১৫ হাজার ডলার চাঁদা না দেওয়ায় চিকিৎসকের ওপর হামলা, ‘ডেভিড ইমন’ গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ
হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়েছিল ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদার দাবি। টাকা দেওয়ার জন্য বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আল্টিমেটাম। সেই সময়সীমা পার হওয়ার ঠিক দুই দিনের মাথায় রাজধানীর শান্তিনগরে হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমান।
ভুক্তভোগী এই চিকিৎসকের অভিযোগ, কথিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের নাম ব্যবহার করে এই চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। হামলার পরও থামেনি হুমকি। হামলার এক ঘণ্টা পর হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয়, কেমন অনুভব করছেন? এমনকি পরদিনও তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমান জানান, গত ৬ আগস্ট তার হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা আসে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের নাম উল্লেখ করে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা পরিশোধের জন্য ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি তিনি। ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনো ভুয়া গ্রুপের কাজ।
ডা. আসাদুর রহমান বলেন, 'আমি বিষয়টিকে ইগনোর করেছিলাম। ভেবেছিলাম কোনো ফেক গ্রুপ হতে পারে। কিন্তু দেখা গেল, ১৫ তারিখ সময় দেওয়ার পর তারা ১৭ তারিখে এসেই হামলা করল।' চাঁদা দাবির বার্তার নিচে ডেভিড ইমনের নাম লেখা ছিল বলেও জানান তিনি।
গত ১৭ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখে বাসায় ফিরছিলেন আসাদুর রহমান। শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে পৌঁছালে কয়েকজন ব্যক্তি তার গাড়ির গতিরোধ করে।
হামলাকারীরা প্রথমে সিএনজিচালিত গাড়ির দরজা খোলার জন্য চাপ দেয়। চালককে দরজা খুলতে নিষেধ করলে দুর্বৃত্তরা এক ভুয়া অভিযোগ তোলে। তারা দাবি করে, চিকিৎসক জনৈক এক রোগীর স্বজনকে ভুল চিকিৎসা দিয়েছেন। ডা. আসাদুর রহমান বলেন, 'একজন বলছিল, তুই অমুকের বোনকে ভুল চিকিৎসা করেছিস। দরজা খোল। আমি জিজ্ঞেস করি, "কার বোন, সেই রোগী কোথায়?" কিন্তু তারা কোনো জবাব না দিয়ে শুধু দরজা খোলার জন্য চাপ দিতে থাকে।'
একপর্যায়ে দরজা খুলে গেলে তার ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। হামলায় তার চোখে গুরুতর জখম হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার চোখে রক্ত জমাট বেঁধেছে এবং কর্নিয়ায় ক্ষত তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসক জানান, হামলার পরও তার কাছে হুমকি আসা বন্ধ হয়নি। হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পরই তার হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা আসে যেখানে ইংরেজিতে লেখা ছিল—'Now how do you feel?' [এখন কেমন অনুভব করছেন?]। পরদিন সকালেও একই নম্বর থেকে আরেকটি বার্তা পাঠিয়ে তাকে আর কোনো ঝামেলায় না জড়ানোর জন্য হুমকি দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় পল্টন থানায় অভিযোগ দায়েরের পর নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, 'হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জীবন নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে চাঁদা দাবির সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা কতটুকু বা নেপথ্যে আর কারা আছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।'
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী বলেন, 'বিষয়টি তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চাঁদা দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।'
কথিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তবে এই চিকিৎসকের ঘটনায় তার বা তার সহযোগীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
এদিকে, একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের ওপর এমন পরিকল্পিত হামলায় চিকিৎসক সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
আহত অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমানের দাবি, শুধু মাঠপর্যায়ের হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না; এই হামলার নির্দেশদাতা কারা এবং হামলার পরও কেন তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে।
