৩ মিনিটের যে ব্যায়াম ৯০ মিনিটের ওয়ার্কআউটের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে
মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যায়াম শরীরের ওপর মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, অল্প সময়ের কঠোর ব্যায়াম শরীরে এমন কিছু জৈবিক পরিবর্তন ঘটায়, যা দীর্ঘ সময়ের ব্যায়ামের পরও খুব কম দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের 'রকফেলার ইউনিভার্সিটি'র বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, মাত্র তিন মিনিটের তীব্র গতির দৌড় (স্প্রিন্ট) রক্তপ্রবাহে এতটাই আণবিক পরিবর্তন ঘটায়, যা ৯০ মিনিটের মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামের চেয়েও অনেক বেশি।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নিউজউইকে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিভিন্ন মাত্রার ব্যায়ামের ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার তুলনা করা হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একদলকে ৩০ সেকেন্ড করে মোট ছয়টি 'অল-আউট' স্প্রিন্ট (সর্বোচ্চ শক্তিতে দৌড়) সম্পন্ন করতে বলা হয়। অন্যদিকে, আরেকদল ৯০ মিনিট ধরে মাঝারি গতিতে সাইক্লিং বা ট্রেডমিলে দৌড়ান।
গবেষণার প্রধান ও রকফেলার ইউনিভার্সিটির অ্যালবার্ট রেসনিক অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. পল কোহেন বলেন, 'রক্তে থাকা বিপুল পরিমাণ প্রোটিন, মেটাবোলাইট ও লিপিড পরিমাপ করে বিভিন্ন ধরনের ব্যায়ামের আলাদা আলাদা প্রভাব পরীক্ষা করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। ফলাফলে আমরা দেখেছি, ব্যায়ামের ধরনের ওপর ভিত্তি করে শরীরে সত্যি স্পষ্ট ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।'
গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ৩ মিনিটের দ্রুতগতির দৌড় শেষ করার পরপরই অংশগ্রহণকারীদের রক্তের পরিমাপকৃত প্রোটিনের প্রায় ২৫ শতাংশ পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে, টানা ৯০ মিনিট সাইকেল চালানোর পর রক্তের প্রোটিনে পরিবর্তনের হার ছিল শতাংশের চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। ট্রেডমিলে মাঝারি গতির দৌড় সাইক্লিংয়ের চেয়ে কিছুটা ভালো প্রভাব ফেললেও, ৩ মিনিটের স্প্রিন্টের তুলনায় তা ছিল অনেক কম।
স্প্রিন্টিংয়ের ফলে শরীরে যা ঘটে
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্বল্প সময়ের স্প্রিন্টিংয়ের ফলে রক্তে ২০০টিরও বেশি মেটাবোলাইটে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। একইসঙ্গে রক্তনালীর বৃদ্ধি, টিস্যু পুনর্গঠন এবং হরমোন সিগন্যালিংয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রোটিনগুলোর মাত্রা একলাফে বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা জানান, এই প্রোটিনগুলো 'এক্টোডোমেইন শেডিং' প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তে মিশে যায়। অর্থাৎ শরীর নতুন করে প্রোটিন তৈরি করার বদলে, কোষের উপরিভাগে আগেই জমা থাকা প্রোটিনের অংশগুলোকে দ্রুত রক্তসংবহনে ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু রক্তে নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শরীরের চর্বি কোষেও। স্প্রিন্ট দেওয়া ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে আসা চর্বি কোষগুলোর জিনের কার্যকলাপেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে; যা কোষের জ্বালানি পোড়ানোর প্রক্রিয়া, হরমোনের সাড়াদান এবং পুষ্টি গ্রহণের ক্ষমতাকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
এক বিবৃতিতে ড. পল কোহেন বলেন, 'সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাত্র কয়েক মিনিটের দ্রুত গতির শরীরচর্চাও শরীরে এতটা শক্তিশালী আণবিক সাড়া জাগাতে পারে। টানা আট সপ্তাহ অনুশীলনের পরও আমরা শরীরে এই প্রভাব বজায় থাকতে দেখেছি। এর মানে হলো, এটি নতুন কোনো চাপের কারণে শরীরের সাময়িক লড়াই নয়, বরং কঠোর ব্যায়ামের নিজস্ব এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।'
অন্যদিকে, মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামে এর তুলনায় অনেক কম প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গবেষকরা দেখেছেন, সাইক্লিং শেষ করার প্রায় তিন ঘণ্টা পর রক্তে ফ্যাটি অ্যাসিড ও লিভার থেকে নিঃসৃত প্রোটিনের উপস্থিতি দেখা যায়, আর চর্বি কোষের জিনের কার্যকলাপেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও বার্ধক্য জয়ের সম্ভাবনা
গবেষক দলটি 'ইউকে বায়োব্যাংক'-এ থাকা ৫৩ হাজারের বেশি মানুষের স্বাস্থ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, মাত্র তিনি মিনিটের স্প্রিন্টের ফলে পরিবর্তিত প্রোটিনগুলোর সঙ্গে হৃদরোগ ও মেটাবলিক ব্যাধির ঝুঁকি কমার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
এসব জটিল রোগের ঝুঁকি কমানোর সাথে যুক্ত ৩৩টি প্রোটিনের মধ্যে ৩২টি প্রোটিনই স্প্রিন্ট বা তীব্র দৌড়ের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে। অন্যদিকে মাঝারি ব্যায়ামে পরিবর্তিত হয়েছে মাত্র তিনটি প্রোটিন। এছাড়া, এসব প্রোটিনের চার ভাগের এক ভাগের বেশি উপাদান মানুষের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ধীরগতি করার সঙ্গে যুক্ত।
তবে ড. কোহেন মনে করেন, দীর্ঘক্ষণ অলস বসে থাকার চেয়ে যেকোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রমই ভালো। তাই সুস্থ থাকতে বিভিন্ন ধরনের ব্যায়ামের সমন্বয় করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
