ফ্রান্সে মোদি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে ভারতের একটাই শর্ত ছিল, ‘সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে পারবেন না’: মার্কিন রাষ্ট্রদূত
ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, দুই মাস আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের আগে ভারতের পক্ষ থেকে মাত্র একটি অনুরোধ করা হয়েছিল—সাংবাদিকদের যেন তাদের দুজনকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া না হয়।
গোর শনিবার (২২ আগস্ট) বলেন, ট্রাম্প প্রথমে এই অনুরোধে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে বলেন—এমনকি তার পাশে বসে থাকা মোদিকে পাশে রেখেই। অথচ মোদি তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেওয়া এড়িয়ে চলেন।
গোরের এই বক্তব্য এমন এক সময় সামনে এলো, যখন ইউরোপ ও ওশেনিয়ায় মোদির সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের সময় তার খোলামেলা সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে অনীহার বিষয়টি আবারও সামনে আসে। এসব সফরে স্থানীয় সাংবাদিকেরা ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদলের কাছে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
শনিবার এখানে অনুষ্ঠিত ইকোনমিক টাইমস বিশ্বনেতা ফোরামে গোরকে জিজ্ঞেস করা হয়, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে টানাপড়েন দেখা দিয়েছে, তা কমাতে তিনি কী করেছেন। এর জবাব দিতে গিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
১৭ জুন ফ্রান্সের এভিয়ানে মোদি ও ট্রাম্পের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ওই পর্বের কিছুক্ষণ আগে—যেটি ১৬ মাসের মধ্যে তাদের প্রথম মুখোমুখি বৈঠক ছিল—গোর স্মরণ করে বলেন, ট্রাম্প তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ভারত সরকার কোনো অনুরোধ জানিয়েছে কি না।
গোর বলেন, 'আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি অনুরোধ ছিল। সেটি ছিল, "চলুন, সংবাদমাধ্যমকে নিয়ে আসি, তবে পূর্ণাঙ্গ সংবাদ সম্মেলন নয়, কোনো প্রশ্নও নয়।" তাই আমি প্রেসিডেন্টকে বলেছিলাম, "ভারতীয়রা কোনো প্রশ্ন চান না।" তিনি বললেন, "ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই।"'
কিন্তু দুই নেতা তাদের বক্তব্য শেষ করার পর—যার মধ্যে মোদি একটি কাগজ দেখে তার বক্তব্য পড়েছিলেন—সেখানে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক সাংবাদিককে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়াই ছিল ট্রাম্পের প্রথম কাজ। এ সময় তিনি মোদির পাশেই বসে ছিলেন।
গোর আরও বলেন, 'এতেই সবকিছু উন্মুক্ত হয়ে গেল… আর সাংবাদিকেরা তাকে যে প্রশ্নগুলোর একটি করেছিলেন, সেটি ছিল ঠিক সেই প্রশ্ন, যা আপনি আমাকে এইমাত্র করলেন। আর প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, "আমার বন্ধু প্রধানমন্ত্রী মোদি যতক্ষণ আমার পাশে আছেন, ভারত তার যা প্রয়োজন তা পাবে।"'
ওই সময় সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের উত্তর ট্রাম্পই দিয়েছিলেন। কারণ কেউ মোদিকে কোনো প্রশ্ন করেননি। পশ্চিম এশিয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে—যার মধ্যে একটি হামলায় তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছিলেন—প্রেসিডেন্ট ঘটনাটিকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, সমুদ্রপথে নাবিকের কাজ 'একটি কঠিন পেশা'।
এর এক মাস আগে ইউরোপ সফরের সময়ও মোদির সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি এবং ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অবনতি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আসে। সে সময় আমস্টারডাম ও অসলোতে সাংবাদিকেরা ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিকদের কাছে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেন।
এর মধ্যে নরওয়ের সাংবাদিক হেলে লিং সরাসরি মোদিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি কি 'বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের' কাছ থেকে প্রশ্ন নিতে চান কি না। তবে প্রধানমন্ত্রী ওই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি।
পরে লিং অসলোতে ভারতীয় কূটনীতিকদের আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন। সেখানে তার সঙ্গে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিমাঞ্চলবিষয়ক সচিব শিবি জর্জের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ কথোপকথনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পূর্বাঞ্চলবিষয়ক সচিব রুদ্রেন্দ্র ট্যান্ডনকেও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নিউজিল্যান্ড সফরের সময় মোদি কেন কোনো সংবাদ সম্মেলন করেননি।
এর জবাবে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, এর কারণ হলো—'ভারতের ভোটারদের বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকার মানুষ, যারা সরাসরি যোগাযোগ চান' এবং 'মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে কথা বলা পছন্দ করেন না'।
এর তিন বছর আগে, ২০২৩ সালের জুনে ওয়াশিংটনে দ্বিপক্ষীয় সফরের সময় মোদি অবশ্য সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।
সে সময় বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছিল, ভারতীয় পক্ষ ওই অনুষ্ঠানে সম্মতি দিয়েছিল 'মাত্র এক দিন আগে'। কারণ 'হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা মোদির উপদেষ্টাদের জানিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন নেওয়া হোয়াইট হাউসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ।'
