নীড়হারা ঝড়ের পাখি, বিপন্ন ছানাদের জীবন
গত বৈশাখের এক সকালে খবর পেলাম, সুলতানপুর গ্রামের এক বাড়িতে দুটো প্যাঁচার ছানা আটকে রাখা হয়েছে। জানা গেল, ছানা দুটোকে নরসিংদীর বন্য প্রাণী কেনাবেচার বিতর্কিত পুটিয়া হাটে শনিবার বিক্রি করে দেওয়া হবে। দেরি না করে অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেলাম। কিছু উৎসুক জনতাও হাজির হলো সেখানে। তাদের একজনের কাছ থেকেই জানতে পারলাম, গতকালের ঝড়ে পার্শ্ববর্তী আলীনেয়াজ মুন্সির বাড়ির সামনের নারকেলগাছটি মাঝখান থেকে ভেঙে যায়। ভাঙা জায়গাটিতে একটি খোড়ল বা গর্ত ছিল, যেখানে প্যাঁচা বাসা করেছিল। গাছটি ঝড়ে ভেঙে যাওয়ায় বাসা উন্মুক্ত হয়ে প্যাঁচার বাচ্চা দুটি নিচে পড়ে যায়। তারপর এই বাড়ির কয়েকজন শিশু বাচ্চা দুটিকে এখানে নিয়ে আসে। প্যাঁচার ছানা দুটিকে খাঁচাবন্দী করে রাখা হয়েছিল। যদিও গৃহকর্তা এদের পুটিয়া বাজারে নিয়ে বিক্রির প্রস্তুতির কথা স্বীকার যাচ্ছিল না। আসলে নরসিংদীর এক বিতর্কিত নাম হচ্ছে পুটিয়া বাজার। বন বিভাগের বহু অভিযানের পরেও এখানে এখনো নিয়মিত বন্য প্রাণী কেনাবেচা চলে। এমনকি কোথাও বন্য প্রাণী পেলে অনেক মানুষের মনে প্রথমেই চলে আসে পুটিয়া বাজারে নিয়ে বিক্রির কথা; যা অত্যন্ত নেতিবাচক একটি বিষয়। তবে যাক সে কথা, আমি ভাবছিলাম আসলে এই ছানা দুটোকে এখন কীভাবে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়? ওদের বিচিত্র আর সুন্দর চেহারা দেখেই আমি ছানা দুটোকে চিনতে পারলাম, ওরা হচ্ছে কণ্ঠি নিমপ্যাঁচার (Collared scopes owl) বাচ্চা। আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই উড়তে শিখবে।
সমবেত জনতার মধ্য থেকে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে সেই ভাঙা নারকেলগাছের নিচে এসে হাজির হলাম। একেবারে মাঝখান থেকে ভেঙেছে গাছটা, যেখানে বাসাটা ছিল। ভাঙা স্থানের খোদলের মতো জায়গায় বাসার কিছু অংশ তখনো টিকে আছে। মা প্যাঁচাটিকে কোথাও দেখা গেল না।
সেই সন্ধ্যায় প্যাঁচার ছানাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির হলাম ভাঙা নারকেলগাছের কাছে। এখানে একটা বিষয় বলে রাখতে হয়, উদ্ধার বন্য প্রাণী অবমুক্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। তা না হলে উপকারের বদলে প্রাণীটার ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। প্যাঁচা নিশাচর পাখি, এরা অন্ধকারে বিচরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাই এদের অবমুক্ত করার সময় হচ্ছে রাত।
আরও একটু অন্ধকার ঘনিয়ে এলে একটা বাঁশের মাথায় বাঁধা কাঠিতে বসিয়ে একে একে দুটো ছানাকে বাসায় রেখে দেওয়া হলো। আমার সঙ্গে তখন মকবুল নামে এক স্বেচ্ছাসেবক। আমি অতঃপর তাকে নিয়ে নারকেলগাছ থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান নিলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছানাদের কাছে মায়ের উপস্থিতি টের পাওয়া গেল। আর ঠিক তখন আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। মা এখন তার ছানাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলের দিকে নিয়ে যাবে। বাংলা সাহিত্যে 'নীড়হারা ঝড়ের পাখি' বাক্যটি বহু গল্প, কবিতা আর গানে ব্যবহৃত হয়েছে। আবার বিপদগ্রস্ত মানুষের উপমা হিসেবে 'ঝড়ের পাখি' শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে সত্যিই ঝড়ের সময় পাখিদের জীবন তছনছ হয়ে যায়। যদিও প্রতিটি পাখি একেকজন দক্ষ প্রকৌশলী কিংবা স্থাপত্যশিল্পী। ঝড়ের কথা মাথায় রেখেই ওরা বাসা প্রস্তুত করে থাকে। তবু প্রবল ঝড়ে মাঝেমধ্যে এদের অনেকেরই বাসা উড়ে যায়। পাখি মরে, ছানা মরে, ডিম নষ্ট হয়। আবার ঝড়ের পরে বহু আহত পাখি আর পাখির ছানা দেখা যায় প্রকৃতির বুকে অসহায় অবস্থায় ছটফট করছে। মানুষদের কেউ কেউ এদের কুড়িয়ে নিয়ে লালন-পালন করার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ পাখির ছানা এই মৃত্যুবরণ করে। কারণ, ঝড়ে গাছ থেকে নিচে পড়া ছোট ছোট পাখির ছানাদের পরিচর্যার কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে। বিশেষ করে চোখ না ফোটা ছানা বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত ধৈর্যের কাজ। এ ক্ষেত্রে এদের কৃত্রিম তাপ দিতে হয়, যাতে মায়ের বুকের উষ্ণতার অভাব পূরণ হয়। আমি এই কাজ করার চেষ্টা করে থাকি। তবে সব ছানাই যে বেঁচে থাকে, তা কিন্তু নয়। প্রকৃতিতে একটা বুনো পাখি তার বাচ্চাকে যেভাবে লালন-পালন করে, অন্যের পক্ষে তা করা বেশ কঠিন কাজ।
আমাদের দেশে এখনো বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। লোকবলের যেমন সংকট আছে, তেমনি অভাব রয়েছে বিপদগ্রস্ত বন্য প্রাণী উদ্ধার এবং অবমুক্ত করার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের। আসলে ১৮ কোটি মানুষের এই দেশের সমস্যার অন্ত নেই, পাখির ছানাদের কথা ভাববে কে? তবু কিছু মানুষ আছে যারা বন্য প্রাণীর সুরক্ষায় সরকারি কোনো ধরনের সহায়তার চিন্তা না করে বহুদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আসলে সেসব মানুষের ঝড়ের পাখি কিংবা ছানাদের সুরক্ষায় প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
বনের পাখিরা আমাদের মতোই এ দেশের বাসিন্দা। খাদ্য-বাসস্থানের পাশাপাশি এদেরও জীবনের নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। আর সেই অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের।
সংযুক্তি: ঝড়ের কবলে পড়ে শুধু পাখি কিংবা পাখির ছানা নয়, অন্যান্য বন্য প্রাণীও বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।