শিল্পের জন্য গ্যাস বাঁচাতে সিএনজিতে রেশনিং, তেল-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত সরকারের
চলমান গ্যাস সংকটে কল-কারখানায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। তাই শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সিএনজি স্টেশনগুলোতে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহের (রেশনিং) সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দ্বিমুখী কৌশলের অংশ হিসেবে সরকার ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। এর মাধ্যমে এসব কেন্দ্র থেকে অতিরিক্ত ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা কারখানাগুলোর ব্যবহারের জন্য দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট (৫০০ এমএমসিএফটি) গ্যাস সাশ্রয় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া, ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে সিএনজি ট্রাকে করে ঢাকায় গ্যাস পরিবহনের জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
জ্বালানি বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা টিবিএস-কে জানান, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রায় প্রতিদিনই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পর্যালোচনাসহ সংকট মোকাবিলায় নানা দিক-নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মুনির চৌধুরী নিশ্চিত করেন যে, জ্বালানি মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনাগুলো গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়নে কাজ করছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশে গ্যাস সরবরাহ কমে ২,১০০ এমএমসিএফডিতে নামলেও গতকাল মঙ্গলবার তা সামান্য বেড়ে ২,৪০০ এমএমসিএফডিতে উন্নীত হয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১,০০০ এমএমসিএফডি গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে, ক্যাপটিভ জেনারেটরে দেওয়া হচ্ছে ৫০০ এমএমসিএফডি এবং অবশিষ্ট গ্যাস শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে বণ্টন করা হচ্ছে।
নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহ, ভোলা থেকে সিএনজি পরিবহন
গত ১ আগস্ট বেসরকারিখাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ব্যবসায়ীদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী দু'টি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বলে ওই সভার 'নোট অব ডিসকাসন' থেকে জানা গেছে।
ওই নোটে বলা হয়েছে, ''গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সিএনজি গ্যাস-স্টেশন হতে শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গ্যাস সরবরাহ সময় (শিডিউল উইন্ডো) ভাগ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ভোলা গ্যাসফিল্ড থেকে উত্তোলনকৃত গ্যাস বেসরকারিখাতের উদ্যোক্তারা ট্রাকে পরিবহন করতে চাইলে তাদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।''
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার জন্য পাইপলাইন স্থাপনের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই পাইপলাইন স্থাপন করতে ৫০০ কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে এবং সময় লাগবে প্রায় দু'বছর। এই প্রেক্ষাপটে, শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ দ্রুত বাড়াতে ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রাকে গ্যাস পরিবহনের সুযোগ উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
কর্মকর্তারা আরও জানান, ভোলার গ্যাসক্ষেত্রে প্রাপ্ত গ্যাস সিএনজিতে রূপান্তর করে ট্রাকে এনে শিল্প কারখানায় ব্যবহার করার বিষয়ে বেসরকারিখাত থেকে এখনও কোন প্রস্তাব পাওয়া যায়নি।
ভোলার গ্যাস ট্রাকে ঢাকায় আনার ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ আছে কি-না, জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান টিবিএসকে বলেন, গত আওয়ামী লীগ ও অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ও ভোলার গ্যাস সিএনজিতে রূপান্তর করে সিলিন্ডারে রূপান্তর করে ঢাকায় আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। "তবে প্রস্তাবটি ব্যবসায়িকভাবে ভায়াবল (বাস্তবসম্মত) না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আগ্রহ দেখায়নি।"
সিএনজি পাম্পে গ্যাস রেশনিংয়ের প্রস্তাব
সিএনজি গ্যাস স্টেশনে রেশনিং করে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনা করছে জ্বালানি বিভাগ। পরিবহন খাতের চেয়ে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোকে সরকার প্রাধান্য দিচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
তবে সিএনজি রেশনিং ব্যবস্থা চালুর আগে বিষয়টি নিয়ে আরও ভাবতে হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ কমানো হলে বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরবরাহ বন্ধ করা হলে— তার প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, তা নিয়ে পর্যালোচনা করছে মন্ত্রণালয়।
সরবরাহ বাড়াতে ৮ হাজার কোটি টাকার বকেয়া মেটানোর উদ্যোগ
এদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সাশ্রয় করে শিল্পে সরবরাহ বাড়াতে— কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে পূর্ণোদ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে সরকারের ভর্তুকি বাড়লেও, গ্যাস সাশ্রয় করে শিল্প কারখানায় সরবরাহ বাড়াতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিজিএমইএ'র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, তারা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছেন যে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে প্রায় ৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সাশ্রয় হবে, যা শিল্পে সরবরাহ করলে গ্যাস সংকট অনেকটাই লাঘব হবে।
এই প্রস্তাবের আওতায় বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বকেয়ার মধ্যে ৮,০০০ কোটি টাকা পরিশোধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দেশে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর দৈনিক প্রায় ৬,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি ডেভিড হাসনাত টিবিএসকে বলেন, সরকারের কাছ থেকে ৬-৭ মাস ধরে বকেয়া বিল না পাওয়ার কারণে বেশিরভাগ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে।
টিবিএসকে তিনি বলেন, "ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের নিজ নিজ গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে। আমরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছি যেন ৪৫ দিনের বিল বকেয়া রেখে বাকি পাওনা পরিশোধ করা হয়। তাহলে আমরা ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু করতে পারব। সরকার আমাদের যে পরিমাণ টাকা দেবে, সে বিবেচনায় আমরা বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ন্যাশনাল গ্রিডে সরবরাহ করতে পারব।''
ডেভিড হাসনাত বলেন, ''আমরা যদি এখনকার চেয়ে ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাড়তি উৎপাদন করতে পারি, তাহলেও সরকারের প্রায় ৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সাশ্রয় হবে, যা শিল্পে সরবরাহ করা হলে গ্যাস সংকট লাঘব হবে। সরকার আমাদের বলছে যে, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে বিল দেওয়া হবে।''
