সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও ডিজিটাল দক্ষতা কী, কীভাবে শেখাতে হয়—জানেন না প্রাথমিকের বেশিরভাগ শিক্ষক
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতায় গড়ে তোলার উদ্যোগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি। অনেক শিক্ষকেরই এসব দক্ষতা নেই, পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের তা শেখানোর প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক জ্ঞানেরও ঘাটতি রয়েছে বলে উঠে এসেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) এক গবেষণায়।
ওই গবেষণায় একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা বলতে এমন জ্ঞান ও সক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে, যা পরিবর্তনশীল বিশ্বে কার্যকরভাবে চিন্তা করা, শেখা, কাজ করা ও জীবনযাপনে সহায়তা করে।
এর মধ্যে রয়েছে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দলগত কাজ, তথ্য ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, স্থানীয় ও বৈশ্বিক নাগরিকত্ব, জীবন ও কর্মজীবনের দক্ষতা এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্ববোধ।
নিজেদের মূল্যায়নে ৪১.২ শতাংশ শিক্ষক তাদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার দক্ষতাকে 'ভালো' বলেছেন। তবে বাস্তবে মাত্র ২৭.১ শতাংশ শিক্ষকের মধ্যে এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত দক্ষতা পাওয়া গেছে।
একইভাবে, ৪৪ শতাংশ শিক্ষক নিজেদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে ভালো বলে মনে করলেও মাত্র ২২.৩ শতাংশের মধ্যে পর্যাপ্ত দক্ষতা পাওয়া গেছে।
প্রায় অর্ধেক (৪৮.৩ শতাংশ) শিক্ষক 'বৈশ্বিক নাগরিকত্ব' কী, তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি। আর ৭৪.১ শতাংশ এ দক্ষতার কোনো সূচকই চিহ্নিত করতে পারেননি। শ্রেণিকক্ষে বৈশ্বিক নাগরিকত্ব কীভাবে শেখানো যায়—এ প্রশ্নে ৭১.৬ শতাংশ শিক্ষক কোনো ধারণা দিতে পারেননি বা উত্তর দেননি।
প্রায় ৪১.৪ শতাংশ শিক্ষকের ন্যূনতম ডিজিটাল দক্ষতাও ছিল না। আর শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল দক্ষতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি বা উত্তর দেননি ৩০.৪ শতাংশ শিক্ষক।
২০২৫ সালের জুনে ১৬ উপজেলার ৬৯১ জন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ওপর এ গবেষণা চালানো হয়। এতে শিক্ষকদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও ডিজিটাল দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি পাওয়া গেছে।
একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা শেখানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধার কথাও জানিয়েছেন শিক্ষকরা। ৪৭.৫ শতাংশ শিক্ষক অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবকে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া শিক্ষা উপকরণের ঘাটতির কথা বলেছেন ৪৫.২ শতাংশ, অবকাঠামোগত সমস্যার কথা ৪৪.১ শতাংশ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা ৪২.৩ শতাংশ এবং শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কথা বলেছেন ৪১.৫ শতাংশ শিক্ষক।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা শেখানো ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
এমন এক সময়ে গবেষণার ফলাফলটি সামনে এলো, যখন সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনায় মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ বাড়ানো, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, শিক্ষক প্রশিক্ষণের জট কমানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নীতি ও পরিচালনা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় শিক্ষকদের মধ্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পুরোপুরি গ্রহণ না করার প্রবণতা দেখা যায়। এটি তাদের দক্ষতা উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, আগের সরকারগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে কতটা উপযোগী, তা যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই অন্যান্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মডেল চালুর চেষ্টা করেছে। এসব ঘাটতি দূর করতে এখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে জানান তিনি।
প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন
একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা সম্পর্কে পাঠ্যবই ও শিক্ষক নির্দেশিকায় সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা যুক্ত করার সুপারিশ করেছে নেপ। একই সঙ্গে মূলত তত্ত্বনির্ভর প্রশিক্ষণের বদলে ব্যবহারিক প্রয়োগভিত্তিক ধারাবাহিক পেশাগত প্রশিক্ষণ চালুর পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
শিক্ষকদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ বাড়াতে সাব-ক্লাস্টার নেটওয়ার্ক গঠন এবং পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন তদারকির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও পরিদর্শকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষা কর্মসূচি তৈরির সময় শিক্ষকদের দক্ষতা ও সচেতনতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, "ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এমনভাবে করতে হবে, যাতে শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি কার্যকরভাবে দূর করা যায়।" পাশাপাশি এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়নও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে বলে জানান তিনি।
ব্যবহারিক নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন শিক্ষকরা
পটুয়াখালীর আমখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আবু জাফর বলেন, সেখানে শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতার কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না।
তিনি বলেন, "আমরা ডিজিটালভাবে দক্ষ নই। এখানে এ ধরনের কোনো প্রশিক্ষণও পাই না। এসব দক্ষতার সঙ্গে আমরা খুব বেশি পরিচিত নই।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার সূত্রাপুরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, প্রশিক্ষণে শেখানো বিষয়গুলো অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে কাজে লাগানো যায় না।
তিনি বলেন, "সব বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষকও নেই। কখনো গণিতের শিক্ষককে ইংরেজি পড়াতে হয়, আবার বাংলার শিক্ষককে গণিত পড়াতে হয়।"
শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমেদ বলেন, শিক্ষকদের অনেক প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে।
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে নতুন পদ্ধতি ও নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। চিকিৎসা ও প্রকৌশলের মতো পেশায় যেভাবে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, শিক্ষকদের জন্যও তেমন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি।
ড. মনজুর বলেন, এ জন্য 'দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণব্যবস্থা' প্রয়োজন। শুধু প্রশিক্ষণ আয়োজন করলেই হবে না, প্রশিক্ষণে শেখানো বিষয়গুলো শ্রেণিকক্ষে বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
