সুন্দরবনের বাঘের দেহে মিলল অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া: গবেষণা
বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু (অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স-এএমআর) এখন নীরব মহামারির অন্যতম বড় হুমকি। এতদিন এই সংকটকে মূলত হাসপাতাল, মানুষের চিকিৎসা কিংবা গবাদিপশুর খামারের সমস্যা হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু বাংলাদেশের সুন্দরবনে পরিচালিত একটি নতুন গবেষণা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম একক ম্যানগ্রোভ বন এবং বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম শেষ আশ্রয়স্থল সুন্দরবনের বাঘসহ একাধিক বন্যপ্রাণীর শরীরে মাল্টি-ড্রাগ-প্রতিরোধী (এমডিআর) ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে।
বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের সুন্দরবন টাইগার কনজারভেশন প্রজেক্টের (এসটিসিপি) আওতায় পরিচালিত এক বিস্তৃত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীতে অণুবীক্ষণিক পদ্ধতিতে এমডিআর ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়েছে। এই ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, মানুষ, গবাদিপশু ও পরিবেশের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার এখন সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীতেও পৌঁছে থাকতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে 'প্যারাসাইটিক ইনফেকশন, আদার কমিউনিকেবল ডিজিজেস উইথ দেয়ার কজাল এজেন্টস অ্যান্ড এক্সটেন্ট ইন সুন্দরবনস টাইগার্স' শীর্ষক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। ২০২৫ সালে সম্পন্ন হওয়া এই গবেষণা পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সোডেভ কনসাল্ট ইন্টারন্যাশনাল ও পাইওনিয়ার কনসালট্যান্টস লিমিটেড। কারিগরি সহায়তা দেয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং থাইল্যান্ডের কাসেটসার্ট বিশ্ববিদ্যালয়।
বন বিভাগের তথ্য মতে, গত এক শতকে বিশ্বজুড়ে বাঘ তাদের ঐতিহাসিক আবাসস্থলের প্রায় ৯৩ শতাংশ হারিয়েছে। বর্তমানে মাত্র দশটি দেশে ছয় হাজারেরও কম বাঘ টিকে আছে। সেই প্রেক্ষাপটে সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল। বাংলাদেশের অংশে প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বনভূমিতে সর্বশেষ জরিপ মতে ১২৫ টি বাঘ টিকে আছে।
সুন্দরবন টাইগার কনজারভেশন প্রজেক্টের (এসটিসিপি) প্রকল্প পরিচালক ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, 'শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি সংক্রামক রোগ এখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বনসংলগ্ন এলাকায় বসতি সম্প্রসারণ, কৃষি ও গবাদিপশু পালনের বিস্তারের ফলে মানুষ, গৃহপালিত প্রাণী এবং বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংস্পর্শ বাড়ছে। এর ফলে নতুন রোগ এবং ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এতদিন সুন্দরবনের বাঘের রোগ, পরজীবী কিংবা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ নিয়ে প্রায় কোনো বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য ছিল না। সেই তথ্যঘাটতি পূরণ করতেই এসটিসিপির আওতায় এই গবেষণা হাতে নেওয়া হয়।'
তিনি জানান, গবেষণাটি ছিল সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য নিয়ে এ পর্যন্ত পরিচালিত সবচেয়ে বিস্তৃত জরিপগুলোর একটি। গবেষকরা সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে এলোমেলোভাবে নির্বাচিত ৬৫টি স্থান থেকে বেঙ্গল টাইগার ও বাঘের খাবার চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর এবং রেসাস বানরের মল সংগ্রহ করেন। একই সঙ্গে সুন্দরবন-সংলগ্ন আটটি গ্রামের পোষা কুকুরের রক্তের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়, যাতে বন্যপ্রাণী ও গৃহপালিত প্রাণীর মধ্যে রোগ সংক্রমণের সম্ভাব্য সম্পর্ক মূল্যায়ন করা যায়। মোট ৩৯৯টি নমুনা প্রথমে সেডিমেন্টেশন ও ফ্লোটেশন পদ্ধতিতে পরজীবী সংক্রমণের জন্য পরীক্ষা করা হয়। এরপর ৫২টি উপযুক্ত মল-নমুনা ব্যাকটেরিয়া শনাক্তের জন্য কালচার এবং পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) প্রযুক্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়। সব পরীক্ষাই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারাসাইটোলজি ও মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরি এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরিতে সম্পন্ন হয়।
পরজীবী সংক্রমণে সবচেয়ে এগিয়ে বাঘ
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরজীবী সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি বেঙ্গল টাইগারের মধ্যে (৮৫.৩ শতাংশ)। অর্থাৎ পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত প্রতি ১০টি বাঘের মধ্যে প্রায় ৯টিতেই কোনো না কোনো পরজীবীর উপস্থিতি মিলেছে। এরপর রয়েছে রেসাস বানর (৮৪.৯ শতাংশ), চিত্রা হরিণ (৭৩.৬ শতাংশ) এবং বন্য শূকর (৬৬.৭ শতাংশ)। মলিকুলার পরীক্ষায় টক্সোকারা ক্যাটি, টক্সোকারা লিওনিনা, একিনোকোকাস গ্র্যানুলোসাস, ওপিস্থোরচিস বা ক্লোনোরচিস, স্পাইরোমেট্রা এবং স্ট্রংগিলয়েডিস জাতীয় পরজীবী শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণায় আরও বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে মেটাজেনোমিক বা পরিবেশগত ডিএনএ বিশ্লেষণে। সেখানে বাঘ, হরিণ, বানর ও বন্য শূকরের নমুনা থেকে মোট ১৬ প্রজাতির পরজীবী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ক্লোনোরচিস সাইনেনসিস নামের লিভার ফ্লুক সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। সামগ্রিকভাবে এই পরজীবীর উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮৩ শতাংশ, আর শুধু বাঘের নমুনায়ই ছিল ৮৩.২ শতাংশ।
গবেষকদের ভাষায়, বাঘের নমুনায় শনাক্ত হওয়া মোট জিনগত উপাদানের প্রায় ৮২ শতাংশই পরজীবী সংশ্লিষ্ট, যা প্রাণীটির উচ্চ সংক্রমণ হারকে আরও শক্তভাবে সমর্থন করে। এছাড়া ফ্যাসিওলোপসিস বাসকি , ডিপিলিডিয়াম ক্যানিনাম এবং টক্সোকারা ক্যাটি—এই তিনটি পরজীবী শুধু বাঘের নমুনাতেই পাওয়া গেছে; অন্য কোনো প্রাণীর নমুনায় এগুলো শনাক্ত হয়নি।
গবেষণায় চার ধরনের ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত
পরজীবী সংক্রমণের চিত্রের পাশাপাশি গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর শরীরে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি এবং সেগুলোর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ধরন বিশ্লেষণ।
কালচার ও পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা চার ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেছেন। এগুলো হলো—এশেরিকিয়া কোলাই বা ই. কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া, এন্টারোকক্কাস ফিকালিস এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস। ম্যাল-বি, ডিডিএল, আরসিএস-এ এবং এনইউসি—এই চারটি নির্দিষ্ট জিনকে লক্ষ্য করে পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়াগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ৫২টি মল-নমুনার মধ্যে ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে, যার উপস্থিতির হার ৮০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে ই. কোলাই (৭৬.৯২ শতাংশ), এন্টারোকক্কাস ফিকালিস (৭৫ শতাংশ) এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস (৫৭.৬৯ শতাংশ)।
প্রজাতিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেঙ্গল টাইগারের ২২টি নমুনার মধ্যে ২০টিতে ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া, ১৯টিতে ই. কোলাই, ১৭টিতে এন্টারোকক্কাস ফিকালিস এবং ১৩টিতে স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত প্রায় প্রতিটি বাঘের নমুনাতেই অন্তত একটি রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একই ধরনের ব্যাকটেরিয়া হরিণ, রেসাস বানর ও বন্য শূকরের নমুনাতেও বিভিন্ন মাত্রায় শনাক্ত হয়েছে।
'শেষ ভরসার' অ্যান্টিবায়োটিকেও প্রতিরোধ
গবেষকরা শুধু ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেই থেমে থাকেননি। এর পরের ধাপে তারা জানতে চেয়েছেন, এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো এখনও কার্যকর কি না।
এ জন্য ডিস্ক ডিফিউশন পদ্ধতিতে ই. কোলাই ও ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার ওপর বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত বিশেষ ডিস্কের চারপাশে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করে নির্ধারণ করা হয়, ব্যাকটেরিয়াটি ওষুধটির প্রতি সেনসিটিভ, ইন্টারমিডিয়েট নাকি রেজিস্ট্যান্ট। তবে ফলাফল গবেষকদেরও উদ্বিগ্ন করেছে।
ই. কোলাই: অ্যাম্পিসিলিনে শতভাগ প্রতিরোধ
ই. কোলাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ফল এসেছে অ্যাম্পিসিলিন নিয়ে। পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো আইসোলেটই—অর্থাৎ ১০০ শতাংশ—এই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ প্রতিরোধী ছিল। অর্থাৎ এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর বিরুদ্ধে অ্যাম্পিসিলিন কার্যকর নয়।
এ ছাড়া অ্যামোক্সিসিলিন-ক্লাভুল্যানেটে ২০ শতাংশ, নালিডিক্সিক অ্যাসিডে ১৬ শতাংশ, সিপ্রোফ্লক্সাসিনে ১২ শতাংশ এবং সেফট্রায়াক্সোন ও জেন্টামাইসিনে ৮ শতাংশ করে প্রতিরোধ লক্ষ্য করা গেছে।
তবে গবেষণায় কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। সবগুলো ই. কোলাই ক্লোরামফেনিকল ও নাইট্রোফিউরানটোইনের প্রতি সম্পূর্ণ সংবেদনশীল ছিল। এছাড়া অধিকাংশ নমুনাই সেফট্রায়াক্সোন (৯২ শতাংশ), জেন্টামাইসিন ও টেট্রাসাইক্লিন (৮৮ শতাংশ), অ্যামোক্সিসিলিন-ক্লাভুল্যানেট (৮০ শতাংশ) এবং সিপ্রোফ্লক্সাসিনের (৭৬ শতাংশ) প্রতিও সংবেদনশীল ছিল।
তবে গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ২৫টি ই. কোলাই আইসোলেটের মধ্যে ৫টি, অর্থাৎ ২০ শতাংশ, একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী বা মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া নিয়ে আরও উদ্বেগজনক চিত্র
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার ফলাফল। কারণ এই ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুতর সংক্রমণের সময় 'শেষ ভরসা' হিসেবে ব্যবহৃত কিছু শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ দেখা গেছে।
গবেষণায় দেখা যায়— ইমিপেনেমে ৫০ শতাংশ, মেরোপেনেমে ৪০ শতাংশ, সেফোট্যাক্সিমে ৪০ শতাংশ, লেভোফ্লক্সাসিনে ৪০ শতাংশ, টেট্রাসাইক্লিনে ৪০ শতাংশ, এবং সিপ্রোফ্লক্সাসিনে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে প্রতি ১০টি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে সাতটিই সংশ্লিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী।
তবে ক্লোরামফেনিকল (৯৫ শতাংশ), সেফট্রায়াক্সোন (৮০ শতাংশ), জেন্টামাইসিন (৭৫ শতাংশ), অ্যামিকাসিন ও টোব্রামাইসিন (৭০ শতাংশ করে) এখনও তুলনামূলকভাবে কার্যকর রয়েছে।
বাঘ থেকে বানর—সবখানেই মাল্টিড্রাগ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া
গবেষণায় প্রাণীভেদে মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার হারও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে বাঘের নমুনায়—প্রায় ৩০ শতাংশ। কিন্তু হরিণে এই হার ৩৭.৫ শতাংশ, বন্য শূকরে ৪১.৬৭ শতাংশ, আর রেসাস বানরে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ।
অর্থাৎ পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত প্রতি দুইটি বানরের মধ্যে একটি পর্যন্ত মাল্টিড্রাগ-প্রতিরোধী ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া বহন করছে।
কেন বন্যপ্রাণীর দেহে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স
গবেষণার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীতে পাওয়া মাল্টিড্রাগ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার ধরন অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল পরিবেশে দেখা প্রতিরোধ-প্যাটার্নের সঙ্গে মিল রয়েছে।
প্রতিবেদনে গবেষকরা লিখেছেন, এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে বন্যপ্রাণী মানুষ ও গবাদিপশুর অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সম্ভাব্য 'রিজার্ভয়ার' বা প্রাকৃতিক আধার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের ব্যাখ্যায়, হাসপাতাল ও মানববসতির বর্জ্যপানি, কৃষিজমি থেকে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আসা দূষণ, গবাদিপশু খামারের বর্জ্য এবং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু ও তাদের প্রতিরোধ-জিন নদী ও জলাভূমির মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর শরীরে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে মানুষ, গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে প্রতিরোধী জীবাণুর একটি জটিল সংক্রমণচক্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে প্রতিবেদনে এ-ও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, গবেষণাটি এই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সম্ভাব্য পরিবেশগত উৎসের ব্যাখ্যা দিয়েছে; নির্দিষ্ট কোনো উৎসকে সরাসরি প্রমাণ করেনি।
আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গেও মিল
গবেষণার ফলাফলকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পোল্যান্ডের বন্য মাংসাশী প্রাণীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় ৫৩টি ই. কোলাই আইসোলেটের মধ্যে ৭৭.৮ শতাংশ মাল্টিড্রাগ-প্রতিরোধী ছিল এবং সবগুলোই অ্যাম্পিসিলিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী পাওয়া যায়।
সুন্দরবনের গবেষণায়ও ই. কোলাইয়ের ক্ষেত্রে অ্যাম্পিসিলিনের বিরুদ্ধে শতভাগ প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এই মিল ইঙ্গিত দেয় যে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ এখন শুধু হাসপাতাল বা খামারের সমস্যা নয়; এটি বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রেও বিস্তার লাভ করছে।
বাঘে ভাইরাস নেই, কুকুরে মিলল সংস্পর্শের প্রমাণ
অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উদ্বেগজনক উপস্থিতির পাশাপাশি গবেষণায় সুন্দরবনের বাঘের মধ্যে ভাইরাসজনিত সংক্রমণের বিষয়টিও পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে একটি ইতিবাচক এবং একটি সতর্কবার্তা—দুই ধরনের ফলই উঠে এসেছে।
গবেষকরা ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস (সিডিভি) শনাক্তের জন্য বাঘের মল-নমুনা পরীক্ষা করেন। ফলাফলে পরীক্ষিত কোনো নমুনায় সক্রিয় ভাইরাল সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ গবেষণার সময় পরীক্ষিত বাঘের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিডিভির সক্রিয় সংক্রমণ ছিল না।
তবে সুন্দরবন-সংলগ্ন আটটি গ্রামের ৪৮টি পোষা কুকুরের রক্ত পরীক্ষায় ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। এর মধ্যে ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কুকুরের দেহে সিডিভি-নির্দিষ্ট আইজিজি অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এসব কুকুর জীবনের কোনো এক সময়ে ভাইরাসটির সংস্পর্শে এসেছিল এবং তাদের শরীরে সেই সংক্রমণের প্রতিরোধ-স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে।
গবেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্য মাংসাশী প্রাণীর মধ্যে ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের অবাধে চলাফেরা করা পোষা বা আধা-পোষা কুকুর। ফলে বর্তমানে বাঘের মধ্যে সক্রিয় সংক্রমণ না থাকলেও বনসংলগ্ন কুকুরগুলো ভবিষ্যতে সুন্দরবনের বাঘসহ অন্যান্য মাংসাশী বন্যপ্রাণীর জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
বনসংলগ্ন মানুষের জীবনযাত্রায় ঝুঁকির ইঙ্গিত
গবেষণাটি শুধু বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষ, গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণীর পারস্পরিক সংযোগ বোঝার জন্য সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার ১২২ জন বাসিন্দার ওপর একটি সামাজিক জরিপও পরিচালনা করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের বসতবাড়ি থেকে বনের গড় দূরত্ব ৪৫০ মিটার হলেও মধ্যক দূরত্ব মাত্র ১০০ মিটার। অর্থাৎ তারা বনসীমার একেবারে কাছাকাছি বসবাস করে। ফলে মানুষ, গবাদিপশু, পোষা কুকুর এবং বন্যপ্রাণীর মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শের সুযোগ অনেক বেশি।
জরিপে আরও দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের মাত্র ৩৯ শতাংশ নিয়মিত গবাদিপশুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ান। বাকি ৬১ শতাংশ এমন কোনো নিয়মিত ব্যবস্থা অনুসরণ করেন না।
গবেষকদের মতে, গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এই ঘাটতি পরজীবী ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি মানুষ, গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে রোগজীবাণু আদান-প্রদানের ঝুঁকিও বাড়ায়।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত বন্যপ্রাণী দেখতে পান। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় রেসাস বানর। এরপর রয়েছে বাঘ, চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর, কুমির ও সাপ।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন, বন্যপ্রাণীর মল, মূত্র কিংবা অন্যান্য জৈববর্জ্যে বিভিন্ন জুনোটিক (প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমণযোগ্য) জীবাণু থাকতে পারে। এগুলো পরিবেশের মাধ্যমে গবাদিপশু, পোষা প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষকদের সুপারিশ: 'ওয়ান হেলথ' ছাড়া বিকল্প নেই
গবেষণার শেষে মোট ১৪টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো হলো—
১. সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় পোষা কুকুরের জন্য ক্যানাইন ডিসটেম্পার ও জলাতঙ্কের গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা।
২. বনাঞ্চলে পোষা প্রাণী নিয়ে প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
৩. শিকার হওয়া প্রাণীর মৃতদেহ ও অবশিষ্টাংশ নিরাপদভাবে অপসারণের জন্য জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা।
৪. প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বনসংলগ্ন এলাকার গবাদিপশুর নিয়মিত কৃমিনাশক কর্মসূচি চালু করা।
৫. সুন্দরবনে বন্যপ্রাণীর রোগ শনাক্তের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ওয়াইল্ডলাইফ ডিজিজ ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে বন অধিদপ্তর বা জাতীয় পর্যায়ে এ ধরনের কোনো রেফারেন্স ল্যাবরেটরি নেই।
৬. সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে পশুচিকিৎসক ও ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজিস্ট নিয়োগ করা।
৭. খুলনা বিভাগে চিকিৎসক, অণুজীববিজ্ঞানী, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, পশুচিকিৎসক, বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী ও বাস্তুতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি ওয়ান হেলথ র্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করা।
৮. বাঘ, গবাদিপশু ও পোষা কুকুরের স্বাস্থ্যতথ্য নিয়ে সমন্বিত আঞ্চলিক ডেটাবেস তৈরি করা।
