সর্বনিম্ন পাসের হার: শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ‘সতর্ক সংকেত’
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল খুবই উদ্বেগজনক। গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সবচেয়ে কম। তবে দুশ্চিন্তার জায়গা শুধু পাসের হার কমে যাওয়া নয়। আবার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে না, তাই ফলাফল খারাপ–সমস্যাটির এত সরল উপসংহারও টানা যাবে না।
এই ফলাফল অভিভাবকসহ, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের রীতিমতো থমকে দিয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ফল বিপর্যয়ের কারণ খোঁজা হচ্ছে। বিপর্যয়ের কারণ বর্তমানের মধ্যে নিহিত নেই, চোখ ফেরাতে হবে অতীতের দিকে।
অন্যদিকে, শুধু শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রী এই মন্দ রেজাল্টের জন্য দায়ী নয় এটা পুরো ব্যবস্থার সমস্যা। ব্যর্থতার দায় পরীক্ষার্থীর উপর না চাপিয়ে, দৃষ্টি দিতে হবে এই বদলে যাওয়া প্রজন্ম, সামাজিক অস্থিরতা এবং এই অনাধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। ২০২৪ এর রাজনৈতিক ডামাডোল সম্ভবত একটি ধাক্কা হিসেবে কাজ করেছে, কিন্তু এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থায় যার ভিত আগেই দুর্বল ছিল।
দুর্বল ভিত্তির ওপর যে শিক্ষা, সেই শিক্ষা কখনোই শক্ত হতে পারে না। বহু শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে মৌলিক দক্ষতা অর্জন না করে পরের শ্রেণিতে উঠে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে প্রাথমিকে অধিকাংশ শিশু তেমন কিছুই শিখছে না। অংক, ইংরেজি ছাড়াও বাংলাতেও দুর্বল তারা। অনেকেই রিডিং পর্যন্ত পড়তে পারে না।
জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার তথ্য-ভিত্তিক নিরীক্ষা, যা প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সবকিছু অন্তর্ভুক্ত করে, সেই শিক্ষা খাত বিশ্লেষণ (ইএসএ) ২০২৬ সালের খসড়া বিশ্লেষণেও এই সমস্যাকে একটি 'চলমান শিখন সংকট' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দেশে এখনও প্রায় অর্ধেক শিশু 'মৌলিক সাক্ষরতা বা ভাষা পঠন-লিখন দক্ষতা' এবং প্রতি তিনজনের একজন 'মৌলিক গাণিতিক দক্ষতা' অর্জন করতে পারেনি। প্রাথমিক শিক্ষায় এগুলি একত্রে 'মৌলিক দক্ষতা' হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৬ সালে করা ইউনিসেফের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণির ৯১% শিক্ষার্থী গণিতে, এবং ৬৫% শিক্ষার্থী বাংলায় অনভিজ্ঞ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে একজন শিক্ষার্থী যখন ক্লাস এইট/নাইনে উঠছে, তখন আরো নতুন নতুন বিষয় যোগ হচ্ছে, কিন্তু তার পুরোনো ভিত্তিটাই দুর্বল থেকে গেছে। গৃহের ভীত শক্ত না হলে, যেমন বাড়ি মজবুত হয় না, পড়াশোনাও ঠিক তেমনি।
অধিকাংশ শিশুই মুখস্থ নির্ভর হয়ে উঁচু ক্লাসে ওঠে। যতো বড় হয়, ততোই পড়ার চাপে তাদের বোঝার ক্ষমতা কমতে থাকে। এসএসসিতে গিয়ে সমস্যা প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে এই প্রাথমিক স্তরেই। এসএসসি'র ফল বোঝার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এই প্রাথমিক।
তাই শিক্ষার্থীরা কেন ফেল করল? এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেন একজন শিশু পঞ্চম শ্রেণিতে পৌঁছেও পঞ্চম শ্রেণির মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না? দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, এই প্রশ্নটা নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষা বিভাগ, পাঠ্যক্রম প্রণেতারা কিছু ভাবছেন না।
এবছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শতকরা ৩৭.৭৫ জন ফেল করেছে। ২০২৫ সালেই পাসের হার ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছিল। অবশ্য তখন আমরা মাথা ঘামাইনি। পাশাপাশি বেড়েছে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, অর্থাৎ প্রায় প্রতি ১০ জনে ৪ জন এবার পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি।
কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর ও ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। পুরো চিত্রটাই বেশ নেতিবাচক। ফলাফলের এই সংখ্যাগুলো আলাদা আলাদা সংকটের কথা বলছে না; বরং একই সঙ্গে বোঝা যাচ্ছে, আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার ভীতটা আসলে কতটা দুর্বল।
শুরু থেকেই শেখার ঘাটতি, শিক্ষক সংকট, বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং তুলনামূলক মূল্যায়ন–সবগুলো কারণ একসঙ্গে দেখতে হবে। এই সর্বনিম্ন পাসের হারটি দেখাচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার জমে থাকা দুর্বলতাগুলো কতটা গভীর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরেকটি সমস্যা হলো স্কুলের বাইরে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন ও গাইডবই। শিক্ষার্থীদের অনেকেই মনে করে–স্কুলে আসল পড়া হয় না, পরীক্ষার পড়া কোচিংয়ে হয়। এই ধারণা শিক্ষণকে দুর্বল করে তোলে।
শিক্ষাথীরা নিজেরা নিজের এডুকেশনাল ম্যাটেরিয়ালগুলো তৈরি করার ক্ষমতা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে। যেমন ১৫/২০ বছর আগেও ছাত্রছাত্রীরা পাঠ্যবই ও রেফারেন্স বই ঘেঁটে একটা নোট তৈরি করতো। কিছু সাবজেক্ট নিজেরা পড়তো বা পড়ার চেষ্টা করতো, এখন আর সেটা করে না। কোচিং এ যা পড়ানো হয়, বা গাইড বইতে যেভাবে দেখানো থাকে, সেটাই মুখস্থ করে।
তাছাড়া রিভিশন দেওয়া, অর্থাৎ ঠিকমতো পড়াটা শেখা হচ্ছে কিনা, বা পরীক্ষার খাতায় কোনো ভুল থেকে গেল কিনা, এটাও সময়মতো শনাক্ত করে না। শেষ পর্যন্ত এসএসসিতে এসে সেই দীর্ঘদিনের ঘাটতিটা ধরা পড়ে।
আরেকটা বিষয় ভাবাচ্ছে, সেটা হলো শিশু-কিশোররা কি কাগজে-কলমে লেখার ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে? তাদের ভাবনা চিন্তার জগত কি সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে ভার্চুয়াল জগতে? মোবাইলে ও ল্যাপটপে টাইপ করে চট করে যা দেখতে পারছে বা তথ্য পাচ্ছে, ছাত্রছাত্রীরা কি তার ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে? কাগজে লেখা বা বই পড়া কি হারিয়ে যাচ্ছে?
শিশু-কিশোর, এমনকি তরুণরাও এখন পাঠ্যবই ও রেফারেন্স বই পড়তে চায় না। তারা ভেবেচিন্তে নিজের মতো করে কিছু লিখতেও চায় না। তাদের কাছে এর চাইতেও অনেক সহজ মোবাইলে চোখ ঘুড়ানো, স্ক্রল করা, ছোট ছোট সাংকেতিক মেসেজ দেখা ও উত্তর দেওয়া, রিলস বা ভিডিও দেখা। এইসব রিলস যতো অল্প সময়ের হয়, ততোই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়। সেখানে পরীক্ষার হলে বসে তিন ঘণ্টা ধরে স্মৃতি হাতড়ে লেখাটা কি কঠিন মনে হচ্ছে?
এই ভাবনার স্বপক্ষে একটা লেখা পেলাম, 'হাতে লেখা বনাম টাইপিং নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাও ভাবনার খোরাক দেয়। ২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকলজি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগ, টাইপ করার তুলনায় বিস্তৃতভাবে সক্রিয় হয়; গবেষকরা শেখা ও স্মৃতির জন্য এই সমন্বিত স্নায়বিক কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটির গবেষণাতেও কাগজের উপর হাতে লিখে তথ্য নথিবদ্ধ করেছে যারা, পরে সেইসব অংশগ্রহণকারীদের সেই তথ্য স্মরণ করার সময় বেশি মস্তিষ্কীয় সক্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত ছিল।' (সূত্র: রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)
এরপর আসে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রশ্ন। বিভিন্ন স্তরের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার উপর এটি প্রভাব ফেলেছে। ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশের পড়ার টেবিল থেকে, সেই যে মন চলে গেছে আন্দোলনে, সেখান থেকে ফিরিয়ে আনাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার যারা এসএসসি দিয়েছে, তারা সেই সময়টাতেই নবম/দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রী ছিল। সেসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়, ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হয় ও সরকার পরিবর্তন হয়।
পরের বছরেও শিক্ষার পরিবেশ পুরোপুরি ঠিক ছিল না। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীর বার্ষিক ও প্রাক্-নির্বাচনী পরীক্ষা ব্যাহত হয়। সরকার বদল হওয়ায় পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করা হয় ও বই ছাপাতেও দেরি হয়।
'পরীক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন এবার শক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ অস্থিরতার কারণে পাঠমুখী ছিল না। শিক্ষক লাঞ্ছনা ও প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক অস্থিরতা তারা চোখের সামনে দেখেছে। পাশাপাশি শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কারণেও ভিত্তি মজবুত হয়নি।' (সাবেক অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ, মোহাম্মদপুর কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ)
কিশোর বয়সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটা বছর যাদের সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক পরিবর্তন, শিক্ষা-নীতির অস্থিরতা, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, মূল্যায়ন ও পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক এবং অবিরাম অনলাইন উত্তেজনার মধ্যে কেটেছে, তারা কি আদতে নিরবিছিন্নভাবে পড়াশোনা করতে পেরেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক, '২০২৪ সালের ছাত্র-আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের মানসিকতা বাড়লেও পড়াশোনায় মনোযোগের প্রচ্ছন্ন ঘাটতি দেখা গেছে। তবে পূর্ববর্তী মূল্যায়ন পদ্ধতিতে নম্বরের রাজনৈতিক অতিমূল্যায়ন ছিল কিনা তা স্পষ্ট না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে খাতা মূল্যায়নে বেশ কড়াকড়ি করা হয়েছে।' (বাংলা ট্রিবিউন)
পরীক্ষার্থী সবাই ফেল করায় বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন ফলের পেছনে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দুর্বলতা থাকতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাস হয় না এবং শিক্ষকদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গ্রাম পর্যায়ের স্কুলগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং তাদের পড়াশোনার বিষয়ে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। ২০২৩-২০২৫ সালে পরিচালিত ইউনিসেফ এর গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশ শুধু দারিদ্রের কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূল্যায়ন এমন হওয়া উচিত যাতে ছাত্রছাত্রীদের বোধগম্যতা, সমস্যা সমাধান এবং যুক্তিবোধ কাজ করে। অর্থাৎ মৌলিক মানসিক দক্ষতা বাড়তে হবে, শুধু মুখস্থ উত্তর নয়। নয়তো দেখা যায় একজন শিক্ষার্থী হয়তো একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে খুব ভালো লিখতে পারে, কিন্তু প্রশ্নটি একটু পরিবর্তিত হলে নিজের জ্ঞান বা মেধা প্রয়োগ করতে পারে না।
সবদিক মিলিয়েই ২০২৬ সালের রেজাল্টকে 'সতর্ক সংকেত' বলা যায়। যেসব স্কুল থেকে কেউ পাশ করেনি বা খুব অল্প সংখ্যক পাশ করেছে, তাদেরকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। অবশ্য এসএসসিতে ফেল করা মানে এই নয় যে, ছাত্রছাত্রীরা এই পর্যায়ে এসে হঠাৎ দুর্বল হয়ে গেছে। তার শেখার ঘাটতি শুরু হয়েছে প্রাথমিক ক্লাসে। কয়েক বছর ধরে সেটি জমতে জমতে এসএসসিতে এসে তা দৃশ্যমান হয়েছে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
