খাদ্য থেকে পরিবহন, নির্মাণ—সব খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের ধাক্কা; নিত্যপণ্যের দাম এখন আরো চড়া
শুক্রবার তিনটি দোকান ঘুরে অবশেষে মগবাজারে এক লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকায় পান গৃহিণী রেশমা আক্তার। কিন্তু তেলের চড়া দামে তিনি হতবাক হয়ে পড়েন।
'১৫-২০ দিন আগেও তেলের দাম ছিল ১৮০ টাকা। আপনারা ১৫ টাকা বাড়িয়ে দিলেন কেন?' দোকানদারকে প্রশ্ন করেন তিনি। বিক্রেতার জবাব ছিল, 'কোম্পানিকে জিজ্ঞেস করেন।'
শনিবার কারওয়ান বাজার থেকে ১৩০ টাকা দরে এক কেজি চিনি কেনেন বেসরকারি চাকরিজীবী আকরাম হোসেন। অথচ মাত্র তিন দিন আগেও একই দোকান থেকে তিনি এই চিনি কিনেছিলেন ১১০ টাকায়।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, 'গত ১৫ দিনে চাল ছাড়া বাকি সবকিছুর দাম ১০–১৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। আমার মোটরসাইকেলের তেলের খরচও বেড়েছে, কিন্তু বেতন তো বাড়েনি।'
কারওয়ান বাজারের দোকানি মো. রায়হান বলেন, পরিবেশকেরা এক দিনের ব্যবধানেই চিনির ৫০ কেজির বস্তার দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
'খুচরা বিক্রেতারা লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করবেন কীভাবে?' বলেন তিনি।
এলিফ্যান্ট রোড থেকে বাড্ডা যাওয়ার জন্য একজন সিএনজি অটোরিকশাচালক ৫০০ টাকা ভাড়া দাবি করলে অবাক হয়ে যান আরেক চাকরিজীবী রেজানুজ্জামান। স্বাভাবিক ভাড়া ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
ভাড়া বেশি চাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে চালক হারিছ মিয়া বলেন, 'গ্যাস সংকটের কারণে দিনে ছয়-সাত ঘণ্টার বেশি সিএনজি চালাতে পারছি না। লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না। এরপর দিনশেষে গাড়ির মালিককে ২ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পর আমার হাতে প্রায় কিছুই থাকে না। তাই বেশি ভাড়া চাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।'
ভোক্তাদের এসব অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত করছে এক বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটের দিকে: গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন আর শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা সরবরাহ চেইনের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ভোক্তাদের দৈনন্দিন জীবনেও পৌঁছে গেছে।
জুলাইয়ে শেষের দিকে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েক সপ্তাহ সেটির কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এতে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে; আর দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ব্যাহত হচ্ছে কারখানাগুলোর উৎপাদন, যার চূড়ান্ত ধাক্কা এসে পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।
নিত্যপণ্যের দাম এখন আরও চড়া
২৯ এপ্রিল প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮০ টাকা ও পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা প্রতি লিটার ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পাঁচ লিটারের বোতলের ক্ষেত্রেও সরবরাহ ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। পাম তেল লিটারপ্রতি ১৬৬ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ৪ টাকা বেশি।
তবে রিফাইনাররা বলছে, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ায়নি।
সিটি গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, গত এক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিনের দাম প্রায় ৬০–৭০ ডলার বেড়েছে। একই সময়ে জ্বালানি সংকটের কারণে পরিচালন ব্যয়ও ৫–১০ শতাংশ বেড়েছে।
'তারপরেও আমরা দাম বাড়াইনি। তবে লোকসানের কারণে কিছু কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে,' বলেন তিনি।
বর্তমানে খোলা আটা প্রতি কেজি ৪৫–৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর প্যাকেটজাত আটার দাম পড়ছে ৬৫–৭০ টাকা। খোলা ময়দার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫–৭০ টাকা ও প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৭৫–৮৫ টাকায় উঠেছে।
ধরনভেদে ডালের দাম কেজিতে ৫–১০ টাকা বেড়েছে। ব্র্যান্ডের ভিত্তিতে গুঁড়া দুধের দাম কেজিতে ২০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, কিছু কিছু গুঁড়া দুধ প্রায় ৯৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। গত দুই মাসে পোলাও চালের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে।
কারওয়ান বাজারের সালমান স্টোরের মালিক মো. আরিফুর রহমান সালমান বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তীর সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। 'চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য তেলও মিলছে না। পরিবেশকরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।'
খাদ্য ও নিত্যপণ্য সরবরাহকারী একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন নির্বাহী বলেন, প্রতি টন চিনির দাম প্রায় ৬০ ডলার ও গমের দাম ৬০–৭০ ডলার বেড়েছে।
লোডশেডিংয়ের ধাক্কা পোলট্রিতে
প্রায় ১৫ দিন আগেও ঢাকায় এক ডজন ডিম বিক্রি হতো ১৩০ টাকায়, যা এখন ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম প্রায় ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকা হয়েছে।
কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, খামারগুলোতে উৎপাদন ব্যয় ও মুরগির মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য হ্যাচারিগুলোতে ২১ দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
তিনি বলেন, 'তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আমাদের টানা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। কিন্তু ডিজেলের দাম একে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তুলেছে।'
মোশাররফ আরও বলেন, 'তীব্র গরম ও বিদ্যুতের অভাবে মুরগি মারা যাচ্ছে। জ্বালানি কিনে জেনারেটর চালিয়ে আমাদের পক্ষে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়।'
প্যাকেট ছোট হচ্ছে, বাড়ছে দাম
প্রায় এক মাস আগেও যে ৩০০ গ্রামের ভিম বার ৪০ টাকায় বিক্রি হতো, ওজন কমিয়ে ২৭৫ গ্রাম করার পরও সেটির দাম রাখা হচ্ছে ৪০ টাকা।
একইভাবে, প্রায় দুই মাস আগে ২০০ গ্রামের প্যারাসুট তেলের যে বোতলের দাম ছিল ২০০ টাকা, ম্যারিকো সেটির পরিমাণ কমিয়ে করেছে ১৯০ গ্রাম; কিন্তু দাম বাড়িয়েছে আরও ২০ টাকা।
হুইল ডিটারজেন্ট পাউডারের দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৬৫ টাকা ও রিন ডিটারজেন্টের দাম ১৫ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৫ টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা জানান, সাবান ও বিস্কুটের বেশ কিছু ব্র্যান্ডও পণ্যের প্যাকেটের আকার ছোট করে ফেলেছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (মার্কেটিং) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, লোডশেডিং ও গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানা প্রায়ই বন্ধ রাখতে হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও কাঁচামালের দাম বেড়েছে।
তিনি বলেন, 'এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার স্বার্থেই কোম্পানিগুলোকে হয় পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে, নয়তো প্যাকেটের আকার ছোট করতে হচ্ছে।'
নির্মাণ শিল্পে বাড়ছে লোকসানের বোঝা
গ্যাস সংকটে ৯০০টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিক কারখানাগুলো সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
সাধারণত ইস্পাত কারখানাগুলোর মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৪ শতাংশ খরচ হয় গ্যাস ও বিদ্যুতে। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে; কারণ উৎপাদন বিপুল পরিমাণে কমলেও জ্বালানি বাবদ নির্ধারিত ব্যয় কারখানাগুলোকে ঠিকই বহন করতে হচ্ছে।
রতনপুর স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী জানান, ইস্পাত উৎপাদনকারীরা এখন উভয় সংকটে পড়েছে।
তিনি বলেন, 'আমাদের এখন প্রতি টন রডে ৪–৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ইস্পাত কারখানাগুলোর পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।'
সিমেন্ট উৎপাদনকারীরাও একই ধরনের সংকটে আছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুসারে, গত এক মাসে সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয় অন্তত ১০ শতাংশ বেড়েছে।
এর বিরূপ প্রভাব তুলে ধরে প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, 'ভারী যন্ত্রপাতি একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা আবার পুরোদমে চালু করতে চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। গত এক মাস ধরে আমরা প্রতিনিয়ত এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। ফলে উৎপাদন খরচ প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে।'
'তবে বর্ষাকালে এমনিতেই সিমেন্টের চাহিদা কম থাকে। আমরা লোকসান মেনে নিয়েই কার্যক্রম চালাচ্ছি। তবে এভাবে খুব বেশি দিন টিকে থাকা সম্ভব নয়,' বলেন তিনি।
গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্পও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে; কারখানাগুলো অনেক সক্ষমতায় উৎপাদন কাজ চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের জন্য এর তাৎক্ষণিক পরিণতি হচ্ছে উৎপাদন ঘাটতি, আর সাধারণ ভোক্তাদের জন্য এর অর্থ হলো সংসারের বাজেটে টানাটানি ও ক্রমাগত কাটছাঁট।
