বিমান-বোয়িং চুক্তি এ মাসেই, প্রথম উড়োজাহাজ আসবে ২০৩১ সালের অক্টোবরে
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের মধ্যে চলতি মাসেই চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির সূত্রমতে, বোয়িংয়ের প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশকে ডেলিভারি দেওয়ার কথা রয়েছে।
বাকি উড়োজাহাজগুলো ২০৩৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি বিমানের পরিচালনা পর্ষদ বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে এয়ারবাসের পক্ষ থেকে আসা প্রস্তাবটিকে আপাতত কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম টিবিএসকে উড়োজাহাজ সরবরাহের সময়সূচির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি ও প্রক্রিয়াগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, 'পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর এখন চুক্তি সই ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে আলোচনা চলছে।' এখন উড়োজাহাজের দাম নির্ধারণের বিষয়টিই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বলে জানান তিনি।
অর্থায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বোশরা ইসলাম বলেন, 'ব্যাংকঋণের জন্য আমরা রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল ইস্যু করব। এরপর যে ব্যাংক সবচেয়ে কম সুদে ঋণ দেবে, আমরা তাদের সাথেই চুক্তিবদ্ধ হব।'
বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টিই বোয়িংয়ের তৈরি। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, বোয়িং বিমানকে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ও চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ সরবরাহ করবে।
গত ৩০ ডিসেম্বর নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার আগে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ বোয়িংয়ের ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বরের প্রস্তাব ও ২০ ডিসেম্বরের সংশোধিত খসড়া চুক্তিটি পর্যালোচনা করে।
লিজ বা ইজারার মাধ্যমে উড়োজাহাজ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থা। এর ফলে বিদ্যমান রুটগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নতুন রুট চালু করাও বিলম্বিত হচ্ছে।
পর্ষদের অনুমোদনই শেষ ধাপ নয়
তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমানের সাবেক কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, কেবল পর্ষদ অনুমোদনই উড়োজাহাজ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না। এর পরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি থাকে।
বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এই অনুমোদন একটি জটিল চুক্তি ও আর্থিক প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র। তিনি বলেন, 'পর্ষদের অনুমোদনই চূড়ান্ত ধাপ নয়। এই পর্যায়ের আগে-পরে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া রয়েছে।'
তিনি বলেন, উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে সাধারণত মোট দামের প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে পরিশোধ করতে হয়, যার সংস্থান সাধারণত ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, 'ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ ও উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই হওয়ার পরই কেবল কোনো অর্ডার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত বলে গণ্য হয়।'
বোয়িংয়ের সঙ্গে ২০০৭ সালের উড়োজাহাজ চুক্তির অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে ওয়াহিদুল আলম বলেন, সে সময় চুক্তি সই করার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ছিল। তিনি বলেন, 'শুরুতে ঢাকাতেই চুক্তি সই করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরে এটি চূড়ান্ত করতে আমাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগে যেতে হয়েছিল।'
তিনি ইঙ্গিত দেন, সরকার পরিবর্তনের বিষয়টিও এ ধরনের চুক্তির ওপর প্রভাব ফেলে। উদাহরণ হিসেবে ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার সময় তারা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন, তিনি সেগুলোর কথা উল্লেখ করেন।
বিমানের কর্মকর্তারাও জোর দিয়ে বলেন, পর্ষদের অনুমোদন কেবল আলোচনার পথ খুলে দেয়। আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত এর কোনো আর্থিক বা আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
এয়ারবাসের প্রস্তাব নিয়ে অনিশ্চয়তা
জানা গেছে, বিমানকে ১০টি এ৩৫০ ওয়াইড-বডি ও ৪টি এ৩২০ নিও ন্যারো-বডি জেট উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে এয়ারবাস। এই প্রস্তাবের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম ইঙ্গিত দেন, আপাতত এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই।
তিনি বলেন, 'দুটির মধ্যে যেহেতু বোয়িংয়ের প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়েছে, তাই ধরে নেওয়া যায় যে এই মুহূর্তে অন্য প্রস্তাবগুলো নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হবে না।'
বোয়িংয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্তের পর এয়ারবাসের প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এয়ারবাসের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, 'পর্ষদের সিদ্ধান্তের কথা আমাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। এটুকুই। প্রস্তাব বাতিল বা অন্য কোনো বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।'
বোয়িং কেনার ফলে বিমানের দূরপাল্লার বহর আধুনিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বড় উড়োজাহাজের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সংস্থাটির বাণিজ্যিক সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক এয়ারলাইন নির্বাহী উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, ওয়াইড-বডি বোয়িং ৭৮৭ ও ৭৭৭ উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার ফলে জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে ঠিকই, তবে বহরের কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, 'সব রুটে সারা বছর ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ চালানো লাভজনক নয়। কম যাত্রীর রুটে বড় প্লেন চালালে অনেক আসন খালি থাকে, এতে রাজস্ব ক্ষতি হয়।'
তার মতে, অনেক আঞ্চলিক ও মাঝারি যাত্রীর রুটের জন্য এয়ারবাস এ৩২১ নিও বা বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সের মতো ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ বেশি উপযুক্ত। তিনি আরও বলেন, 'বিশ্বের বড় বড় এয়ারলাইনগুলো মিশ্র বহর পরিচালনা করে। টিকে থাকতে এবং প্রবৃদ্ধির জন্য বিমানকেও একই কৌশল অবলম্বন করতে হবে।'
বহরের আকারই যে একটি বড় এয়ারলাইনের পরিচয় বহন করে, সেই ধারণাও নাকচ করে দেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'কেবল বড় উড়োজাহাজ ওড়ালেই বড় এয়ারলাইন হওয়া যায় না। ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো এবং বাজারে উপস্থিতি বজায় রাখাই হলো আসল কৌশল।'
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল আলমও একই সুরে বলেন, 'শুধু বোয়িংয়ের ওপর নির্ভর না করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহর বজায় রাখা জরুরি।'
তিনি আরও বলেন, সব রুটে বড় উড়োজাহাজ চালানো বাস্তবসম্মত নয়। স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার রুটে এয়ারবাস এ৩২০ বা এ৩২১-এর মতো উড়োজাহাজ বেশি কার্যকর হতে পারে।
ভূরাজনৈতিক ও বাজার চাপের মুখে বোয়িং চুক্তি
বোয়িং কেনার এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূরাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের তথ্যমতে, এর আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক নিয়ে আলোচনার সময় সরকার একটি বৃহত্তর বাণিজ্য সমঝোতার অংশ হিসেবে ২৫টি পর্যন্ত বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
বাণিজ্য সচিবের ওই মন্তব্যের পর ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বাংলাদেশে এয়ারবাসের বাজার প্রসারে তৎপরতা বাড়িয়ে দেন।
এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা শুরু হয়েছিল বিগত সরকারের আমলে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরকালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ প্রকাশ্যে এয়ারবাসের বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের এভিয়েশন বাজার বড় হচ্ছে, কিন্তু স্থানীয় এয়ারলাইনগুলোর দখলে রয়েছে বাজারের মাত্র ৩৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে বহর সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠনের জন্য বিমানের ওপর দিন দিন চাপ বাড়ছে।
তবে আপাতত মনে হচ্ছে, চালকের আসনে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বোয়িং; খানিকটা পিছিয়ে পড়েছে এয়ারবাস।
