ও ভারতের মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় নেপাল প্রায়ই বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় থাকে।
নেপালের প্রায় তিন কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বিদেশে বসবাস করেন এবং আরও অনেকে দেশের ভেতরেই স্থানান্তরিত হয়েছেন। তবুও অনুপস্থিত ভোটের ব্যবস্থা নেই।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত অনেক নেপালি ইরান যুদ্ধের কারণে আঞ্চলিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় দেশে এসে ভোট দিতে পারছেন না।
মোট ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৬৫টি সরাসরি নির্বাচিত হবে এবং বাকি আসনগুলো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বণ্টিত হবে। পূর্ণ ফল পেতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।
বৃহস্পতিবার যে দল সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে, তাদের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি—যা দুর্নীতি দমন ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতার বদলে দরকষাকষির রাজনীতি ডেকে আনতে পারে।
জেন জি কি নেপালকে বদলাতে পারবে?
নেপালের জেন জি বিপ্লব অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটে। ৮ সেপ্টেম্বর তরুণরা কাঠমান্ডুর রাস্তায় নামে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে। নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে। এক দিনের মধ্যেই দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। সমন্বিত অগ্নিসংযোগে সংসদ ভবন ও সরকারি মন্ত্রণালয়সহ রাষ্ট্রীয় প্রতীকগুলোতে আগুন দেওয়া হয়। আরও বহু মানুষ প্রাণ হারান। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং মাত্র দুই দিনের মধ্যে সরকার কার্যত ভেঙে পড়ে।
এরপর পরিবর্তনের গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। জেন জি নেতাদের সমর্থনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলেও গত সেপ্টেম্বরের সহিংসতার ঘটনায় এখনও কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন ও পরবর্তী অস্থিরতা তদন্তে গঠিত দুটি কমিশন এখনও প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি, যদিও নির্বাচনের আগেই তা প্রকাশের প্রত্যাশা ছিল।
গত মাসে নেপালের সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ নির্বাচন স্থগিতের আহ্বান জানান। কিছু নেপালি এখনো রাজতন্ত্রের সময়কে নস্টালজিকভাবে স্মরণ করেন, যখন তাদের মতে রাজতন্ত্র একটি ঐক্যের প্রতীক ছিল।
তবে ভোটগ্রহণ নির্ধারিত সময়েই হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নির্বাচনী প্রচারণায় কিশোর ও যুবকদের উন্মাদনা কোনো পপ কনসার্টের চেয়ে কম নয়। কিশোর থেকে দাড়িওয়ালা পুরুষ পর্যন্ত সবাই বালেনের নাম ধরে চিৎকার করছেন। নীল ঘণ্টা চিহ্নের পতাকা উড়িয়ে মোটরসাইকেলের বহর শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে।
