জং উনের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের চেষ্টা: ছয় দিন আগেই যৌথ মহড়া শেষ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও দ.কোরিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়র সময় সংক্ষিপ্ত করে আনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী। ট্রাম্প পেন্টাগনকে মহড়ার পরিধি কমানোর নির্দেশ দেওয়ার কয়েক দিন পরই দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে এই ঘোষণা এল।
বুধবার এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অভ স্টাফ জানায়, ওয়াশিংটনের অনুরোধে সোমবার শুরু হওয়া উলচি ফ্রিডম শিল্ড (ইউএফএস) মহড়া শুক্রবার—মূল পরিকল্পনার চেয়ে ছয় দিন আগে—শেষ হয়ে যাবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সিমুলেটেড কমান্ড মহড়ার পাশাপাশি পৃথকভাবে যে যৌথ আউটডোর মহড়া চলার কথা ছিল, তার পরিধিও 'আংশিক কমানো' হবে। তবে এ-সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে এখনও সমন্বয় করছে দুই দেশের সামরিক বাহিনী।
পরে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়ার মাত্রা 'উল্লেখযোগ্য হারে' কমিয়ে আনছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
এর আগে রোববার ট্রাম্প বলেন, এই মহড়ায় মার্কিন বাহিনীর অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি 'খুশি নন'। উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে 'অত্যন্ত চমৎকার সম্পর্কের' কথা উল্লেখ করে এই মহড়াকে ব্যয়বহুল ও পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি 'শত্রুতাপূর্ণ' পদক্ষেপ বলে আখ্যা দেন তিনি।
বুধবার পার্লামেন্টের শুনানিতে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন বলেন, ট্রাম্পের এ নির্দেশে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে সিউল।
বিষয়টি সিউলকে আগে জানানো হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চো বলেন, 'আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা তো বটেই, মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানা ছিল না।'
বুধবারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার সম্প্রচারমাধ্যম কেবিএস, এমবিসি ও সংবাদপত্র কিউংহিয়াং বেনামি সামরিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত খবরে জানায়, মহড়ার দ্বিতীয় ধাপ পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কাল্পনিক পাল্টা-আক্রমণের এই পর্ব নিয়েই সবসময় সবচেয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করত পিয়ংইয়ং। এই ধাপ বাদ পড়ার কারণেই নির্ধারিত সময়ের আগেই ইতি টানা হচ্ছে মহড়ায়।
মহড়া শুরুর কয়েক দিন আগে কোরীয় যুদ্ধবিরতি তদারকিকারী বহুজাতিক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্কট উইন্টার বলেছিলেন, এবারের ইউএফএস মহড়া 'অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় ও ভালো' হতে চলেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনার উপস্থিতির শুরু কোরীয় যুদ্ধের সময়। ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সেই সংঘাত থামলেও আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি। অর্থাৎ কাগজে-কলমে দুই কোরিয়া এখনও একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধরত।
সেই থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি ক্যাম্প হামফ্রেস এখন এদেশে অবস্থিত। চলতি সপ্তাহের মতো বড় পরিসরের বার্ষিক মহড়ার পাশাপাশি দুই দেশের সামরিক বাহিনী একসঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ ও যৌথ অভিযান চালিয়ে থাকে।
এর আগে ২০১৮ সালে জং উনের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রথম বৈঠকের পরও যৌথ মহড়ায় কাটছাঁট বা বাতিলের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তবে সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল মহড়া শুরুর আগেই, মাঝপথে নয়।
এদিকে মঙ্গলবার মার্কিন কর্মকর্তাদের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) উদ্ধৃত করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল আসার আগেই কিমের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করতে ঘনিষ্ঠ মহলে চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প।
পত্রিকাটি বলেছে, ব্যক্তিগত আলাপে নিজের আসন্ন এশিয়া সফরেই কিমের সঙ্গে সশরীরে সাক্ষাতের বিষয়টি তুলেছেন ট্রাম্প। নভেম্বরে চিনের শেনঝেনে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশনের (অ্যাপেক) শীর্ষ সম্মেলনে তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেই সময়েই এই বহুপ্রতীক্ষিত বৈঠকটি হতে পারে।
এর আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্ট করেছিলেন ট্রাম্প। সেখানে সামরিক কর্মকর্তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে টেলিফোনে কথা বলতে দেখা যায় কিম জং উনকে। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, 'হেই ডোনাল্ড, আমাদের সম্পর্ক তো ঠিক আছে...তাই না?'।
সাংবাদিকদের কাছেও ট্রাম্প দাবি করেন, আলোচনার এই প্রস্তাবে কিম 'সাড়া দিয়েছেন'। তবে এ বিষয়ে খোলসা করে কিছু বলতে চাননি তিনি।
নিজের প্রথম মেয়াদে মোট তিনবার কিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ট্রাম্প। এর মধ্যে ২০১৯ সালে অসামরিক এলাকা পেরিয়ে কিছুক্ষণের জন্য উত্তর কোরিয়ার মাটিতেও পা রেখেছিলেন তিনি। গত উইকএন্ডে ট্রুথ সোশ্যালে দুজনের পুরোনো একটি ছবি শেয়ার করেন ট্রাম্প। তারপর থেকেই নতুন করে দুজনের বৈঠকের জল্পনা শুরু হয়েছে।
সিউল-ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেজং ইনস্টিটিউটের ভাইস-প্রেসিডেন্ট চেওং সিওং-চ্যাংয়ের বলেন, কিমের সঙ্গে আলোচনা ফের শুরু হলে ট্রাম্প হয়তো আরও একধাপ এগিয়ে যাবেন। সিউলের সঙ্গে আলোচনা না করেই তিনি এই যৌথ মহড়া পুরোপুরি বাতিল করে দিতে পারেন, অথবা কমিয়ে দিতে পারেন মার্কিন সেনার সংখ্যা।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, মহড়ার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সমন্বয় অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে দেশের সামরিক স্বাধীনতা আরও বাড়ানোর দাবিতে নতুন করে সরব হয়েছেন প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং।
