দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলেও ছড়াচ্ছে হাম
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর এবার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বান্দরবানের আলীকদমের কুরুকপাতা গ্রামেও হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। রোববার পর্যন্ত সেখানে অন্তত তিন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে এবং ৭৩ শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
দুর্গম ওই এলাকার শিশুরা হামের টিকার আওতায় আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুরু থেকে হামে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করছেন সীমান্তবর্তী পাড়ার বাসিন্দা সাকনাও ম্রো। তিনি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "দুর্গম সব পাড়ায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। হামের লক্ষণ দেখা দিয়েছে, কিন্তু হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়নি—এমন অনেকেই আছে। আগেও প্রতি বছর এই সময়ে এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, মাঝেমধ্যে মৃত্যুও হয়। তবে এ বছর তা ব্যাপক আকার নিয়েছে।"
তিনি আরও জানান, হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়েছে, তাদের অধিকাংশ রোগীই পোয়ামুহুরীর সীমান্তঘেঁষা দুর্গম এলাকার বাসিন্দা। সেখানে বসবাসকারীদের বেশিরভাগই জুম চাষি এবং দরিদ্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ওই এলাকার শিশুদের টিকার আওতায় আনা এবং আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এম মুশতুক হুসাইন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "যেসব শিশু এখনো সুস্থ আছে, তাদের দ্রুত হামের টিকা দিতে হবে। আর যারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এতে তারা চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকবে এবং জটিলতায় যাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।"
"বিভিন্ন কারণে পাড়ার অধিবাসীরা ভ্যাকসিন নিতে চায় না, তাদের কাউন্সেলিং করে টিকার আওতায় আনতে হবে," বলেন তিনি।
এক হোস্টেলে ৩০ শিশু আক্রান্ত, একজনের মৃত্যু
আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নের ইয়াংরিং পাড়ায় 'প্রেন্নই শিক্ষালয়' নামের একটি হোস্টেলে ১৪০ ম্রো শিশু প্রাথমিক শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে।
এ মাসের শুরুতে ওই হোস্টেলের শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ দেখা দেয়। এর মধ্যে হোস্টেল থেকে আলীকদম সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে ৯ বছর বয়সী এক শিশু মারা গেছে।
প্রেন্নই শিক্ষালয় আবাসিক হোস্টেলের পরিচালক উথোয়াইংগ্য মারমা বলেন, "সম্প্রতি আমাদের হোস্টেলের ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দেয়। তাদের সবারই পেটব্যথা, ডায়রিয়া, হালকা জ্বর এবং শরীরে লালচে দাগ ছিল। উপজেলা সদর থেকে স্বাস্থ্যকর্মী এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়।"
তিনি আরও বলেন, "পরে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে ৯ বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী মারা যায়। বর্তমানে আমাদের হোস্টেলের সাতজন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন, লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুইজন এবং কক্সবাজার সদর হাসপাতালে একজন রয়েছে।"
হোস্টেল পরিচালনা কমিটির সদস্য লাউলি ম্রো মেশা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বর্তমানে হোস্টেলটি বন্ধ রাখা হয়েছে। আলীকদম উপজেলা সদর থেকে এই এলাকার দূরত্ব প্রায় ৩৭ কিলোমিটার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্গম।
তিনি আরও বলেন, "এই এলাকায় কখনো টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। এর আগেও এখানে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতির কারণেই এমন পরিস্থিতি বারবার তৈরি হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "আমরা চাই কুরুকপাতা ইউনিয়নে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হোক এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা যায়।"
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন দরিদ্র রোগীদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি, ওষুধ কেনা এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরসহ বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে।
হামে আক্রান্ত রোগীদের খোঁজ নিতে শনিবার আলীকদম এলাকা পরিদর্শন করেছেন ম্রো সোশ্যাল কাউন্সিলের সাবেক নেতা ও জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো।
প্রতি বছর আলীকদমের কুরুকপাতা এলাকার দুর্গম অঞ্চলে কেন হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে খামলাই ম্রো বলেন, তার জানা মতে কুরুকপাতার ওপরের এলাকাগুলোতে শিশুদের টিকা দেওয়া হয় না। ফলে তারা দীর্ঘদিন ধরেই টিকার আওতার বাইরে রয়েছে। এর পেছনে যেমন স্থানীয় ম্রো জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা নিয়ে নানা কুসংস্কার রয়েছে, তেমনি স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতিও আছে। দুর্গমতাও একটি বড় কারণ।
তিনি আরও বলেন, "টিকাদানের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কারবারি (গ্রামপ্রধান) ও হেডম্যানদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে। এ এলাকাকে বিশেষ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে আলাদা কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। অধিকাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকায় এ বছর বেশি করে হামে আক্রান্ত হচ্ছে।"
অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন
বান্দরবান সিভিল সার্জন ড. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে যাদের অবস্থা তুলনামূলক গুরুতর, তাদের হাসপাতালে রেখে আইসোলেশনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ কুরুকপাতা ইউনিয়নের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করেছে। সেখানে দুইজন মেডিকেল অফিসার, তিনজন সিনিয়র স্টাফ নার্স, একজন চিকিৎসা সহকারী এবং একজন সহায়ক কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। ক্যাম্পটিতে একসঙ্গে প্রায় ৩০ জন রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সিভিল সার্জন জানান, স্বাস্থ্যকর্মীরা ওয়ার্ডভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে নতুন আক্রান্তদের শনাক্ত করছেন এবং একই সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। উপসর্গযুক্ত রোগীদের ক্যাম্পে এনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং গুরুতর হলে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম টিবিএসকে বলেন, "দুর্গম এলাকাগুলো এখনো টিকাদানের আওতায় আসেনি। পাড়াগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দুই-আড়াই ঘণ্টা হেঁটে ছোট শিশুদের টিকা দিতে নিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। তাই পাড়া ভিত্তিক টার্গেট করে সেখানে গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। প্রয়োজনে টিকাকর্মীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে পাড়াগুলোতে পাঠাতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "বর্তমানে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি—কোন পাড়ায় কতজন টিকা নেওয়ার উপযুক্ত শিশু আছে। আগে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কুরুকপাতা স্কুলে এখন নয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।"
