হামে শিশুমৃত্যু: জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা ও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের
দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে 'জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা' ঘোষণা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)।
শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে 'হামে শিশুমৃত্যু: জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়' শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কোনো রোগের বিস্তার সময়, স্থান ও আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে অস্বাভাবিক হলে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা তা সামাল দিতে ব্যর্থ হলে সেটি জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে হামের সংক্রমণ সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছে ডিপিপিএইচ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, "মহামারি মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল, নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা হয়নি।"
ডিপিপিএইচ নেতারা বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, টিকা সংগ্রহে গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এমনকি আগে টিকা নেওয়া শিশু ও নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও সংক্রমিত হচ্ছে।
তারা জানান, একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। লক্ষণ দেখা দেওয়ার চার দিন আগেই ভাইরাস ছড়াতে শুরু করে, যা নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুধু টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতিই ছিল না, হাম-পরবর্তী জটিলতা—যেমন রাতকানা—প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবিলম্বে দেশব্যাপী গণটিকাদান কর্মসূচি চালুর দাবি জানায় সংগঠনটি। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, দুর্গম অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়।
তারা বলেন, উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে সংক্রামক রোগের জন্য বিশেষ কর্নার চালু, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভিটামিন 'এ' সরবরাহ নিশ্চিত এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের চিকিৎসায় সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
টিকা নিয়ে বিদ্যমান গুজব ও ভুল ধারণা দূর করতে গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে এত শিশুমৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
এদিকে দেশে নিশ্চিত হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
এই সময়ে হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে ৯৪২ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৩৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ১৭৮ শিশু।
