ইমরানপুত্রদের সাক্ষাৎকার প্রচার করলে লর্ডস টেস্টের মাঝপথে খেলা বন্ধের হুমকি দিয়েছিল পাকিস্তান
লর্ডস টেস্টের প্রথম দিনে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) হুমকি দিয়েছিল, মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময় স্কাই স্পোর্টস যদি ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করে, তাহলে তাদের দল লাঞ্চের পর আর মাঠে ফিরবে না।
ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমাইমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে সংসারে জন্ম নেওয়া দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান খান, আগে থেকে ধারণ করা এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, পাকিস্তান সরকার কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তি ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খানকে 'হত্যার চেষ্টা করছে'। লর্ডসের প্যাভিলিয়নে ওই সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়, যেখানে ইমরানের একটি প্রতিকৃতিও টাঙানো রয়েছে।
উল্লেখ্য, পিসিবির বর্তমান চেয়ারম্যান মহসিন নকভি একই সঙ্গে পাকিস্তানের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলে সরকারের সমালোচনাকারীদের এভাবে একটি আন্তর্জাতিক প্রচারণামূলক প্ল্যাটফর্ম দেওয়াকে তিনি কোনোভাবেই ইতিবাচক হিসেবে নেননি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনের মধ্যাহ্নভোজের (লাঞ্চ) বিরতির সময় এই সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করার কথা ছিল। স্পোর্টস ওয়েবসাইট 'ইএসপিএন ক্রিকইনফো'-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিসিবির আপত্তির পর স্কাই স্পোর্টস সাময়িকভাবে সম্প্রচার বিলম্বিত করলেও, শেষ পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর ১৮ মিনিটের সেই ক্লিপটি অন-এয়ার বা প্রচার করে।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটনের নেওয়া সেই সাক্ষাৎকারটি যখন টিভিতে সম্প্রচার হচ্ছিল, তখন পাকিস্তানের খেলোয়াড়েরা ইতিমধ্যেই বিকেলের সেশনের জন্য মাঠের আউটফিল্ডে গা গরম বা ওয়ার্ম-আপ করছিলেন। ফলে খেলা বন্ধের সংক্ষিপ্ত হুমকির পর অবশেষে কোনো বিলম্ব ছাড়াই নির্ধারিত সময়ে খেলা পুনরায় শুরু হয়।
এই ঘটনাটি ক্রিকেটপ্রেমীদের ২০ বছর আগের ওভালের এক ঐতিহাসিক টেস্টের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ২০০৬ সালে ওভালে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যকার চতুর্থ টেস্টের চতুর্থ দিনে আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার এবং বিলি ডকট্রোভ বল বিকৃতির (বল টেম্পারিং) অভিযোগে পাকিস্তানকে ৫ রান জরিমানা করেন এবং বল পরিবর্তন করেন। এর প্রতিবাদে চা-পানের বিরতির পর ইনজামাম-উল-হকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দল মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে আম্পায়ারেরা ম্যাচটি বাজেয়াপ্ত করে ইংল্যান্ডকে জয়ী ঘোষণা করেছিলেন।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান, যিনি পাকিস্তানের হয়ে ৮৮টি টেস্ট খেলেছেন, ২০১৮ সালে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায় আসার পর দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২২ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে গত তিন বছর ধরে তিনি একাধিক মামলায় কারাবন্দি রয়েছেন। বিশ্বজুড়ে ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক এবং যুক্তরাজ্যে থাকা তার পরিবারের সদস্যরা কারাগারে ইমরানের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তার মানবিক চিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন।
কাসিম ও সুলাইমান ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে তাদের বাবার মুখ দেখেননি এবং সর্বশেষ গত মার্চে তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। সুলাইমান জানান, তাদের বাবা এক চোখের ৮০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। দিনে ২৩ ঘণ্টা তাকে 'একটি অত্যন্ত ছোট সেলে নতুন কোনো বই ছাড়া' বন্দি রাখা হয় এবং গ্রীষ্মকালে সেখানে কোনো এসি বা ফ্যানের ব্যবস্থা থাকে না। নির্জন কারাবাসের মানসিক চাপের কারণে তার রক্তচাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
কাসিম বলেন, 'কারা কর্তৃপক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি মেনে কাজ করছে না। তারা অত্যন্ত নগ্নভাবে তাকে কারাগারেই মেরে ফেলার চেষ্টা করছে, যাতে তাকে দীর্ঘ সময় বন্দি রেখে চুপ করিয়ে রাখা যায়।' তিনি আরও জানান, 'সবশেষ যখন তিনি আমাদের ফুফুদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন, তখন জানিয়েছিলেন যে সম্প্রতি তার ওপর অত্যাচারের মাত্রা অনেক বেড়েছে। তিনি এটিকে অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিদের উদাহরণ দিয়ে তুলনা করেছেন যারা কারাগারে মারা গেছেন বা যাদের মেরে ফেলা হয়েছে।'
কাসিম বলেন, তার বাবা জীবনের সব কঠিন পরিস্থিতিতে, এমনকি তার ওপর সরাসরি বন্দুক তাক করার সময়েও সবচেয়ে শান্ত ও স্থির থাকতেন। কিন্তু কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি তাকে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে ইসলামাবাদের শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করার এবং ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সুলাইমান বলেন, 'আমাদের আশঙ্কা সত্যি করে বেসরকারি সেই হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে সরকার তাকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায় এবং নামমাত্র স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে তড়িঘড়ি করে পুনরায় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।'
কাসিম ও সুলাইমান জানিয়েছেন, তারা একাধিকবার পাকিস্তানে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও কারিগরি জটিলতার অজুহাতে তাঁদের ভিসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে তারা এই বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকাকে অত্যন্ত 'দুর্বল ও হতাশাজনক' বলে বর্ণনা করেছেন। সুলাইমান বলেন, 'আমরা যখনই ফরেন অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, তারা কেবল মৌখিক সহানুভূতি প্রকাশ করেছে কিন্তু বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।'
কাসিম আরও যোগ করেন, 'আগের রক্ষণশীল সরকারের আমলে আমরা শূন্য সমর্থন পেয়েছি। তারা আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে আমাদের পাকিস্তানে যাওয়া উচিত হবে না এবং গেলে তারা কোনো নিরাপত্তা দিতে পারবে না। আমরা আশা করি নতুন লেবার সরকারের নতুন পররাষ্ট্র সচিবের আমলে আমরা আমাদের বাবাকে দেখার সুযোগ পাব।'
সাক্ষাৎকারটির পাশাপাশি স্কাই স্পোর্টস পাকিস্তান সরকারের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও প্রচার করেছে। ইসলামাবাদ প্রশাসন ইমরান খানের ওপর নির্যাতন বা অবহেলার অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে:
- ইমরান খানকে একজন 'দণ্ডিত কয়েদি' হিসেবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে।
- তাকে সাতটি সেলের একটি বিশেষ কম্পাউন্ডে রাখা হয়েছে যেখানে শরীরচর্চার সুবিধা রয়েছে।
- তিনি ঘরের রান্না করা খাবার, বই এবং টেলিভিশন দেখার সুবিধা পাচ্ছেন।
- ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৯০০ জনেরও বেশি দর্শনার্থী তার সঙ্গে দেখা করেছেন।
- চিকিৎসকেরা তাকে সম্পূর্ণ ফিট ঘোষণার পরই পুনরায় কারাগারে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ উন্নয়ন কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'পাকিস্তানের বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, যাতে যুক্তরাজ্য হস্তক্ষেপ করে না। তবে ব্রিটিশ মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে ইমরান খানের সুরক্ষাসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতাগুলো বজায় রাখার জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন।'
