‘সম্পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ইরানের, দিল সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে কয়েক সপ্তাহের আলটিমেটাম
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সোমবার রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার জন্য চলমান আলোচনা থমকে যাওয়ায় ইরান সামরিক ক্ষেত্রে 'পুরোপুরি আক্রমণাত্মক' অবস্থান গ্রহণ করবে। একই সময়ে ওয়াশিংটন অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
শান্তি আলোচনা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল পুনরায় শুরুর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি পুরোপুরি থেমে গেছে। এর ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের ওই কর্মকর্তা বলেন, 'ইরানি সংস্থাগুলোকে হরমুজ প্রণালি ও এর বিস্তৃত অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ইরান প্রস্তুত থাকবে।' তিনি আরও বলেন, কূটনীতি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ভেঙে দিতে তেহরান 'সময়োপযোগী ও সুনির্দিষ্ট' সামরিক হামলা চালাবে।
যুদ্ধের অবসান ঘটাতে জুনে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে সোমবারের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল।
১৭ জুন স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে একটি বৃহত্তর চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
চুক্তিটিতে 'সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার' ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ যে সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো, সেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে চুক্তিটি দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে।
সোমবার সাংবাদিকরা জানতে চান, জুনের অস্থায়ী চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করছে কি না। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, না।
বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ
কূটনৈতিক তৎপরতার ক্ষেত্রে সামান্য আশার আলো হিসেবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ট্রাম্প ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনা শুরু করেছেন। যুদ্ধের সময় এই বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও অর্থনীতির বড় একটি অংশের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
দুটি সূত্রের বরাতে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যেসব সূত্রের এই বিষয়ে সরাসরি জ্ঞান রয়েছে, সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা এক ইরাকি কুর্দি নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদির কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়।
পরে ফক্স নিউজ জানায়, টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজেই ওই প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন উদ্বিগ্ন ছিল যে আলোচনার টেবিলের অপর প্রান্তে থাকা ইরানি আলোচকেরা আদৌ ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে কথা বলছেন কি না। এমন এক সময়ে এই উদ্বেগ তৈরি হয়, যখন রয়টার্স জানায় যে ওয়াহিদি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী এক ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াহিদি জবাবে জানিয়েছেন, তিনি ইরানি আলোচকদের অবস্থানের সঙ্গে একমত।
ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার সোমবার ফক্স নিউজ চ্যানেলের প্রধান বৈদেশিক সংবাদদাতা ট্রে ইংস্টের সঙ্গে পৃথক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমি এর বিস্তারিত বলতে পারছি না। তবে আমি বলব, যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং ইরান সরকারের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সব পর্যায়ে যে আলোচনা চলছে, তা সম্ভবত আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি বিস্তৃত।'
ওমানে বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্পের
ইরান বলেছে, সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম ধারায় তাদের হরমুজ প্রণালি পরিচালনার অধিকার দেওয়া হয়েছে। হরমুজ প্রণালির একটি অংশ ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমানের মধ্যে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমোদন না থাকা একটি পথ ব্যবহার করে যাওয়ার চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগে জাহাজগুলোতে গুলি চালানো শুরু করার পর আবার হামলা শুরু হয়। এরপর ৭ জুলাই ট্রাম্প বলেন, চুক্তিটি 'শেষ হয়ে গেছে।'
ইরানের ওই কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, পরবর্তী আলোচনা শুরুর পূর্বশর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের সব শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে।
যুদ্ধের মধ্যেও ইরান নিজেদের দৃঢ়তা দেখানোর চেষ্টা করছে। তবে তিনজন ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, দেশটির নেতারা আশঙ্কা করছেন—আরও অর্থনৈতিক শাস্তির হুমকি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে পারে, নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বৈধতা আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
ইরান যখন যুদ্ধে জড়ায়, তখনই দেশটিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল হয়ে পড়া মুদ্রা, জ্বালানি সংকট, নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনীতির গভীরে থাকা নানা কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, ব্যাহত বাণিজ্য, উৎপাদন হ্রাস এবং পুনর্গঠনের বিপুল ব্যয়।
ইরান একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলাদাভাবে একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছে এবং দেশটি বলেছে, এ বিষয়ে তারা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
ওমানের সঙ্গে চলমান ওই আলোচনার জবাবে ট্রাম্প উপসাগরীয় দেশটির বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছেন। ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদার।
ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, 'ওমান যদি পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলা চালাব।'
এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের মানুষ।
ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে।
শুক্রবার একটি সমাবেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম আরও বেশি সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে এবং তাদের এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
যুদ্ধের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ মূল্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২৬ ডলারে পৌঁছেছিল, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি।
সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২ ডলারের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯০ দশমিক ৮৭ ডলারে স্থির হয়েছে।
অটোমোটিভ গ্রুপ 'এএএ'-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি পেট্রোলের দাম ৩ ডলারের নিচে ছিল, যা এখন বেড়ে ৪ ডলার ছাড়িয়েছে। আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনে আমেরিকানদের ভোটাভুটিতে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
