যেভাবে জনপ্রিয়তা বেড়েছে খুলনার ‘ডিম ঘোটা’র
মিনিট পনেরো ধরে ডিমের দোকানের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন আরশাদ সাহেব। তার নজর অবশ্য সারি সারি সাজানো আস্ত ডিমগুলোর দিকে নয়, বরং একপাশে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর বিশেষ মশলা দিয়ে যে ডিম ভাজা হচ্ছে, সেদিকে। ভাজার ধরন বেশ অন্যরকম, সেই আকর্ষণীয় ধরনের টানেই এক দৃষ্টে তাওয়ার ওপর তাকিয়ে আছেন তিনি।
দোকানের সামনে তখন ক্রেতাদের বেশ ভিড়। একের পর এক অর্ডার সামলাতে ব্যস্ত দোকানি। একটু ফাঁক পেয়ে আরশাদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনারটাই ভাজতেছি এখন।" কথা শুনে আশ্বস্ত ভঙ্গিতে হেসে উঠলেন আরশাদ সাহেব। বললেন, "হ্যাঁ, আমার চারটা ডিম লাগবে।" ততক্ষণে চারপাশে আরও কিছু ভোজনরসিক ক্রেতা এসে ভিড় জমিয়েছেন।
কেউ হাঁসের ডিমের অর্ডার দিচ্ছেন, কেউ আবার মুরগির ডিমের। চারপাশে ভেসে আসছে, 'হাঁস, হাঁস!' কিংবা 'মুরগি, মুরগি!'- এমন ডাক। আর দোকানি তাওয়ার ওপর খুন্তি চালিয়ে টুংটাং শব্দ তুলে একের পর এক 'ডিম ঘোটা' বানিয়ে চলেছেন।
খুলনা মহানগরীর নিউ মার্কেট সংলগ্ন বায়তুন নূর মসজিদ কমপ্লেক্সের পাশের রাস্তায় প্রতিদিনই দেখা মেলে এমন দৃশ্যের। বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এখানে। রাত এগারোটা পর্যন্ত চলে ক্রেতাদের ভিড় আর ডিম ঘোটা তৈরির ধুম।
কিন্তু কী এই ডিম ঘোটা? কেনোই-বা কেবল ডিমের টানে ছুটে আসেন খাদ্যরসিকেরা?
ডিম ঘোটা আসলে কী?
ডিম ঘোটার জনপ্রিয়তার রহস্য শুধু এর স্বাদে নয়, বরং লুকিয়ে আছে বিশেষ রান্নার পদ্ধতিতে। পুরো প্রক্রিয়াটাই সাধারণ ডিম ভাজার চেয়ে বেশ আলাদা। প্রথমে গরম তাওয়ায় ঢালা হয় সরিষার তেল। তেলের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তেই তাতে দেওয়া হয় পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ কুচি। হালকা ভাজা হয়ে এলে একটি মগে ফেটিয়ে রাখা ডিম ঢেলে দেওয়া হয় তাওয়ার ওপর। কিন্তু এরপর যা ঘটে, সেটিই ডিম ঘোটাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
আমরা সাধারণত অমলেট বা ডিমভাজি যতক্ষণ না শক্ত হয়, ততক্ষণ ভাজতে থাকি। ডিম ঘোটার ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো। ডিমটিকে পুরোপুরি শক্ত হতে দেওয়া হয় না; বরং কিছুটা নরম ও মোলায়েম অবস্থাতেই নামিয়ে নেওয়া হয়। ফলে ডিমের স্বাভাবিক স্বাদ ও কোমল ভাব অটুট থাকে।
এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নরম ডিমের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিশেষভাবে তৈরি এক মশলার মিশ্রণ। গোলমরিচ, এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, জিরা ও ধনের সমন্বয়ে তৈরি এই মশলাই ডিম ঘোটার প্রাণ।
তাওয়ার গরমে মশলার সুবাস যখন ডিমের সঙ্গে মিশে যায়, তখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক লোভনীয় ঘ্রাণ। পরিবেশনের ঠিক আগে ওপর থেকে আরও সামান্য মশলা ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যা স্বাদকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয়।
প্রথম দেখায় অনেকেরই খানিকটা দ্বিধা হতে পারে। কারণ ডিমটি পুরোপুরি ভাজা নয়, কিছুটা নরম। কিন্তু সেই দ্বিধা সাধারণত প্রথম লোকমার পরই মিলিয়ে যায়। সরিষার তেলের হালকা ঝাঁঝ, মশলার গভীর সুবাস আর নরম ডিমের মোলায়েম অনুভূতি মিলিয়ে তৈরি হয় স্বতন্ত্র এক স্বাদ।
আর এই ডিম ঘোটাকে খুলনার মানুষের কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে যে মানুষের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তিনি শহীদুল ইসলাম।
কীভাবে একটি ছোট্ট ফুটপাতের দোকান থেকে শুরু হয়েছিল তার এই দীর্ঘ যাত্রা? সেই গল্প বলতে গিয়ে তিনি ফিরে যান আজ থেকে প্রায় ছাব্বিশ বছর আগের খুলনায়।
'আমার প্রথম যে কাস্টমার ছিলেন, তারা এখনও আসেন'
গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে। তখন শহীদুল ইসলামের বয়স ত্রিশের কোঠায়। সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন খুলনার এই বাসিন্দা। একটি ছোটখাটো চাকরি করতেন, কিন্তু নানা কারণে সেটিও ছেড়ে দিতে হয়। সামনে তখন অনিশ্চয়তা। কী করবেন, কীভাবে নতুন করে শুরু করবেন- এমন দুশ্চিন্তায় কাটছিল দিন।
সেই সময়ই মাথায় আসে ডিমের ব্যবসার ভাবনা। হাতে ছিল সামান্য কিছু পুঁজি। তবে শুরু থেকেই তিনি চেয়েছিলেন অন্যদের থেকে আলাদা কিছু করতে। শহীদুল স্মৃতিচারণ করে বলেন, "ডিম ভাজা তো ছোটবেলা থেইকাই খাইছি। কিন্তু তখন মনে হইল, ব্যবসা যখন শুরু করতেছিই, তখন একটু ব্যতিক্রম কিছু করা দরকার।"
সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ডিম ঘোটা। ধীরে ধীরে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এর খ্যাতি। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ২৬ বছর। পুরোনো দিনের কথা বলতে বলতে শহীদুলের মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি।
"আমার প্রথম যে কাস্টমার ছিলেন, তারা এখনও আসেন," বলেন তিনি। "সিটি ল কলেজের সামনের বড় বড় বাড়িগুলোর অনেক মানুষ আজও আমার কাছেই ডিম খেতে আসেন। এত বছর খাইতে খাইতে একটা আত্মীয়তার মতো সম্পর্ক হয়ে গেছে। আল্লাহ ২৬ বছর ধরে আমাকে বাঁচিয়ে রাখছেন, আর এই কাস্টমারগুলাও ২৬ বছর ধরে আমার কাছে আসতেছেন।"
এই দীর্ঘ সময়ে শুধু তার ব্যবসাই বড় হয়নি, বদলে গেছে চারপাশের পরিবেশও। শহীদুলের স্মৃতিতে আজও স্পষ্ট সেই পুরোনো খুলনা, যার সঙ্গে বর্তমান শহরের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বললেন, "আমি যখন দোকান দেই, তখন এই এলাকায় আর কোনো ডিমের দোকান ছিল না। ফুটপাতে ফুডকার্টও ছিল না।" সামনের দিকে হাত দেখিয়ে যোগ করেন, "এই পুরো জায়গাটাই ফাঁকা ছিল। এখানে গরুর হাট বসত।"
তিনি আরও জানান, দোকান শুরু করার সময় একটি ডিমের দাম ছিল মাত্র ১ টাকা ৭০ পয়সা। এখন সেই একই ডিম কিনতে খরচ করতে হয় ১৫ থেকে ২০ টাকা। এই আড়াই দশকে তিনি দেখেছেন দ্রব্যমূল্যের উত্থান, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং শহরের দ্রুত প্রসার।
স্বাদের ক্ষেত্রে কোনো আপস নয়
শুধু ভিন্ন ধরনের রান্নার কৌশলই নয়, শহীদুলের ডিম ঘোটার জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে কিছু নিজস্ব নীতি ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা কৌশল। তার মতে, ভালো খাবারের মূল শর্তই হলো উপকরণের সতেজতা এবং স্বাদে কোনো আপস না করা। এ ব্যাপারে শহীদুল বেশ আত্মবিশ্বাসী।
তিনি বলেন, "আমার ডিম ভাজায় কোনো ভেজাল নাই, সব ন্যাচারাল।"
তার এই যত্ন শুধু ডিম ভাজাতেই সীমাবদ্ধ নয়; সমান গুরুত্ব পায় খাবারের সঙ্গে পরিবেশিত সালাদ ও চাটনিও। সাধারণত ডিম ভাজার সঙ্গে অনেকেই শসা কুচি পরিবেশন করেন। কিন্তু শহীদুল সেই পরিচিত পথ ধরে হাঁটেন না। তিনি ব্যবহার করেন দেশি খিরা এবং নিজস্ব রেসিপিতে তৈরি বিশেষ এক চাটনি।
শহীদুলের ভাষায়, শসা কেটে কিছুক্ষণ রাখলেই পানি ছেড়ে দেয়। এতে খাবারের স্বাদ যেমন কমে যায়, তেমনি নষ্ট হয় মচমচে ভাবও। অন্যদিকে দেশি খিরা অনেকক্ষণ পর্যন্ত টাটকা ও কড়মড়ে থাকে। সেই খিরার সঙ্গে তেঁতুল, টমেটো, কাসুন্দি ও বিভিন্ন মশলার সংমিশ্রণে তৈরি চাটনি ডিম ঘোটার স্বাদকে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেয়।
চাটনির গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "এই চাটনি প্রথমে ঢাকায় দেখছি। সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে দেওয়া হইতো। খুলনায় প্রথম আমিই আনছি। খিরা, তেঁতুল, টমেটো সস, কাসুন্দি, সরিষার তেল, পেঁয়াজ কুচি আর কিছু মশলা দিয়ে বানাই।"
বর্তমানে শহীদুলের দোকানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় দুই ধরনের ডিম ঘোটা। সাধারণ কিন্তু পরিচিত স্বাদের খোঁজে যারা আসেন, তাদের জন্য রয়েছে ৩০ টাকার মুরগির ডিম। আর যারা একটু ভিন্ন স্বাদ উপভোগ করতে চান, তাদের পছন্দ ৩৫ টাকার হাঁসের ডিম।
চাহিদার পার্থক্যও ঋতুভেদে স্পষ্ট। গরমের দিনে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি ডিম ঘোটা বিক্রি হয়। কিন্তু শীত নামলেই সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। তখন প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০টি ডিম ঘোটা বিক্রি করতে হয় শহীদুলকে।
এই বিক্রির ওপর ভিত্তি করে শহীদুলের দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় সাত হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা, যা দিয়েই তিনি সামলান সংসার আর দীর্ঘদিনের এই ছোট্ট ব্যবসার সব খরচ।
সকাল থেকেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ
দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, ডিম ঘোটা বানানো খুব বেশি সময়সাপেক্ষ কিছু নয়- বিকেলের কয়েক ঘণ্টার ব্যস্ততা মাত্র। কিন্তু ভেতরের বাস্তবতা আলাদা। এই কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রস্তুতি শুরু হয় সকাল থেকেই।
ডিম ধোয়া-ছাঁটাই, পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ কাটা, আর নিজস্ব মশলার মিশ্রণ তৈরি- সব মিলিয়ে দিনের বড় একটা অংশ কেটে যায় প্রস্তুতিতেই। এই পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে পুরো বিকেলের ব্যবসা।
শহীদুল ইসলামের ছেলে সামিউল ইসলাম বর্তমানে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সন্ধ্যার পর বাবার দোকানে এসে তিনিও হাত লাগান কাজে। ক্রেতা সামলানো থেকে শুরু করে অর্ডার বুঝে নেওয়া- সব কিছুতেই এখন সামিউলের অংশগ্রহণ আছে।
নিউ মার্কেট এলাকায় দোকান হওয়ায় ক্রেতাদের বড় অংশই শপিং শেষে ফেরা মানুষজন। কেনাকাটা শেষ করে ক্লান্ত পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্রেতা জানালেন, "অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি ডিম খাওয়ার জন্য।"
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য এই ব্যবসার প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। একসময় যেখানে শহীদুলই ছিলেন একমাত্র পরিচিত মুখ, এখন সেখানে আরও অনেকে একই ধরনের খাবার নিয়ে এসেছে বাজারে। সেই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার গতি বেড়ে যাওয়াও বদলে দিয়েছে পরিস্থিতি।
শহীদুলের কণ্ঠে তাই খানিকটা আক্ষেপও শোনা যায়। তিনি বলেন, "আগে মানুষ যতক্ষণ ইচ্ছা দাঁড়িয়ে খাইতো। এখন অবস্থা এমন- এক পা এদিকে, আরেক পা বাইরে। না দিলে চলে যাব, এমন ভাব নিয়েই আসে বেশি মানুষ।"
এত বছর ধরে নিজের হাতে গড়ে তোলা ছোট্ট এই দোকানটাই শহীদুলের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একই রুটিন—উনুন জ্বলে ওঠে ঠিক সময়ে, তাওয়ার ওপর ছড়িয়ে পড়ে গরম তেলের ঘ্রাণ, আর চারপাশ ভরে ওঠে ডিম ঘোটার টাটকা সুবাসে।
সময়ের সঙ্গে শহরের অনেক কিছু বদলে গেলেও এই দোকানের চেনা ছন্দটা একই রয়ে গেছে। এখনো প্রতিদিন এখানে ভিড় জমে, কেউ নতুন করে আসে, কেউ আবার পুরোনো দিনের স্বাদ খুঁজতে ফিরে আসে পরিচিত এই তাওয়ার সামনে। বিশেষ করে পুরনো ক্রেতাদের অনেকেই এখনো শহীদুলের হাতের স্বাদ মনে করে দূর থেকে ছুটে আসেন।
ছবি: সুস্মিতা চক্রবর্তী মিশু/টিবিএস
