গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত, কারখানায় হাতে ইস্ত্রি করা হচ্ছে পোশাক
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলজুড়ে তীব্র গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কারখানাগুলো ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত জেনারেটর চালাচ্ছে, গ্যাসনির্ভর ইউনিট বন্ধ রাখছে এবং সাধারণত মেশিনে করার কাজ হাতে করছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় রপ্তানিকারকেরা মূল্যছাড়, আর্থিক ক্ষতি এবং ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।
স্প্যারো অ্যাপারেলস লিমিটেডে গ্যাসের চাপ কম থাকায় মেশিন অচল হয়ে পড়েছে। ফলে ডেনিম প্রেসিংয়ের কাজ হাতে করা হচ্ছে।
স্প্যারো অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক শাওন ইসলাম বলেন, 'গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক থাকলে আমরা প্রেসিং মেশিনে সহজেই ডেনিম ও ফিনিশিংয়ের কাজ করতে পারতাম। এখন আমাদের ম্যানুয়ালি কাজ করতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদনের গতি কমে যাচ্ছে।'
কারখানা চালানোর প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে গ্যাসের চাপ
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, গাজীপুরে নিবন্ধিত প্রায় ২,৫০০টি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৪০০টির বেশি কারখানা পুরোপুরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। টেক্সটাইল, ডাইং, ফিনিশিং, ডেনিম, নিটিং ও ওভেন ইউনিট চালাতে ৭ থেকে ৮ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। তবে অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ ২ পিএসআইয়ের নিচে নেমে গেছে। গতকাল পরিদর্শনের সময় কয়েকটি কারখানার মিটারে চাপ প্রায় শূন্যও দেখা গেছে।
লিড টাইম বজায় রাখতে কারখানাগুলো ডিজেলচালিত জেনারেটরের দিকে ঝুঁকছে। এতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ডিভাইন গ্রুপের ডাইং কার্যক্রম এবং সাদমা গ্রুপের টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য গ্যাসনির্ভর ইউনিটগুলোও সাময়িক বন্ধ অথবা কম উৎপাদনের মুখে পড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ও তিতাস গ্যাস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের শিল্প খাতে প্রতিদিন প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের প্রয়োজন। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ঘাটতি থাকছে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট চাহিদার ৪৫ শতাংশ। টঙ্গী বিসিক, গাছা, বাসন, কোনাবাড়ী বিসিক, কাশিমপুর, গাজীপুর সদর, সফিপুর, কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এবং শ্রীপুর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে।
যদিও তৈরি পোশাক কারখানাগুলো মূলত বিদ্যুতের ওপর চলে, তবে ব্যাকওয়ার্ড-লিংকেজ শিল্প স্পিনিং, ডাইং, নিটিং ও ফিনিশিং গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পুরো রপ্তানি সরবরাহশৃঙ্খলে এর প্রভাব পড়ছে। বিজিএমইএর সদস্য কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতার তুলনায় ৩০-৩৫ শতাংশ কম উৎপাদন করছে। অন্যদিকে ওভারটাইমের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
সাদমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন বলেন, 'এর আগে কখনো এই শিল্পকে এত বড় সংকটের মুখে পড়তে হয়নি।' তিনি জানান, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর ও ভালুকায় গ্যাসের চাপ প্রায়ই ১ পিএসআই বা তার নিচে নেমে যায়। অথচ কারখানা চালাতে প্রয়োজন ৫-৬ পিএসআই চাপ।
সংকটে ব্যয় ৩০% বাড়ছে, ঝুঁকিতে চাকরি
উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়ছে। রপ্তানিকারকেরা বিমান পরিবহনে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার ডলার ব্যয় করছেন এবং দেরিতে পণ্য সরবরাহের জন্য ক্রেতাদের ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মালিকদের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করে যেতে হচ্ছে।
নাসির বলেন, 'আমার দুটি কারখানায় ৪ হাজার শ্রমিক বসে আছেন। ডিজেল দিয়ে একটি কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু গ্যাস না থাকায় টেক্সটাইল কারখানাটি বন্ধ। উৎপাদন বা রপ্তানি না থাকলেও আমাদের শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন ৫০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে।'
দেশীয় কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে লিড টাইম প্রায় ৭০ দিন। আর আমদানি করা কাপড়ের ক্ষেত্রে তা ৯১ দিন পর্যন্ত হয়। ভারত থেকে স্থলপথে কাপড় আমদানি বন্ধ থাকায় এবং কনটেইনার সংকট থাকায় আরও বিলম্ব হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন। কেউ কেউ বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তারা সতর্ক করে বলেন, বিভিন্ন ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়া বা কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গাজীপুরে তিতাস গ্যাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪৫ শতাংশ ঘাটতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিতাস গ্যাসের গাজীপুর বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক সুরুজ আলম বলেন, কোনো কারখানা মালিক আনুষ্ঠানিকভাবে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানাননি।
গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানিয়েছেন, তার কার্যালয়েও এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন আসেনি। তবে বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ২০-২৫ শতাংশ ব্যাহত হচ্ছে। শিপমেন্টের সময়সীমা বজায় রাখতে মালিকেরা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করায় কোনো কোনো ইউনিট সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে।
