গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায়, ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে ইস্পাত উৎপাদনকারীরা
তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের ইস্পাত উৎপাদন খাত। এ পরিস্থিতিতে বড় কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ রি-রোলিং মিলের কার্যক্রম।
শিল্পখাতের নেতা সতর্ক করে বলেছেন, চলমান জ্বালানি সংকটের সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিং ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আর্থিক চাপ যুক্ত হয়ে দেশের নির্মাণ খাতের সরবরাহ চেইনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। ফলে অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া নির্মাণকাজের মূল মৌসুমের আগেই ইস্পাতের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শীর্ষস্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের মাসিক উৎপাদন স্বাভাবিক ২ লাখ ২৫ হাজার টন থেকে হারে কমে চলতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন বা তার নিচে নেমে এসেছে।
বিএসআরএমের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, 'গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানা সচল রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবু গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে এবং শ্রমিকদের কাজে যুক্ত রাখতে আমরা কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।'
কারখানা সচল রাখতে বিএসআরএম ফার্নেস অয়েল ও লাইট ডিজেল অয়েলের (এলডিও) মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। তবে এসব বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের খরচ অত্যন্ত চড়া বলে জানান তপন সেনগুপ্ত।
তিনি বলেন, 'ফার্নেস অয়েল ও এলডিওর খরচ গ্যাসের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি।' এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
শিল্পজুড়ে বন্ধ হচ্ছে কারখানা, বাড়ছে লোকসান
চট্টগ্রামের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ফলে কেএসআরএম, জিপিএইচ ইস্পাত, এইচএম স্টিল, গোল্ডেন ইস্পাত ও আনোয়ার ইস্পাতের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম স্থগিত রাখতে কিংবা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী বলেন, 'দেশের বেশিরভাগ স্টিল মিল এখন বন্ধ। আমাদের শিল্পের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ প্রায় শতভাগ অপরিহার্য। গত দুই সপ্তাহ ধরে কিছু কারখানায় একেবারেই গ্যাস সরবরাহ ছিল না।'
সুমন আরও জানান, গ্যাস ছাড়াই বিলেট তৈরি করতে পারে, এমন সমন্বিত কারখানাগুলোও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে মাত্র ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর ধরে পুঞ্জীভূত আর্থিক চাপের কারণে এই খাত এখন চূড়ান্ত বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে পণ্য ও জাহাজভাড়া বেড়ে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের ডলার সংকটের কারণে আমদানিকারকরা বিলম্বিত মূল্যে (ডেফারড পেমেন্ট) পণ্য আনতে বাধ্য হন। ঋণপত্রের (এলসি) মেয়াদ যখন শেষ হয়, তত দিনে ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১১০-১২৭ টাকায় পৌঁছায়। এতে প্রতি টন ইস্পাতে ১৫-২০ হাজার টাকা বিনিময় হারের লোকসান গুনতে হয়, যা কোম্পানিগুলোর চলতি মূলধনকে মারাত্মকভাবে নিঃশেষ করে দেয়।
কেএসআরএমের জেনারে ম্যানেজার জসিম উদ্দিন বলেন, উৎপাদন কমে গেলে তা সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। 'উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে তো আপনি ফিক্সড ব্যয় কমাতে পারবেন না। যত বেশি উৎপাদন করবেন, ইউনিট কস্ট তত কমবে। কিন্তু কারখানা যখন পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না, তখন এই ইউনিট কস্ট বহুগুণ বেড়ে যায়।'
ভরা মৌসুমের আগে সরবরাহ সংকট
কারখানাগুলো অলস বসে থাকায় বাজারের ওপর চাপের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামের ডিলার প্রাইম স্টিলের স্বত্বাধিকারী সুদীপ দাস বলেন, বর্তমানে প্রতি টন স্টিল রিবার ৮১ হাজার থেকে ৮৭ হাজার ৫০০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'বাজারে সরবরাহ ইতিমধ্যেই কমে গেছে। নির্মাণকাজের মূল মৌসুম যেহেতু এগিয়ে আসছে, তাই উৎপাদন স্বাভাবিক না হলে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে।'
জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহের দাবি
অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদন পরিকল্পনা স্থবির হয়ে পড়ায় জাতীয় গ্রিডে সরাসরি এলএনজি সরবরাহ করে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন উৎপাদনকারীরা।
গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষগুলো আগামী সপ্তাহে ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিলেও, শিল্প নেতারা জোর দিয়ে বলছেন, এর জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।
সুমন বলেন, 'সরকার যদি জরুরি ভিত্তিতে এই শিল্পের দিকে নজর না দেয় এবং যত দ্রুত সম্ভব পাইপলাইনে এলএনজি যুক্ত না করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।' তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক, আবাসন খাত ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়া অনিবার্য।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের মতে, আমদানিকৃত চড়া দামের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশ তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে। পিক আওয়ার বা সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়মিতই সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যাপক লোডশেডিং, শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়ছে।
