জ্বালানির দাম ও ইরান নীতি নিয়ে ট্রাম্প–ভ্যান্সের প্রকাশ্য মতপার্থক্য
ইরান নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম সামলানো কেন্দ্র করে— দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকাশ্য বিভাজন দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ নিয়ে এই অবস্থানগত পার্থক্য, রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি 'ফক্স নিউজ'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান সংকটে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান বা এক নম্বর লক্ষ্য হলো মার্কিন নাগরিকদের জন্য তেল ও গ্যাসের দাম কম রাখা। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে—সেটি এই প্রশাসনের দ্বিতীয় লক্ষ্য।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্টের এই ধারাবাহিকতার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ট্রাম্প লেখেন, "ইরান যাতে কোনোভাবেই, কোনো রূপেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে—সেটাই আমাদের এক নম্বর লক্ষ্য ছিল এবং সবসময় থাকবে।"
ট্রাম্প ও ভ্যান্সের মধ্যকার এই প্রকাশ্যে ভিন্নমত শুধু জ্বালানির দাম কিংবা ইরান নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাদের দুজনের এবং সার্বিকভাবে রিপাবলিকান পার্টির জন্য বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
মূল্যস্ফীতি ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ
বিভিন্ন জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। বর্তমানে মার্কিন বাজারে তেলের দাম বেশ চড়া।
জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা 'গ্যাসবাডি'-র পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষণ প্রধান প্যাট্রিক দে হান গত সোমবার জানান, যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পর্যায়ে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম এক সপ্তাহে প্রায় আট সেন্ট বেড়ে ৪.০২ ডলারে পৌঁছেছে। চলতি বছর এনিয়ে তৃতীয়বারের মতো তেলের দাম চার ডলারের সীমা অতিক্রম করল। অন্যদিকে, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের দাম একই সময়ে গ্যালনপ্রতি ১৪.৩ সেন্ট বেড়ে ৫.৪২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণত ক্ষমতায় থাকা দলকেই দোষারোপ করে থাকেন মার্কিন ভোটাররা। ফলে জ্বালানির এই আকাশচুম্বী দামের কারণে দেশজুড়ে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রবল চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। গত এক মাসে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক শঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তেলের দামের বিষয়টি ভোটারদের মনে এমনভাবে গেঁথে যাচ্ছে যে, ভোটের আগে দাম কিছুটা কমলেও—ভোটারদের মানসিকতায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা উত্তেজনার দ্রুত সমাপ্তির লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক র্যাচেল চেসনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প সম্প্রতি ওমানে বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়েছেন—অথচ দেশটি হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতামূলক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের সাফাই
ট্রাম্প ও ভ্যান্সের বক্তব্যের মধ্যে নীতিগত কোনো দূরত্ব রয়েছে—এমন দাবি অবশ্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, "প্রশাসন ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই পরিষ্কার করে বলেছেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। যে হুমকি সম্পর্কে বিগত ৪৭ বছর ধরে রাজনীতিকরা শুধু কথাই বলেছেন কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেননি, সেই হুমকি নির্মূলে প্রেসিডেন্ট যখন কাজ করছেন, তখন পুরো প্রশাসন তাঁর পেছনে রয়েছে। সন্ত্রাসবাদী একটি শাসকগোষ্ঠীর থেকে আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের এজেন্ডা এগিয়ে নিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স দুর্দান্ত কাজ করছেন।"
এর আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটকেও ভ্যান্সের বক্তব্য প্রসঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল, যেখানে ভ্যান্স তেলের দাম কমানোকে প্রথম এবং ইরানকে পরমাণুমুক্ত করাকে দ্বিতীয় লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক নম্বর লক্ষ্যের কথা ঘোষণা দেওয়ার কয়েক দিন আগে ক্যারোলিন লেভিট দাবি করেছিলেন, "প্রেসিডেন্টের কাছে দুটি লক্ষ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ।"
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প ও ভ্যান্সের সম্পর্কের টানাপোড়েন বা মতপার্থক্য নিয়ে তৈরি হওয়া—এই প্রশ্ন এড়ানোর চেষ্টা করছেন ভ্যান্স ও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ফক্স নিউজের সাংবাদিক লরা ইনগ্রাহাম ভ্যান্সকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, "ইরান ইস্যুতে আপনার ও ট্রাম্পের অবস্থানের মাঝে কি কোনো ফাঁক বা দূরত্ব রয়েছে?"
উত্তরে ভ্যান্স বলেন, "না, একেবারেই না। দেখুন, প্রেসিডেন্ট নিজেই সব সিদ্ধান্ত নেন এবং আমরা সবাই প্রেসিডেন্টের ইচ্ছে অনুযায়ী সেই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। তিনি নির্দেশ দেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আমাদের মধ্যে অবশ্যই বিতর্ক ও আলোচনা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই মিশন বাস্তবায়নে আমাদের পুরো প্রশাসন ঐক্যবদ্ধ থাকে।"
ভ্যান্সের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই মতপার্থক্য কেবল জ্বালানির দাম বা ইরান নীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈদেশিক যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের দীর্ঘদিনের সমালোচক হিসেবে পরিচিত জেডি ভ্যান্স সবসময় চেষ্টা করেছেন ট্রাম্পের ক্ষোভের শিকার না হতে। কারণ মার্কিন ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে ভাইস প্রেসিডেন্টদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার অতীতে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই সঙ্গে এর পেছনে রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সমীকরণও জড়িত। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন ট্রাম্প বর্তমানে একজন 'লেম ডাক' প্রেসিডেন্ট, অর্থাৎ নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাদা করে ভাবার সুযোগ তাঁর কম; কেবল নিজের রাজনৈতিক অবদান বা 'লিগ্যাসি' রক্ষাই তাঁর মূল চিন্তা।
তবে ৪২ বছর বয়সী জেডি ভ্যান্সের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই দেখা হয়।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক নাথালি অ্যালিসন এবং আইজ্যাক আরনসডর্ফের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে আলোচনার সময় দাতাদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমাদের জেডিকে নির্বাচিত করতে হবে।"
যদিও ট্রাম্পের উপদেষ্টারা পরে জানান, এই মন্তব্যের মানে এই নয় যে ভ্যান্সই ট্রাম্পের একমাত্র পছন্দ। কারণ ট্রাম্প পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভ্যান্সের মধ্যে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতাকেও উৎসাহিত করছেন।
তবে এতে স্পষ্ট যে, বর্তমান প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদের দ্বিতীয়ার্ধে পা দেওয়ার আগেই ভ্যান্সের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি মার্কিন রাজনীতিতে বড় জায়গা করে নিয়েছে। আর তাই ভ্যান্সকে একদিকে ট্রাম্পের প্রতি বিশ্বস্ত ও অনুগত থাকতে হচ্ছে, অন্যদিকে এমন কোনো নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি জড়িয়ে নেওয়া থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
