আদমজী ইপিজেড থেকে বছরে প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলারের স্যুট রপ্তানি ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারের
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ স্যুট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য বছরে প্রায় ৫০ লাখ পিস পুরুষদের পোশাক উৎপাদন করে।
রোমানিয়া-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগের এ প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য টেইলর্ড স্যুট, ব্লেজার, ফরমাল ট্রাউজার, ওয়েস্টকোট ও জ্যাকেট তৈরি করে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি তাদের কারখানায় ৪৫ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলার।
বেপজা'র তথ্যমতে, বর্তমানে কারখানাটিতে ৫,৬৯৯ জন বাংলাদেশি এবং ৪০ জন বিদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন।
চলতি সপ্তাহে কারখানাটি ঘুরে দেখা যায়, বড় একটি ফ্লোরজুড়ে চলছে পোশাক তৈরির ব্যস্ততা। কোথাও কাপড় কাটা হচ্ছে, কোথাও মেশিনের শব্দে চলছে সেলাই। কেউ নিখুঁতভাবে ব্লেজার আয়রন করছেন, কেউ তৈরি পোশাক ভাঁজ করে প্যাকেটজাত করছেন। শেষ ধাপে পোশাকগুলো হ্যাঙ্গারে সাজিয়ে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করছেন আরেক দল কর্মী।
ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এইচআর অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, "দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় স্যুট কারখানা হিসেবে আমরা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য পুরুষদের স্যুট, ব্লেজার ও ট্রাউজার তৈরি করছি।"
তিনি জানান, রোমানিয়ার অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে কারখানাটি স্থাপন করা হয়। রোমানিয়া থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি এনে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা হয়। ২০১২ সালে কারখানায় উৎপাদন ও প্রথম রপ্তানি শুরু হয়। পরে ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মোট ফ্লোর স্পেস প্রায় ৫ লাখ ৩৫ হাজার বর্গফুট। এখানে আধুনিক কাটিং, সেলাই, প্রেসিং, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় পোশাক তৈরি করা হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ স্যুটে সাধারণত ব্লেজার ও ট্রাউজার থাকে।
কারখানাটিতে তৈরি বেশিরভাগ স্যুটের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দামের স্যুটও এখানে তৈরি হয়ে রপ্তানি হয়েছে।
বিল্লাল হোসেন বলেন, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৫ লাখ পিস প্যান্ট, ট্রাউজার, ব্লেজার ও পুরুষদের অন্যান্য পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। বছরে এ সক্ষমতা প্রায় ৫০ লাখ পিস।
প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করে। তাদের তৈরি পোশাকের ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে এইচঅ্যান্ডএম, জারা ম্যান, জারা কিডস, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার (এমঅ্যান্ডএস), সিঅ্যান্ডএ, প্রাইমার্ক, এএসওএস, জ্যাক অ্যান্ড জোনস, বেন শেরম্যান, মস ব্রস গ্রুপ, ডানস স্টোরস, কিউবাস, হ্যাগার ক্লোদিং, ডোবেল ও পিয়ারলেস ক্লোদিং ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও রিটেইলার।
স্থানীয়ভাবে খুব সীমিত কিছু উপকরণ, যেমন প্যাকেজিংয়ের কার্টন সংগ্রহ করা হয়। তবে উৎপাদনে ব্যবহৃত অধিকাংশ কাঁচামালই বিদেশ থেকে আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি।
আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া টিবিএসকে বলেন, "বিনিয়োগকারীদের জন্য আমরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। ফলে এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদমজী ইপিজেডের ৪৭টি প্রতিষ্ঠান ১ দশমিক ১৭৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বর্তমানে নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে এলে বার্ষিক রপ্তানি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।"
শুধু কর্মস্থল নয়
আদমজী ইপিজেডের ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারের কারখানায় ঢুকলেই চোখে পড়ে কর্মব্যস্ততা। সারি সারি হ্যাঙ্গারে ঝুলছে বিদেশের বাজারে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা নানা ধরনের পোশাক। কারখানাটির বড় একটি অংশজুড়ে কাজ করছেন নারী শ্রমিকরা।
প্রায় তিন বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন সুরভী। কারখানার কর্মপরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট তিনি। সুরভী বলেন, "এখানে কাজের পরিবেশ ভালো। ছুটিও আমরা সঠিক সময়ে পাই।"
কারখানার আরেক কর্মী মোহাম্মদ বাইজিদ এইচএসসি পাস করে এখানে যোগ দিয়েছেন। তিনি ব্লেজার আয়রনের কাজ করেন। তার মূল বেতন ১৪ হাজার ৯০০ টাকা। তবে ওভারটাইমসহ মাসে প্রায় ২৩ হাজার টাকা আয় করেন বলে জানান তিনি।
তবে এই কারখানার কর্মীদের গল্প শুধু উৎপাদন লাইনে কাজ আর মাস শেষে বেতন পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এরই একটি উদাহরণ জান্নাতুল ফেরদৌস।
ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষায়ও সহায়তা করছে। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে কাজ করছেন। তাদের বেতনের পাশাপাশি বার্ষিক ইনক্রিমেন্টও দেওয়া হয়েছে।
উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারে রিসেপশনিস্ট হিসেবে চাকরি শুরু করেছিলেন জান্নাতুল। চাকরির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সহায়তায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান তিনি। পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন।
পড়াশোনা শেষ করে গত মাসে আবারও নিজের পুরোনো কর্মস্থলে ফিরেছেন তিনি। তবে এবার আর রিসেপশনিস্ট হিসেবে নয়; যোগ দিয়েছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্চেন্ডাইজার হিসেবে।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, "এই পাঁচ বছর প্রতিষ্ঠান আমাকে বেতন-ভাতা, প্রমোশন—সবই দিয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে পাঁচ বছর পর গত মাসে আবার এখানে যোগ দিয়েছি। এবার আর রিসেপশনিস্ট হিসেবে নয়, অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কাজ করছি।"
একসময় যে প্রতিষ্ঠানে তিনি রিসেপশনে বসে কাজ করতেন, সেখানেই এখন পোশাকের অর্ডার, ক্রেতা ও উৎপাদনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।
লিড গোল্ড সনদ, রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য প্রতিষ্ঠানটি ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) লিড গোল্ড সনদ পেয়েছে। কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিল্লাল হোসেন বলেন, আদমজী ইপিজেডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি সেবা পাওয়া কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা। পাশাপাশি ইপিজেড কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থাও বিনিয়োগকারীদের জন্য সহায়ক।
