বান্দরবানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত বাড়ছে দুর্গম এলাকায়
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নের দুর্গম এলাকায় বাড়ছে 'হামের উপসর্গ' নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা। ইতোমধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে সীমান্তবর্তী দুর্গম পোয়ামুহুরী এলাকায় তিন ম্রো শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, মৃতদের মধ্যে দুজন শিশু হামে নয়, অন্য কোনো জটিলতায় মারা গেছে। বাকি আরেকজন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসার পথেই মারা গেছে।
রোববার (২৬ এপ্রিল) স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় এখন পর্যন্ত ৭৩ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। বাকিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
কুরুকপাতা ইউনিয়নে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রিংলত ম্রো পাড়ায় গত ১২ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায় দুই শিশু হলো- রিংলত পাড়ার বাসিন্দা লেংক্লাং ম্রোর তিন মাস বয়সী মেয়ে জংরুং ম্রো এবং লুকুন ম্রোর সাত বয়সী সন্তান খতং ম্রো।
এরপর ২২ এপ্রিল ভোরে উপজেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে মারা যায় ইয়াংরিং পাড়ার 'প্রেন্নই শিক্ষালয়' নামের আবাসিক শিক্ষার্থী হোস্টেলের শিক্ষার্থী তুমমুম ম্রো। সে ইয়াংরিং মাংক্রান্ত পাড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি শিক্ষার্থী ছিল।
শুরু থেকে হামে আক্রান্ত রোগী নিয়ে কাজ করে আসছেন সীমান্তবর্তী পাড়ার বাসিন্দা সাকনাও ম্রো। এখনও পর্যন্ত বিভিন্নভাবে সেবাযত্ন দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এই এলাকায় হাম কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তার ব্যাখা দিয়ে সাকনাও ম্রো বলেন, 'এ মাসের শুরুর দিকে প্রথমে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইন্দুমুখ এলাকায় একটি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায় বলে এলাকাবাসীর কাছে জানতে পারি। তবে আমি এটা নিজের চোখে দেখিনি।'
তিনি বলেন, 'এরপর আমার পাড়ার পাশে রিংলত ম্রো পাড়ায় মারা যায় দুজন শিশু। তাদের স্পষ্ট হামের উপসর্গ ছিল। এর কিছুদিন পর হোস্টেলে একটি মেয়ে মারা যায়। তারপর থেকে দুর্গম সব পাড়ায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এখন পর্যন্ত কয়েকজন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।এদের মধ্যে কয়েকজন সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে। তবে হামের লক্ষণ বা উপসর্গ আছে, কিন্তু হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়নি এরকমই অনেকেই আছে।'
সাকনাও ম্রো বলেন, 'আগেও প্রত্যেক বছর এই সময় এই এলাকায় অনেকে হামে আক্রান্ত হতো। কেউ কেউ মারাও যেত। কিন্তু এ বছর ব্যাপক আকারে এটা হচ্ছে।'
'প্রেন্নই শিক্ষালয়' আবাসিক ছাত্র হোস্টেলের পরিচালক উথোয়াইংগ্য মারমা বলেন, 'ইন্দুমুখ পাড়ায় এবং রিংলত ম্রো পাড়ায় তিন শিশু মারা যাওয়ার পর আমাদের হোস্টেলের কিছু শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ত্রিশ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দেয়।'
তিনি আরও বলেন, 'সবারই পেট ব্যাথা, ডায়রিয়া, হালকা জ্বর এবং শরীরে লালচে দাগ দেখা দেয়। কেউ কেউ হালকা বমিও করে। এরপর উপজেলা সদর থেকে স্বাস্থ্যকর্মী এনে তাদের চিকিৎসা করানো হয়।'
উথোয়াইংগ্য মারমা বলেন, 'পরে অসুস্থ অবস্থায় হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে ৯ বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী মারা যায়। এখনও আমাদের হোস্টেলের সাতজন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এদের মধ্যে আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জন, লামায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন এবং কক্সবাজার সদর হাসপাতালে একজন চিকিৎসাধীন।'
জানা যায়, হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসাদের বেশিরভাগই পোয়ামুহুরী সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকার বাসিন্দা। তারা সবাই জুমচাষী এবং অর্থনৈতিকভাবেও অস্বচ্ছল।
রোগীদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা, ঔষধপত্র কিনে দেওয়া এবং মূমুর্ষ রোগীদের অন্য জায়গায় পাঠানো থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছে ম্রোদের স্বেচ্ছাসেবক যুব সংগঠন 'ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন'।
এই সংগঠনের কর্মী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মেনতাব ম্রো দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'রোগীর অভিভাবক হিসেবে এখানে যারা আসেন, তাদের বেশিরভাগই জুমচাষী ও গরীব। এমনও কেউ কেউ আছেন, যারা কোনোদিনই উপজেলা সদরে আসেননি।'
তিনি বলেন, 'তাদের হাতেও টাকা-পয়সা নেই। আমরা অর্থ সংগ্রহ করে ঔষধপত্র কেনা, হাসপাতালে ভর্তি করা, ডায়রিয়া হলে বার বার কাপড় চেঞ্জ করে নতুন কাপড় কেনা, নাস্তা অথবা ভাতের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি করে তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছি।'
তিনি আরও বলেন, 'মূমুর্ষ রোগী হলে গাড়ি অথবা অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে অন্য জায়গা পাঠানো এসব কিছুও আমাদের করতে হচ্ছে। আমরা বিশ জনের মতো স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আছি। এসব করতে গিয়ে আমাদের কেউ কেউও অসুস্থ হয়েও পড়েছে।'
হামে আক্রান্ত রোগীদের খবর নিতে শনিবার আলীকদম এলাকা পরিদর্শন করেন ম্রো সোশ্যাল কাউন্সিলের সাবেক নেতা ও জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো।
প্রতিবছর শুধু আলীকদমের কুরুকপাতার দুর্গম এলাকায় কেন হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে- জানতে চাইলে খামলাই ম্রো বলেন, 'আমার জানা মতে কুরুকপাতা উপরে কোনো এলাকায় শিশুদের টিকা দেওয়া হয় না। তারা বরাবরই টিকার আওতার বাইরে থাকছে। তার কারণ টিকা নিয়ে সেখানকার ম্রোদের যেমন নানারকম সংস্কার রয়েছে, ঠিক তেমনি স্বাস্থ্য বিভাগেরও গাফিলতি রয়েছে '
তিনি বলেন, 'এছাড়া দুর্গমতাও একটা ব্যাপার। সেখানে প্রত্যেক বছর এই সময় হাম ও ডায়রিয়া রোগের প্রার্দুভাব ঘটে। অনেকে টিকা নেয় না। কিন্তু টিকা নেয়নি বলে স্বাস্থ্য বিভাগও আর কিছু করে না।'
তিনি আরও বলেন, 'টিকা দেওয়ার আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কারবারি (গ্রামপ্রধান) ও হেডম্যানদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া দরকার। এটা একটা বিশেষ এলাকা হিসেবে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। অধিকাংশ শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকায় এ বছর বেশি করে হামে আক্রান্ত হচ্ছে বলে মনে করি।'
কুরুকপাতা এলাকায় মারা যাওয়া শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়নি দাবি করে রোববার দুপুরে জেলা সিভিল সার্জন শাহীন হোসাইন চৌধুরী টিবিএস বলেন, 'প্রথমে যে দুজন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলা হচ্ছে, তাদের একজনের বয়স দুই মাস, আরেকজনরে বয়স তিন মাস। এই বয়সে আসলে হাম হয় না। তারা নিউমোনিয়াতে বা অন্য জটিলতায় মারা গেছে।'
তিনি বলেন, 'আরেকজন যে মারা গেছে, সে চার-পাঁচ দিন জ্বর নিয়ে ঘরে ছিল। জ্বর যখন কমছিল না তখন আমাদের মেডিকেল টিম তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার চেষ্টা করে। তবে হাসপাতালে আনার পথেই শিশুটি মারা যায়।'
তিনি আরও বলেন, 'হাসপাতালে আনা গেলে বোঝা যেত যে বাচ্চাটি হামে মারা গেছে, নাকি অন্য রোগে মারা গেছে। সে হামে মারা গেছে কি না তা এখনও নিশ্চিত না।'
সিভিল সার্জন শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, 'গতকাল শনিবার কুরুকপাতার বাজার এলাকায় প্রাইমারি স্কুলে একটা অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করেছি। সেখানে দুজন মেডিকেল অফিসার, তিনজন সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং একজন চিকিৎসা সহকারী রয়েছেন।'
তিনি বলেন, 'গতকাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকও পরিদর্শন করে এসেছে। ওখানে ৩০ জনের মতো রোগী থাকতে পারবে। তাদের থাকা-খাওয়া সব কিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম চলবে। ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। হামের উপসর্গ পেলে মেডিকেল ক্যাম্পে এনে ভর্তি করা হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'যাদের অবস্থা একটু খারাপ হবে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হবে। এখন ওই এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ পর্যন্ত ৭৩ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। তার মধ্যে ২৮ শিশু আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছে। বাকীরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।'
প্রতিবছর আলীকদমের একটা নির্দিষ্ট এলাকায় এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বার বার কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে- জানতে চাইলে সিভিল সার্জন শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, 'এ বছর ম্যাসিভ আকারে ছড়িয়ে পড়ার কারণ হলো দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা স্বাস্থ্য সচেতন না। আমাদের টিকাদান কর্মীরা গেলেও তারা ঠিকমতো সাড়া দেয় না।'
তিনি বলেন, 'তাছাড়া স্বাভাবিকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব হওয়ার সময় এখন। তবে এখন একটু ব্যাপক আকারে দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরাও এর কারণ খুঁজে দেখছে। পরে হয়তা জানা যাবে।'
তিনি আরও বলেন, 'দুর্গম এলাকার মানুষদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার ঘাটতি এবং টিকাদান কর্মসূচিতে সাড়া না দেওয়া সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত টিকা সরবারহ নিশ্চিত করেছে এবং কোনো ঘাটতি ছিল না।'
সিভিল সার্জন শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, 'স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চিকিৎিসা ও লজিস্টিক সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।'
পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে চেয়ারম্যান, হেডম্যান ও কারবারিদের সম্পৃক্ত করে প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর আলম আলম টিবিএসকে বলেন, 'অধিকাংশের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। এখন অন্য কোনো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকেও যুক্ত করা যায় কিনা ভাবা হচ্ছে। আমার মনে হয়, এসব দুর্গম এলাকা ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আসেনি, ওখানে পাড়াগুলোও যেহেতু বিচ্ছিন্ন।'
তিনি বলেন, 'টিকা দেওয়ার হারও কম মনে হয়। এবার আমার অভিজ্ঞতায় যেটা মনে হয়, পাড়াগুলো টার্গেট করে টিকা দিয়ে আসতে হবে। এছাড়া অন্য কোনো সমাধান দেখছি না।'
তিনি আরও বলেন, 'দুই আড়াই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে ছোট বাচ্চাদের এভাবে নিয়ে আসা অসম্ভব। প্রয়োজনে টিকা কর্মীদের বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে পাড়াগুলোতে পাঠাতে হবে। এখন আমরা তথ্য নিচ্ছি, কোন পাড়ায় কতজন টিকা নেওয়ার উপযুক্ত আছে। আগে ওটা নিশ্চিত করতে হবে। কুরুকপাতা স্কুলে এখন নয় মাস থেকে পাঁচ বছর না। পনের বছর পর্যন্ত টিকা দেওয়া হচ্ছে।'
