জেজু দ্বীপে একের পর এক নিখোঁজদের মরদেহ উদ্ধার, মৃত্যু ঘিরে রহস্য
দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় অবকাশকেন্দ্র জেজু দ্বীপে রহস্যময় চার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
দ্বীপটির একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম থেকে শনিবার প্রথম লাশটি উদ্ধার করা হয়। নিহত ষাটোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি ৫১ দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন। এ ঘটনার পরদিন, দ্বীপটির উত্তর উপকূলের সমুদ্রে পাওয়া যায় সত্তরের কোঠায় বয়সের দ্বিতীয় আরেক ব্যক্তির লাশ। তিনিও কিছুদিন আগে নিখোঁজ হন।
এর দুই দিন পর দ্বীপটির ভিন্ন দুই এলাকা থেকে আরও দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী জং মি-রান। মে মাসে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে দেশটির জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিখোঁজ হওয়া চার ব্যক্তির লাশ মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এভাবে উদ্ধার হওয়া জেজুর মতো ছোট একটি দ্বীপের জন্য বেশ বিস্ময়কর।
সাদা বালুর সমুদ্রসৈকত এবং কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির জন্য বিখ্যাত জেজু দ্বীপটি দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম সেরা পর্যটনকেন্দ্র। এক ডজনেরও বেশি ফাইভ-স্টার রিসোর্ট সমৃদ্ধ এই দ্বীপে গত বছরও এক কোটির বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটকের সমাগম হয়েছে।
তবে পর পর ঘটা এই রহস্যজনক ঘটনাগুলোর কারণে দ্বীপটির সেই সুনাম এখন নষ্ট হওয়ার পথে।
পুলিশি কেলেঙ্কারির অন্তরালে
এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন 'বু' পদবির একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ভুক্তভোগীর পরিবারকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং নিখোঁজের তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করার আগেই নথি বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার দায়িত্বপ্রাপ্ত চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
উক্ত পুলিশ কর্মকর্তা বু-ই ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি এবং মিস জং-এর নিখোঁজ হওয়ার মামলা দুটি দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। দুটি ক্ষেত্রেই কোনো রকম খোঁজখবর ছাড়াই ভুক্তভোগীরা নিরাপদে আছেন বলে তিনি দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন—তিনি তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তারা জানিয়েছে লোকটি নিরাপদে আছেন, কিন্তু পরিবারের কাছে নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে চান না।
নিহত ব্যক্তির ছেলে সাংবাদিকদের জানান, 'পুলিশ যখন বলেছিল বাবা নিরাপদে আছেন, আমরা বিশ্বাস করে অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ ৫১ দিন পর ফেরত এলো শুধু ওনার নিথর দেহ।'
অন্যদিকে, মিস জং-এর ঘটনার ক্ষেত্রে বু ওই নারীর প্রেমিকের কাছে দাবি করেছিলেন—ফোনে জং-এর সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং জং নিজেই যোগাযোগ রাখতে বারণ করেছেন। তবে তদন্তে এমন কোনো ফোনকলের প্রমাণ মেলেনি।
মে মাসে প্রথম নিখোঁজের পর ১৭ জুলাই জং-এর প্রেমিক আবারো বিষয়টি পুলিশকে জানাতে গেলে তা খারিজ করে দেওয়া হয়। দুই দিন পর, ১৯ জুলাই তিনি সিউলের একটি থানায় নতুন করে অভিযোগ দায়ের করলে বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে জং-কে শেষবার যেখানে দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরের একটি খেজুর বাগান থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
মিস জং-কে কেন্দ্র করে নতুন করে শুরু হওয়া এই অনুসন্ধানই মূলত বাকি তিনটি লাশ উদ্ধারের পথ উন্মোচন করে এবং পুরো কেলেঙ্কারিটি প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। কর্মকর্তা বু-এর হাত দিয়ে পরিচালিত বিগত ২৯৮টি মামলার সবকটিই এখন পুনর্বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ, যার মধ্যে ১০টি মামলা নিয়মবহির্ভূতভাবে বন্ধ করার অভিযোগে বিশেষভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং পুলিশ বাহিনীতে এক ব্যাপক সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন। দেশটির ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির অধীনে থাকা জাতীয় তদন্ত ব্যুরোর প্রধান হং সক-কি বলেন, 'আমি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে পুরো ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হবে।'
দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান নিখোঁজ সংক্রান্ত আইনানুযায়ী, কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার লিখিত অনুমোদন ছাড়াই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো নিখোঁজ মামলার নথিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিতে পারেন।
দেশটিতে প্রতি বছর ৭০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিখোঁজ হন, যার ৯৯ শতাংশই এক মাসের মধ্যে সমাধান হয়ে যায়—যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তি হয় জীবিত, না হয় মৃত অবস্থায় উদ্ধার হন।
তবে জেজু দ্বীপের এই ঘটনায় রহস্যের বহু অংশ এখনো অজানাই রয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কোনো ঘটনার ক্ষেত্রেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কর্মকর্তা বু কেন পরিবারগুলোকে তাদের প্রিয়জনেরা বেঁচে আছেন বলে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন, তাও পরিষ্কার নয়। তবে এক পুলিশ কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, বু তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করছেন তিনি সত্যিই ওই নিখোঁজ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
নিখোঁজ ও একাধিক লাশ উদ্ধারের এই খবরের পর অনেকেই এখন জেজু দ্বীপে ভ্রমণের বিষয়ে সতর্ক করছেন, আবার অনেকেই পূর্বনির্ধারিত ট্রিপ বাতিল করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো নানান গুজবের মাঝে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন—জেজু দ্বীপে কি কোনো সক্রিয় সিরিয়াল কিলার রয়েছে? আবার কেউ কেউ মানবপাচারকারী চক্রের হাত থাকার আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন।
যদিও দক্ষিণ কোরিয়ায় সহিংস অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু বিশ্বে আত্মহত্যার হারের দিক থেকে দেশটি অন্যতম। মিস জং নিজেই আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
"জেজুতে হাঁটাও এখন কিছুটা ভীতিকর"
সিউলে অবস্থানরত বিবিসি সাংবাদিক জেক কোওন সংবাদমাধ্যমের অতিরিক্ত চাঞ্চল্যকর কভারেজকে "ভয়াবহ ও কদর্য" বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, 'এটি আসলে পুলিশের চরম ব্যর্থতা এবং অলসতারই একটি কেস।'
তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বেশ থমথমে। এক্স-এ সাড়ে ৩ কোটিরও বেশি বার দেখা একটি পোস্টে এক ব্যবহারকারী জেজু দ্বীপের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তিনি জানান, একটি রেস্তোরাঁর মালিক তাকে রাতের অন্ধকারে হেঁটে হোটেলে ফিরতে নিষেধ করেছিলেন।
ওই ব্যক্তি লেখেন, 'রেস্তোরাঁর মালিক যখন আমাদের গাড়িতে করে পৌঁছে দিচ্ছিলেন, তখন তিনি বলছিলেন ইদানিং এদিকে মানুষের আনাগোনা অনেক কমে গেছে, প্রচুর খুন ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সবাই বিষয়গুলো চেপে যাচ্ছে।'
গত নয় বছর ধরে জেজু দ্বীপে বসবাসকারী দক্ষিণ কোরিয়ান অভিনেত্রী জিন জে-ইয়ং ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, 'আমি রাতে খুব একটা বাইরে বের হই না, কিন্তু ইদানীং জেজুতে একটু হাঁটাচলা করতেও কেমন যেন ভয় ভয় লাগে।'
