আমি ‘এতটাই একা’ যে একটা তেলাপোকার সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলাম’: জাপানের প্রধানমন্ত্রী
জাপানের কাজপাগল প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দায়িত্বগ্রহণের মাত্র ১০ মাসের মধ্যেই শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের মোকাবিলা করেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছেন, আর রাতে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাজ করার কথা বেশ গর্বভরে বলেছেন।
এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক অকপট পোস্টে দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, ক্ষমতার শীর্ষে থাকার জীবনটা বেশ একাকিত্বের হতে পারে।
সরকারি বাসভবনে দীর্ঘ সময় কাজ করার একটি গল্প শেয়ার করতে গিয়ে তাকাইচি জানান, তিনি সেখানে কোনো ভূতের দেখা পাননি, তবে একটি তেলাপোকা দেখেছেন।
তাকাইচি জানান, তেলাপোকাটিকে তিনি মারেননি। কারণ তার মনে হয়েছিল, পতঙ্গটিও হয়তো 'পুনর্জন্মের দীর্ঘ চক্রের কোনো এক অংশ'।
শেষপর্যন্ত তার কর্মীরা বিষয়টি জানতে পেরে পতঙ্গটিকে সরিয়ে ফেলেন। তাকাইচি বলেন, তেলাপোকাটি সরিয়ে ফেলার পর তিনি 'স্বস্তিবোধ' করেছিলেন ঠিকই, তবে 'কিছুটা একাকী, বা সম্ভবত কষ্টও' পেয়েছিলেন।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ৬৫ বছর বয়সি নেত্রী তাকাইচি গত ডিসেম্বরে টোকিওর সরকারি বাসভবনে ওঠেন।
নিজের 'অত্যন্ত ভালো বন্ধু' ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে জনসাধারণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন তাকাইচি। তিনি বলেন, 'যেহেতু আমি সরকারি বাসভবন নিয়ে লিখেছি, তাই প্রায়ই যেসব প্রশ্নের সম্মুখীন হই, তার কয়েকটির উত্তর আজ দেব।
'সরকারি বাসভবনে যেসব ভূতের আনাগোনা আছে বলে শোনা যায়, তাদের কারও সঙ্গে কি আপনাদের দেখা হয়েছে?' আমি কখনো কোনো ভূতের সামনে পড়িনি। তবে কিছুদিন আগপর্যন্তও তেলাপোকা দেখে আমি চিৎকার করে উঠতাম।
'সরকারি বাসভবনে ওঠার পরও আমি নিজে খাবার টেবিলের নিচের মেঝে যত্ন করে মুছেছি। খাবারের উচ্ছিষ্ট শক্ত ঢাকনাযুক্ত ময়লার ঝুড়িতে ফেলেছি, প্লাস্টিকের কনটেইনার ধুয়ে গুছিয়ে রেখেছি। তাই একদিন যখন হুট করে একটা তেলাপোকা পায়ের কাছে দিয়ে ছুটে গেল, আমি বেশ চমকে উঠেছিলাম।
'তবে ছোটবেলা থেকেই আমি ওসামু তেজুকার ফায়ারবার্ড (একটি মাঙ্গা সিরিজ) ভালোবাসি; এটি আমি বারবার পড়েছি। ফায়ারবার্ডে পুনর্জন্মের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে "সমস্ত প্রাণ একে অপরের সাথে যুক্ত, কেবল তাদের রূপ পরিবর্তন হয়"। ছোটবেলায় এই বিষয়টি আমার ওপর দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। সম্ভবত সেই কারণেই বড় হওয়ার পরও আমি তেলাপোকাসহ কোনো পোকামাকড়কেই মেরে ফেলতে পারি না।
'সরকারি বাসভবনে ঘুরে বেড়ানো ওই তেলাপোকাটির বিষয়ে আমি ভেবেছিলাম, "হয়তো এই প্রাণটিও পুনর্জন্মের সেই দীর্ঘ চক্রেরই একটি অংশ।" কিছুটা সময় আমি এটা মেনেও নিয়েছিলাম, এই আশায় যে পতঙ্গটি হয়তো কোনোভাবে নিজে থেকেই চলে যাবে। কিন্তু যখন আমার সেক্রেটারিদের ঘটনাটি জানানোর পর তারা আঁতকে উঠেছিলেন।'
'একজন সেক্রেটারি বললেন, "এটি নোংরা। আমি দেখছি বিষয়টা।" তিনি 'অপারেশন কমব্যাটের' ব্যবস্থা করলেন। এরপর থেকে আর তেলাপোকা দেখা যায়নি। আমি স্বস্তিবোধ করেছিলাম ঠিকই, তবে কিছুটা একাকী বা সম্ভবত কষ্টও পেয়েছিলাম।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একগুচ্ছ দীর্ঘ পোস্টে এই নেত্রী আরও জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বদলে সরকারি বাসভবন থেকেই কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কারণ এটি 'সরকারি বাসভবনের কর্মীদের ওপর চাপ' কমায়।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করার জন্য আলোচনায় এসেছেন তাকাইচি।
জুলাইয়ে এক্স-এ তিনি জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় পর অবশেষে তিনি 'টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পেরেছেন'। কারণ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে 'শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানো' তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আশেপাশে বিপুলসংখ্যক কর্মীর ভিড় থাকার চেয়ে একাকী কাজ করতেই তিনি বেশি পছন্দ করেন।
নিজের সাম্প্রতিক পোস্টগুলোতে তিনি লেখেন, যদি সরাসরি উপস্থিত থেকে কোনো বৈঠকের প্রয়োজন হয়, তবে তিনি 'কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্রেটারি বা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বাসভবনে ডেকে এনে' সেটি সেরে নেন।
তাকাইচির এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টগুলো মূলত এমন কিছু খবরের প্রতিক্রিয়ায় এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে তিনি পার্লামেন্ট অধিবেশনগুলো এড়িয়ে চলছেন; এর বদলে ব্যক্তিগত বাসভবনেই পুরো সময় কাটাচ্ছেন।
নিক্কেই পত্রিকার তথ্যমতে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তাকাইচি তার সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির অর্ধেকেরও বেশি সময় নিজ বাসভবনে কাটিয়েছেন। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ২০১২ সালের পর থেকে জাপানের অন্য যেকোনো প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় তিনি সবচেয়ে কমসংখ্যক মন্ত্রিসভা বৈঠক করেছেন।
জাপানের সিংহাসনে কেবল পুরুষদের উত্তরাধিকার বজায় রাখার পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের নীতিগুলো বাস্তবায়নে বিলম্ব করায় তার প্রতি জনসমর্থন যখন কমতে শুরু করেছে, তখনই এ ধরনের খবরগুলো সামনে আসে।
গত মাসের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, তাকাইচির প্রতি জনসমর্থন কমে ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এক মাসের ব্যবধানে ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ের পর এই প্রথম মতো তার জনসমর্থন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
